করোনাকালে মানবিক হোন

দৈনিক মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ০৪ জুন ২০২০, ০০:২৪,  আপডেট: ০৪ জুন ২০২০, ০০:৩৮

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব, তার চিন্তার মধ্যে দিয়েই প্রমাণ করে। একমাত্র মানুষের মাঝে মানবিক সবগুণ বিদ্যমান রয়েছে বিধায় মানুষকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু সময়ে-অসময়ে সেই মানুষরূপী কিছু অমানুষের অমানবিক কর্মকাণ্ড মানুষকে শ্রেষ্ঠ থেকে সর্ব নিকৃষ্ট স্থানে নামিয়ে দেয়।

কোনো কোনো সময়ে মানুষরূপী কিছু অমানুষের কর্মকাণ্ড এমন অমানবিক ও মর্মান্তিক হয়ে থাকে যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তেমনি এক অমানবিক ও মর্মান্তিক ঘটনার শিকার ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সাহাব উদ্দিন (৫৫)। জীবনের তাগিদে, বৌ-বাচ্চা, সংসার চালাতে রুটি রোজগারের পথ হিসেবে বেছে নেন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের এক পেট্রোল পাম্পের কর্মচারীর চাকরি?।

জীবন স্বাভাবিকভাবে জীবনের গতিতে চলে যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করে সাহাব উদ্দিনের কর্মক্ষম শরীরজুড়ে নেমে আসে রোগের ছায়া। শরীরে হানা দেয় জ্বর। শরীরের জ্বর-ব্যথা নিয়ে আপনজনদের ছায়াতলে থাকার জন্য বাড়িতে চলে আসেন সাহাব উদ্দিন। ৩০ মে শনিবার তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, জ্বরের তীব্রতাও বেড়ে যায়।

অসুস্থ শরীর, জ্বরের উপসর্গ নিয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। এ সময় তার স্ত্রী-সন্তানরা মনে করে সাহাব উদ্দিন করোনায় আক্রান্ত। তাই ভয়ে তার স্ত্রী-সন্তানরা তাকে একটি ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে দেয়। কারণ কী? কারণ খুব সাধারণ। তার জ্বর-মানে করোনা!

দরজার ভেতরে আটকে থাকা সাহাব উদ্দিনের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তিনি দরজা খোলার জন্য বারবার আকুতি জানান। প্রচণ্ড ক্ষুধায় খাবার চান। তৃষ্ণা মেটাতে এক গ্লাস পানি চান। কিন্তু তার স্ত্রী-সন্তানরা কেউ তাকে খাবার বা পানীয় দেয়নি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে।

পুরোটা দিন এভাবে বদ্ধ রুমের মধ্যে তিনি গড়াগড়ি করেছেন। রবিবার রাতের কোনো এক সময়ে ছটফট করতে করতে জীবন প্রদীপ নিভে যায়। সাহাব উদ্দিনের স্ত্রী-সন্তানদের দাবি তার মধ্যে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ রয়েছে। অথচ তার শরীরে করোনা ভাইরাস আছে কি-না সেটি তখনা নিশ্চিত না।

সেদিন সকালেই তিনি শনাক্তের জন্য নমুনা দিয়ে এসেছিলেন। আমি ধরেই নিচ্ছি,সাহাব উদ্দিনের শরীরে করোনা পজিটিভ, সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু তাই বলে কি একজন করোনা আক্রান্ত রোগী এমন অমানবিকতার শিকার হবেন! আর ব্যাপারটা এমন না যে, পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে সবাই আক্রান্ত হবে, সবাই মারা যাবে।

প্রাণ থাকতে তার উপর এই নির্মমতা আমাদেরে শেখায় আমরা নির্মম হয়ে গেছি। সাম্প্রতিককালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের প্রতি আমাদের দেশের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে চরমভাবে ব্যথিত করছে। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনা যে কাউকে আঘাত করবে ভীষণভাবে।

ঘটনাটা ঘটেছে টাঙ্গাইলের সখিপুরে। ঘটনা হলো- মায়ের যোগ্য সন্তানরা বলেছে ‘মা, তুমি এই বনে এক রাত থাক। কাল এসে তোমাকে নিয়ে যাব’ এমন কথা বলেই ৫০ বছর বয়সী মাকে শাল-গজারির বনে ফেলে চলে যান তার সন্তানরা। ওই বৃদ্ধা মা করোনা ভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে সন্তানরা এমন ঘৃণিত জঘন্য কাজটি করেন।

পরে দিবাগত রাত দেড়টার দিকে উপজেলা প্রশাসন ওই বৃদ্ধাকে বন থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠায়। বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে করোনায় আক্রান্তদের যতটা সম্ভব হোম কোয়ারেন্টাইনে রেখে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা হয়। এক্ষেত্রে নিজেদের সুরক্ষা বজায় রেখেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশের মানুষও তাকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করে।

তার বা পরিবারের মানসিক শক্তি যেন ভেঙে না পড়ে সেদিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়। মোটাদাগে করোনা আক্রান্তদের প্রতি মানবিক আচরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের দৃশ্যপট পুরো উল্টো। এখানে কোনো ব্যক্তির করোনা শনাক্তের খবর ছড়িয়ে পড়লেই তাকে বা তার পরিবারকে দুর্বিষহ কষ্টের মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

আশপাশের মানুষজন আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে নানাভাবে মানসিক টর্চার করে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের প্রতি চরম অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণের কারণেই এখন অনেকেই ভয়ে আক্রান্তের খবর গোপন রাখার চেষ্টা করে। সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত এক অন্তঃসত্তা নারীর তার করোনায় আক্রান্তের খবর গোপন রাখায় ডেলিভারি করার সময় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেলে কর্মরত ২৭ জন চিকিৎসক, ১৩ জন নার্স ও ৩২ জন স্টাফ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজেও এমন ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার।এভাবে তথ্য গোপনের চেষ্টা চলতে থাকলে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ অদৃশ্য অনুপাতে বাড়বে। ফলে আমাদের বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। তাই এ বিষয়ে সতর্কতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতারও বিশেষ প্রয়োজন এবং এ সচেতনতা সমাজের প্রতিটা মানুষের মধ্যে জোরদার করতে হবে।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত যে কেউ হতে পারেন, এটা হওয়া কোনো অপরাধ বা পাপ নয় এমন কি কোনো ঘৃণারও নয়। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে আমি, আপনি যেকোনো সময়, যেকোনো মুহূর্তেই আক্রান্ত হতে পারি। তাই যেকোনো সময় আক্রান্তদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হতে হবে, করতে হবে মানবিক আচরণ।

বাংলাদেশের আর কোথাও যেন ফেনীর সাহাব উদ্দিনের সাথে কিংবা দেশের বিভিন্ন স্থানে বয়ঃবৃদ্ধ মা-বাবাকে পথে ফেলে যাওয়ার ঘটনা না ঘটে। এমন মর্মান্তিক, চরম অমানবিক ঘটনা পুনরাবৃত্তি সমাজকে আরো অমানবিক করে তুলবে। মানুষ হয়েও মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা বন্ধ করতে হবে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিতে হবে। দেশের এই ক্রান্তিকালে একে অপরের প্রতি বাড়িয়ে দিতে হবে মানবতার হাত, করতে হবে মানবিক আচরণ। গড়তে হবে এক মানবিক পৃথিবী।

লেখক: ইমরান ইমন- শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads







Loading...