অর্থনীতির চাকায় মাড়াচ্ছে কার পাকা ধান?

দৈনিক মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৩ জুন ২০২০, ১০:২২

অর্থনীতির চাকা ঘোরানো জন্য আমরা যৎসামান্য অপেক্ষা করেই সংকটের ঘোর রজনীতে প্রায় সবধরনের উৎপাদনের যন্ত্রপাতির ইঞ্জিন চালু করে দিয়েছি। কারণ অভাবে-সংকটে আমাদের শ্রমিকরা নাকি সর্বস্ব বিক্রি করে দিচ্ছে।

এর মধ্যেও আমাদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। আমাদের অভিধানে মানবিকতা বলেও তো একটা কথা আছে, সে কথাটা রক্ষার জন্য আমাদের একে অপরের পাশে দাঁড়ানো আজ জরুরি আমাদের একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে।

তাই এক টানে মানবিকতার পুরো কাপড় না ছিঁড়ে কিছুটা করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে যদি জোড়া লাগিয়ে উপকারে আসা যায়, তাই বা কম কিসের। ভনিতা রেখে এবার একটু ঝেড়ে কাশা যাক। নিজে ঘরের ভেতর লুকিয়ে থেকে পিতাকে বাইরে পাঠিয়ে সাবধানে যেও বলার মতো মস্করার খবর পেতে পেতে নিজেকে কখনও ঘাতক মনে হয়। এও কি সম্ভব।

শুধু এটা কেন গর্ভধারিণী মাকে পথে ফেলে দিয়ে যায় এমন সন্তানদের দেখা মিলছে হরহামেশাই। এ কোন সমাজ, মানবিকতার এ কোন রূপ? পুরুষ জাতির একশ একটা দোষ ধরে নারীবাদ ঝাড়া আমিও একজন, তবে এবারের প্রসঙ্গটা ভিন্ন। দিব্যদৃষ্টি বলছে, ও দেখ গাধা জাতিটা প্রাণপনে নট আউট থেকে মরে যাওয়ার জন্য লেজ ঢেকে দৌড়াচ্ছে।

বলছি আমাদের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত আর প্রান্তিক উপার্জনক্ষম পুরুষগুলোর কথা যারা চাকরিচ্যুত হওয়ার পারিবারিক ও সামাজিক ভ্রুকটিসৃষ্ট মানসিক অনিশ্চয়তাজনিত অপমানের দায় থেকে বাঁচতে চাকরিরত অবস্থায় নট আউট খেতাব নিয়ে মরে যাওয়ার জন্য কাফন বেঁধে রাস্তায় নামে। প্রিয়তমা স্ত্রী, স্নেহময়ী জননী কিংবা প্রাণাধিক সন্তান কিন্তু একবারও বলে না যে প্রয়োজনে কৃষক হয়ে মাটির দানায় আসন পাতব, তবু ঘরে থাকো, বাঁচ।

বলবে কী করে! অর্থনীতির কী হবে? লোকে কী বলবে? সমাজ হাসবে না? আত্মীয়রা মজা পাবে তো! এত কষ্ট অবলা জাতি সইবে কী করে, এর চেয়ে বেশ ভালো বুকভাঙা কান্না। আমরা কাঁদতে জানি, চোখের ভেতরে আগুন নেই তবু জল তো আছে। অসময়ে কাজে আসবে।

এদিকে রাষ্ট্র তো আছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। অযুত নিযুত লাখো খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এ বায়স্কোপ সদৃশ দৃশ্য দেখছে তো সবাই। ব্যবসায়ী দেখছে, নিম্নবিত্ত দেখছে, শিল্প দেখছে, বাণিজ্য দেখছে, স্বাস্থ্য দেখছে, শিক্ষা দেখছে, প্রশাসন দেখছে। দেখছে, দেখবে। বসে নেই কেউ। কিন্তু ওই যে মধ্যবিত্ত (পাতলা কাপড়ের জাতি), তাদের দেখবে কে? উচ্চবিত্ত(?) ত্রাণ দেবে, নিম্নবিত্ত(?) ত্রাণ নেবে।

সাহায্য দিয়ে মহান হওয়া আর সাহায্য নিয়ে কৃতার্থ হওয়ার বল পাসের খেলায় মধ্যবিত্তের কোনো রান নেই। কিন্তু মধ্যবিত্তের ক্রমহ্রাস মান গোলায় যে টান লেগেছে তার কী হবে? এরা তো আবার ইঁদুর প্রজাতি, গর্তে গর্তে বাস। মুখ লুকিয়ে মরবে আর নিঃশ্বাসের বিষে মারবে, সিন ক্রিয়েটের ঝামেলা এড়াতে আওয়াজে তালা দেবে। বলবে শুধু ড্রইংরুমের চায়ের কাপে, এখনো কাপড় ছেঁড়া শুরু হয়নি যে, কেবল নরম হতে শুরু করেছে। বাসায় পেঁয়াজ যেহেতু এসেছে, এরা ভাবছে শেষ অবধি চিনিও আসবে।

তবে এটা অন্য কথা, উপরে উল্লেখিত জোড়াতালির লুঙ্গি পরিয়ে এক শ্রেণি যে শ্রমিকের লজ্জা ঢাকবেন তার জন্য কিন্তু পকেটটা কাটা পড়বে পাতলা কাপড়ের মধ্যবিত্তের। অর্থাৎ যিনি থুথু লাগিয়ে নিজে ছুড়ছেন এবং যার ব্যাটের দিকে ছুড়ছেন তাদের খেলার বলটা হচ্ছে মধ্যবিত্ত ইঁদুর। আর সহজভাবেই অনুমেয়, এ খেলায় রানের মালিক উচ্চবিত্ত। সাপও মরে আর লাঠিও অবিকৃত থাকে পরবর্তী নিশানায় সঠিকভাবে কার্যশীল হওয়ার জন্য। মাঠের উত্তেজিত দর্শকরা করোতালির সাক্ষী গোপাল।

না কাঁদলে মাও খাবার দেয় না (না জানান দিলে জানবে কি করে যে সন্তানের তার ভীষণ খিদে পেয়েছে), তবে রাষ্ট্র কী দেবে? কার হাতে দেবে, ক টুকরো দেবে? আর এই যে সীমিত আকারে বাস চলবে সংক্রমণের ভয়ে, তাহলে আসন প্রার্থী বাকিদের কী হবে? গণপরিবহনের শুধু পরিবহন যদি থাকে (?) তবে গণ’-এর কী হবে?

গণ তো আবার ঘুরেফিরে মধ্যবিত্ত ইঁদুরেরাই (উচ্চবিত্ত বিমানে উড়ে, অন্যথা ব্যক্তিতে গত হয়ে কারে চলে। আর নিম্নবিত্তের পায়ের চামড়া জন্মত অবিনশ্বর, কিংবা যেখানে রাত সেখানেই কাত)। অর্থনীতির চাকা যেই মহাসড়ক হয়ে সচল হবে সেটা কি তবে মধ্যবিত্তের বুকের হাড্ডি মাংস চিবিয়ে পুরনো সঞ্জীবনী শক্তি ফিরে পাবে?

ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের পরবর্তী পোষানো জমা, বাসের বাড়তি ভাড়ার অংক কমা, সীমিত আকার রক্ষায় গোনা সিএনজি ভাড়ার বিশেষ প্রণোদনা, শিশুর ইদের বকেয়া জামা ইত্যাদির মুখ দেখতে মধ্যবিত্ত বাঁচবে তো?

নাকি জনগণ একটি প্রতিনিধি সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে বৃত্তের মাঝখানটা বাদ পড়ে যাবে হিসেবের খাতা থেকে, আর চাকা বয়ে নিবে লাশ ঠিকানাবিহীন প্রান্তরে যেখানে কৈফিয়তের দরজা বন্ধ ।

লেখক: শারমিন সুলতানা- বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।




Loading...
ads






Loading...