সাম্যই রক্ষা করতে পারে এ মহাবিপর্যয় থেকে

ফনিন্দ্র সরকার
ফনিন্দ্র সরকার - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ০৯ জুন ২০২০, ০০:৫৩,  আপডেট: ০৯ জুন ২০২০, ০৯:২৭

অজানা অচেনা অদৃশ্য মহাশত্রু করোনা ভাইরাস বিশ্বমানব সমাজকে মহাবিপদে ফেলে দিয়েছে। কোনো বাছবিচার নয় প্রভাবশালী, ধনী, শিক্ষিত থেকে রাস্তার ফকির পর্যন্ত কেউ করোনা হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। এমন পরিস্থিতিতে কী করা প্রয়োজন সে বিষয়ে বিশ্ব নেতারাও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।

চীনের উবেই প্রদেশের উহান শহরে গত ডিসেম্বর-২০০৯ এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। রাতারাতি উহান শহর হয়ে উঠে করোনার হটস্পট। হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে থাকে এবং মৃত্যুর মিছিলও লম্বা হতে থাকে। অতি ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগটি মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে ফেলে।

চীন সরকার উহান শহরটিকে লকডাউন করে দেয় যাতে রোগটি ছড়াতে না পারে। দীর্ঘ ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে চীনের উহান শহরটি লকডাউন ছিল। আধুনিক প্রযুক্তির দেশ চীনে রাতারাতি অনেক বড় বড় কোভিড হাসপাতাল পর্যন্ত নির্মাণ করে ফেলে। উহান শহর থেকে চীনের অন্যান্য শহরেও করোনা ছড়িয়ে পড়লেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কভিড মোকাবেলা করে চীন অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে এসেছে।

সেই চীন থেকে এখন সাড়া পৃথিবীকেই আক্রান্ত করেছে করোনা ভাইরাস। চীনে যখন এ রোগটি সংক্রমিত হয় তখন নানা ধরনের মন্তব্য শোনা গেছে এবং পত্র-পত্রিকায়ও লেখালেখি হয়েছে। বাংলাদেশের অনেকেই চীনের খাদ্য সংস্কৃতিকে দায়ি করেছে করোনার জন্যে। কোন কোন বিজ্ঞানী বলেছেন যে, বাদুড় বা বনরুই জাতীয় প্রাণীর শরীর থেকে রোগের সৃষ্টি।

আবার কেউ চীনের সৃষ্ট জীবাণু বোমা হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত করোনা কোথা থেকে সৃষ্টি তার সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারেনি, সবই অনুমাননির্ভর। চীনে এর প্রাদুর্ভাব হলেও রোগের উৎপত্তি স্থল নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। যা হোক সে বিতর্কে না গিয়ে কীভাবে এ সংক্রমন থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সেটাই ভাবতে হবে সবাইকে।

বিশ্বনেতারা সে ভাবনা নিয়েই দিন গুজরান করছেন। রোগতত্ত¡ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে এ রোগের সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা না থাকার কারণে এর সংক্রমণ থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায় সে কৌশলপত্র নিয়েই অগ্রসর হতে হচ্ছে সবাইকে। আর কৌশলটি হচ্ছে ‘ঘরে থাকা’।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ঘরে থাকা কি সম্ভব? এমন বাস্তবতায় নানা ঝুঁকি নিয়ে মানুষ জীবিকার কারনে বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে প্রটোকল উপস্থাপন করেছে তাও অনেকের পক্ষেই মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করা, ঘন ঘন হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার করা ইত্যাদি। তবে ঘরে থাকাই হবে নিজেকে পরিবারকে সুরক্ষার অন্যতম প্রধান রাস্তা। এই প্রধান রাস্তাটির পথে আমরা হাঁটতে পারছি কী? অর্থনৈতিক ব্যপক বৈষম্যের পৃথিবীতে মানুষকে ঘরে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাই কোভিড-১৯ থেকে সুষম খাদ্যের শিক্ষা গ্রহণ করেই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।

করোনা যেমন ধনী-গরিব সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখছে একইরূপ দৃষ্টি নিয়ে জনগণকে ঘরে থাকতে বাধ্য করতে হবে সুষম সাম্যের ভিত্তিতে। করোনার ছোবলে দেশে দেশে আজ হাহাকার। অর্থনীতির গতি রুদ্ধপ্রায়। কর্ম হারাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। সারা দেশে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি চলছে। মুমূর্ষু রোগী দরকার একটু ওষুধ, একটু সেবার।

কিন্তু কোনো রকম অসুস্থ হলেই তার করোনা টেস্ট রিপোর্ট লাগবে। করোনা টেস্ট করতে গেলে সেখানে বহু ঝামেলা। তার পরও রিপোর্ট পেতে ৩ দিন। এতো এমন দেশ না যেখানে নাগরিকদের সবার হেলথ কার্ড থাকবে। হেলথ ডেটা থাকবে পুরো স্বাস্থ্য বিভাগে। যেখানে আক্রান্ত রোগী আছে তার আশপাশের মানুষের হেলথ টেস্ট হবে।

বাড়িতে এসে উপাদান নিয়ে দ্রুত টেস্ট রিপোর্ট দেয়া থাকবে। দরকারে সে হেলথ টেস্ট রিপোর্ট দেখাবে। কিন্তু সারা দেশে এখন অসুস্থ হলে তাকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে। করো না থাকলেও সে হবে করোনার রোগী। সারা দেশে এই সংকট বিরাজ করছে। গণমাধ্যমে এ খবর বার বার প্রকাশ হলেও সবাই চুপ।

গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে অনেক ঘটনা জ্বর, গলাব্যথা ও কাশি উপসর্গ নিয়ে দুই দিন ঘুরেও ঢাকার সরকারি দুটি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেননি। কারণ তখনো তার টেস্টের রিপোর্ট হাতে পাননি। তিনি তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন দুটি প্রাইভেট হাসপাতালে। সেই দুটি থেকেও জানানো হয়, শয্যা খালি নেই।

শেষ পর্যন্ত তিনি অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করে বাসায়ই চিকিৎসা চালান। মহাখালীর বাসিন্দা আকমল হোসেন তার স্ত্রীর করোনা উপসর্গ নিয়ে ছুটে যান মহাখালীর শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় এক গোঁজামিল দিয়ে।

প্রতিদিনই এমন কোনো না কোনো ব নার শিকার হচ্ছে কোভিড বা নন-কোভিড রোগীরা কোনো না কোনো হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে এখন এই প্রবণতা আগের তুলনায় আরো বেড়ে গেছে। মাঝে কিছুদিন বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা না দেয়ার ক্ষেত্রে কোভিড বা নন-কোভিড সনদের অজুহাত দিলেও এখন তারা নতুন অজুহাত দেখাচ্ছে বেড খালি না থাকার।

এক্ষেত্রে কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল সরকারের কাছ থেকে চুক্তির নামে টাকা আদায় করতে না পেরে করোনা রোগীদের সেবা দেয়া থেকে বিরত থাকার পথ খুঁজছে। এর মধ্যেও ধনকুবের সম্প্রদায় করোনা অজুহাতে তাদের পরিচালিত শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে শ্রমিক ছাঁটাই করছে। শ্রমিক ছাঁটাই করে প্রাতিষ্ঠানিক খরচ কমিয়ে তাদের বিলাসী জীবন ধারাকে সমুন্নত রাখতে তৎপর রয়েছে। তারা ভাবছে না কর্মহারা শ্রমিক- কর্মচারীরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

যাদের ঘামঝরা শ্রমে ভর করে দাঁড়াচ্ছে রাজ অট্টালিকা, সুযোগ বুঝে আবার সেই শ্রমিকদেরই বিদায় করছে- এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে মানব সভ্যতাই ভেঙ্গে পড়বে তা কী ধনকুবের সম্প্রদায় বা রাষ্ট্রনায়কগণ ভেবে দেখেছে! এই ভাবনাটা রাষ্ট্রনায়কদের না থাকার কারণেই মাথায় ভুতুড়ে ভাবনা কাজ করছে। তাই জীবনের চাইতে জীবিকার গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে প্রায় সবদেশ।

জীবন যেখানে সংকটময় সেখানে জীবিকার প্রশ্ন অর্থহীন। আমরা প্রতিবছরই বিশ্বে ধনীদের একটি তালিকার প্রকাশ দেখতে পাই সেই সঙ্গে দেখতে পাই প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়কদের তালিকা। সেই ধনী লোকের তালিকায় যাদের নাম উঠে আসে এবং তাদের সম্পদের পরিমাণ যোগ করলে দেখা যায় পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি সম্পদের মালিক ওই সব ধনকুবেরগণ।

প্রয়োজনের চাইতে অপ্রয়োজনীয় খাতে যত টাকা ব্যয় করেন এই ব্যয়টা যদি মানুষের কল্যাণে কিংবা মানুষ বেঁচে থাকার প্রকল্পে ব্যয় করেন তবেই মানুষকে ঘরে আটকে রাখা সম্ভব। বেশি নয় টানা ৬০ দিন যদি মানুষকে ঘরে আটকে রাখা সম্ভব হয় তবে করোনা ভাইরাস কোনো ধরনের আক্রমণই শাণিত করতে পারবে না।

কাজেই ধনকুবের ও রাষ্ট্রনায়কদের মনস্তাত্তি¡কভাবে শুধরে নিতে হবে। আমরা জানি ভ‚গর্ভ থেকে অশোধিত তেল নিয়ে তাকে শোধন করে, তা থেকে প্রয়োজনানুসারে সুন্দর পেট্রোলিয়াম জাত জিনিস তৈরি হয়। তেমনি মানব শরীর ও মন হয়ে উঠে এক শোধনাগার। অর্থাৎ মনস্তাত্তি¡ক শোধনাগার। এসব আবেগগুলো ধনকুবেরদের শোধন করে নিতে হব।

শোধন কার্যের ফলে তৈরি হবে সব রকম নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ, ভালোবাসা, করুনা, নির্ভীকতা ও সেবাপরায়ণতা। তাই ধনকুবের সম্প্রদায়কে শুধরে নিতে হবে মনস্তাত্তি¡ক ভাবের, করোনা সেই শিক্ষাটি দিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণের মতে কোভিড-১৯ এমন একটি ভাইরাস যা কেবল মানবদেহে প্রবেশ করে বংশ বিস্তারে সক্ষম হয়। কিন্তু জড় পদার্থের ওপর বেশি সময় ভাইরাসটি বেঁচে থাকতে পারে না।

হাত থেকে মুখে, কানে, নাকে, চোখে স্পর্শ করলে তার মধ্যে মানবদেহে প্রবেশ করে আবার হাঁচি-কাশির মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনের দেহে ঢুকে যেতে পারে। তাই শারীরিক দূরত্বের কথা প্রটোকলে রয়েছে। ঘন ঘন বিশ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে। তবেই কিছুটা হলেও সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

সুতরাং জনসমাবেশ এড়িয়ে ঘরে থাকার কৌশলটিই গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারকেই ঘরে থাকার আইন জারি করতে হবে। যতদিন প্রয়োজন ঘরে থাকা মানুষগুলোকে ধনকুবের সম্প্রদায় নিজেদের অপ্রয়োজনীয় বিলাসী জীবন পরিহার করে মানুষ বাঁচার প্রকল্পে তাদের সম্পদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারের মাধ্যমেই এ মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

তা না হলে মানুষ বাঁচবে না, মানুষ না বাঁচলে সরকারও বাঁচবে না। সমস্ত বিত্তবান ও ধনকুবের সম্প্রদায়কে লালসাবৃত্তি কমিয়ে মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় অবস্থান করতে হবে। মনে রাখতে হবে অর্থ ধনসম্পদ কখনো স্থায়ী সম্পদ নয়। মানুষের ভালোবাসা ও স্নেহ মায়ামমতাই আসল সম্পদ। এ সম্পদ অর্জনে চাই উদার ও নৈতিক মানসিকতা।

বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই যে, করোনা আমাদের এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জীবিকার কথা ভেবে সীমিত আকারে সব খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সীমিত আর সীমিত থাকছে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষকে মৃত্যুর সঙ্গেই আলিঙ্গন করতে হচ্ছে।

তাই বিত্তবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে সর্বস্তরের মানুষকে ঘরে থাকার বাধ্যবাধকতায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মানুষ যাতে চিকিৎসা সেবা থেকে বি ত না হয় এবং যাতে করে টাস্কফোর্সের সাহায্যে সাম্যের ভিত্তিতে সুন্দর ও সহজভাবে জীবন ধারণ করতে পারে। মোটা অঙ্কের একটা বাজেট হাতে নিয়ে সরকারকে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: ফনিন্দ্র সরকার- কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads