জীবনে সফল হতে জিপিএ-৫ কি খুব জরুরি?

দৈনিক মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৬ জুন ২০২০, ০০:৩৮,  আপডেট: ০৬ জুন ২০২০, ০৮:৫৯

পৃথিবীর মানুষ আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিভোর। নিত্যনতুন বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে সবকিছু সহজতর হয়ে উঠেছে মানুষের কাছে। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এবং মানুষ নতুন নতুন জিনিস নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে।

প্রতিবছর স্কুল কলেজ থেকে ছাত্রছাত্রীরা গোল্ডেন প্লাস পাচ্ছে এর পাশাপাশি অনেকেই আবার অকৃতকার্য ও হচ্ছে। কি মাধ্যমিক কি উচ্চমাধ্যমিক জিপিএ-৫ ই যেন সবার কাছে মহার্ঘ্য। এটা না পেলে জীবনই বিফলে যাবে।

সর্বোপরি যাদের সন্তানরা এই প্রতিযোগিতায় টেকে তাদের যে ফুলে-ফেঁপে গর্বে অভিভূত হওয়া, মিষ্টি কিনে ছড়ানোর সংস্কৃতি মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। এই অহংবোধ বাড়ির পাশের আরেকটি সন্তানকে হতাশ করে। এরপরে শুরু হয় বাড়িতে বাব-মায়ের ইজ্জত নষ্ট করার ধকল। শিক্ষার্থীটি আত্মহত্যা করে।

আত্মবিশ্বাস যে সমাজ তৈরি করতে শেখায় না সে সমাজে এক কিশোর বা তরুণের আত্মহত্যা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে যায়। সন্তানের পাশ-ফেল যদি বাবা-মায়ের সামাজিক অবস্থা নির্মাণে বিষয় হয়ে ওঠে তখন আর করার কিছু থাকে না। পুঁজিবাদী সমাজে মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তের এই বিলাসিতা একটা শিশুর মনোজগত গঠনের অন্তরায়।

আমাদের দেশের অভিভাবকরা মনে করেন তার সন্তানকে জিপিএ-৫ পেতেই হবে অন্যথায় সে দেশ ও দশের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সফলতা অর্জনের জন্য আসলে কি জিপিএ-৫ পাওয়া খুবই প্রয়োজন? আমি বলব না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে অধিকাংশ লোক জিপিএ-৫ না পেয়েও সফল হয়েছেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথাই বলা যাক, যিনি ছোটবেলা থেকে দুখুমিয়া হিসেবে পরিচিত ছিল। ছোটবেলা থেকে তার দুঃখের শেষ ছিল না?। পড়াশোনা তো দূরে থাক জীবিকার তাগিদে তিনি চায়ের দোকানে রুটি বানিয়েছেন। কারণ তিনি পডশোনা করার তে টাকা পয়সা ছিল না।

বিদ্যালয় কি জিনিস তিনি চোখে দেখেননি। কিন্তু তিনি আজ আমাদের মাঝে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত। কারণ তিনি ব্যর্থ হয়ে থেমে থাকেনি। তিনি নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে কখনো গান কখনো কবিতা কখনো গল্প নিজের মতো করে নিজের ভাব প্রকাশ করেছেন, যা অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেও সে কাজটি করতে পারেনি।

শুধু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ খান এর কথাই বলা যাক, তিনি ছোবেলা থেকে রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এবং পাশাপাশি পড়াশোনা করেছিল। কিন্তু তিনি পড়াশোনা ভালো করে করতেন না বলে অনেকবার ফেল ও করেছেন কিন্তু তিনি হার মানেননি, কখনো নকলও করেননি। তিনি বার বার পরীক্ষা দিয়ে গেছেন এবং সফলতা অর্জন করেছেন।

বিশ্বের যত বড় মানুষের ছিলেন, এরিস্টটল প্লেটো থেকে আমাদের দেশের বিজ্ঞানী সত্যেন বসু, জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, কুদরতই খুদা, জায়র ইকবালসহ কত শত গুণীজন রয়েছে তারা কেউ জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন? কিন্তু এইসব মণীষীদের জীবনকথা পাঠ্যপুস্তকে সেভাবে স্থাপন করা হয় না।

বাবা-মা সন্তানদের বলেন না সেইসব আলোকিত মানুষদের কথা। এরা কেউ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বা পাবলিক লাইব্রেরির নাম জানে না, জানে ফাস্টফুডের ব্রান্ডের সব নাম। নিজের গায়ের ওজনের চেয়ে একটি ব্যাগ নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি চলে পড়াশোনা। মাঠে যাওয়ার বা সিনেমা দেখার সময় তার নেই।

এটা কোনো ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা? কোনো বাবা-মা তার সন্তানকে বলেন না,যে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে না, মানুষ হও। তাহলে আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে যে কাজে বড় হবে? যে বাবা-মার সম্মান রক্ষা করতে জিপিএ৫ না পেয়ে আত্মহত্যা করবে না?

দেশে প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি তে জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক ছাত্র-ছাত্রী কলেজ অথবা ভার্সিটিতে উঠার পর ভালো পরিবেশের অভাবে তাদের মেধাকে হারিয়ে ফেলে নষ্টদের দখলে চলে যায়। পরবর্তীতে অনেকেই পড়াশোনায় ভালো করতে না পেরে নেশা জগত কে আপন করে নেয়।

তখন আস্তে আস্তে তাদের মেধা শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে কোনোরকমে গ্র্যাজুয়েট কমপ্লিট করলেও ভালো চাকরি পাই না, হতাশায় ভোগে এবং সাফল্যের অর্ধেক পথ হেঁটে গিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে নিজের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। আর অন্যদিকে অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা জিপিএ-০৫ না পেয়েও সফলতা শিখরে পৌঁছেছে।

সেই সফলতার কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে তারা জিপিএ-৫ এর চিন্তা না করে নিজেকে গড়ে তুলেছে একজন নৈতিক ব্যক্তি সম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তুলেছে সামগ্রিক দিক দিয়ে। কারণ তারা মনে করে জিপিএ-৫ পাওয়া মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় হলো একটি বই পড়ে কিছু শিখা এবং সে শিক্ষাকে বাস্তবে রূপদান করে নিজের জীবনকে অতিবাহিত করা।

শুধু জিপিএ-৫ পেলে যে শিক্ষিত হয়ে উঠবে তা কিন্তু নয়, কারণ একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় শিক্ষিত মানুষের পিতা-মাতা বেশি বৃদ্ধাশ্রমের থাকে। এর উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে আমাদের নৈতিক শিক্ষার অভাব। শিক্ষিত মানুষ মাত্রই স্বশিক্ষিত নয়, সুশিক্ষিত মানুষ হতে হলে অবশ্যই নিজেকে নৈতিকতা সম্পন্ন, স্বশিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

কিন্তু আজকের বাবা-মা নৈতিকতার কথা না ভেবে ছেলে-মেয়েকে শুধু পড়ায় পড়ে সন্তানটি তার বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, রেল ইস্টিশন বা মধুপুর গজারিবনে রেখে আসে। এ কাহিনী নতুন নয়। গত ৩১ মে ২০২০ ইংরেজি তারিখে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। যার পাসের হার ছিল ৮২.৩ শতাংশ।

এতে অধিক পরিমাণে অনেক ছাত্র-ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় যারা অকৃতকার্য হয়েছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন জেলায় ৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে এর পেছনে কারণ কি? পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে তার মধ্যে- আত্মহত্যা হওয়ার করার পেছনে রয়েছে অভিভাবকের মানসিক চাপ যা তারা সহ্য করতে পারেনি। সকল ছাত্র-ছাত্রী চাই জিপিএ-৫ অথবা ভালো রেজাল্ট করে পাস করতে।

কিন্তু অভিভাবকগণ সেটা বোঝনা। অভিভাবকরা দিন দিন মানসিক প্রেসারে রেখে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অভিভাবকরা বিভিন্নভাবে ছেলেমেয়েদের মানসিক প্রেসার দিয়ে থাকে যেমন- জিপিএ-৫ না পেলে পড়াশোনা করাবে না, মেয়ের বেলায় বিয়ে দিয়ে দেবে, ছেলের বেলায় বাসা থেকে বের করে দেবে ইত্যাদি।

আমাদের অভিভাবকদের হতে হবে মানবিকবোধ ও নৈতিকতায় প্রখর। অণ্যায় বা দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মধ্যে থেকেও সে নিজেকে মানবিক গুণাবলী ও সৎ চরিত্র সম্পন্ন মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবে। ছাত্রছাত্রীরা ফেল করবে রেজাল্ট একটু খারাপ হতেই পারে। এটা নিয়ে মানসিক চাপ না দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে যাতে ভবিষ্যতে ভালো একটা রেজাল্ট করতে পারে।

ছাত্রছাত্রীরা মানসিকভাবে প্রফুল্ল থাকলে রেজাল্ট ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেসব শিক্ষার্থীরা একটু ব্যর্থ হলেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বা নেয়ার চিন্তা করে তাদের উদ্দেশ্যে বলব ব্যর্থতাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। কোনো কিছুতে সফল না হওয়া মানে পরাজিত নয় ।

বরণ সেখান থেকে উঠে এসে নিজেকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাওয়ার নাম হচ্ছে জীবন আর এটাই হচ্ছে সফলতা। একটা কথা জেনে রাখতে হবে যে, পরিশ্রম করলে সেটা কখনো বৃথা যায় না, আজ নয় কাল পরিশ্রমের ফল ভোগ করতে পারবে। তাই বলব ডিপ্রেশনে না গিয়ে নিজের কথা ভেবে, পরিবারের কথা ভেবে, দেশের কথা ভেবে নিজেকে আত্মহত্যা নামক জঘন্যতম খারাপ কাজের দিকে নিজেকে ফেলে দেবেন না।

তাই আসুন দেশের জন্য, দশের জন্য নিজের ছেলেমেয়েকে জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য মানসিক টর্চার না করে, নিজের সম্মানের ভার কোমল সন্তানের উপর না চাপিয়ে তাকে দেশপ্রেমিক, নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন একজন সুশিক্ষিত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলি।

তাহলে সেই ছেলেমেয়েগুলো নিজের পরিবারের জন্য নিজের দেশের জন্য এবং বিশ্বের জন্য সফলভাবে কাজ করে যাবে এবং নিজেকে একজন আদর্শিক সফল মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে। জিপিএ-৫ কোনো সুশিক্ষিত বিনির্মাণের পরিচায়ক না।

লেখক: নুরুল আমিন জিহাদ- শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ সুইডেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads







Loading...