করোনার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ

কোয়ারেন্টাইন বুমেরাং হচ্ছে পদে পদে

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৩ জুন ২০২০, ১০:০৯,  আপডেট: ০৩ জুন ২০২০, ১০:১৪

দেশে করোনার পরিস্থিতি ক্রম অবনতির দিকে যেতে থাকলে গত ২৬মার্চ থেকে ৪এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এরপর দফায় দফায় ছুটি বাড়তে থাকে। শুরু থেকেই সরকারের সাধারণ ছুটি নিয়ে একটা বিভ্রান্তি ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের পর অনেকে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবানসহ বিভিন্নস্থানে বেড়াতে গেছেন।

আর সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর তো মানুষ ঈদের ছুটি ভেবে দলে দলে গ্রামে ছুটেছেন করোনাকে সঙ্গী করে। দিন দশেক পরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে কানামাছি খেলে আরেকদফা করোনার বিস্তার। দেশে করোনায় প্রথম রোগী ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী ৩০ মে পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছিল।

তবে এটি আর না বাড়ানোয় এখানেই শেষ হলো দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা এ ছুটি। টানা ৬৬ দিনের ছুটি শেষে শুরু হলো লকডাউন মুক্ত বাংলাদেশ।অফিস-আদালত খুলেছে। মার্কেট-দোকানের ঝাঁপি নেই। গণপরিবহণও ছুটে চলছে। ফলাফল যা হবার তাই। স্বাস্থ্যবিধি যেন উঠে গেছে। হাটবাজারে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই দেশ করোনার ভয়ংকর থাবার নিচে দাঁড়িয়ে আছে।

কারো কারো মুখে নামকাওয়াস্তে একটা মাস্ক। তাও আবার গালগল্পের সময় খুলে কাছাকাছি ঘেঁষে কথা বলছেন। সিগারেটও ভাগেযোগে খাচ্ছেন। আবার করোনা নিয়ে করনীয় বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ কথাও বলছেন। কোমরে শক্তি থাকলে সুন্দরি কমলারা নাচবেই। ঠেকাবে কে? আমরা মরতে চাই না, কিন্তু স্বর্গে যেতে চাই। বিষ গিলতে চাই। নিয়ম মানতে চাই না।

কিন্তু করোনা থেকে সুরক্ষা চাই। এতো কিছুর মধ্যেও করোনা মহামারি আপাতত আমাদের হাতমুখ ধোয়ার অভ্যাস গড়ে দিতে পেরেছে। আরো কিছু বদবৈশিষ্ট্যেও বাধ সাধতে পেরেছে। কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অবিরাম বেত মেরে তাদের সভ্য বানাতে পারে না। নাগরিকদেরও সভ্য হওয়ার ইচ্ছা থাকতে হয়। সুস্থ থাকা ও রাখার চর্চাও করতে হয়। হতে পারে বড় জনসংখ্যার ছোট দেশটিতে রাস্তাঘাটে শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করা কঠিন।

গণপরিবহনে অন্যের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলা মুশকিল। বাসের হাতল, সিঁড়ির রেলিং, লিফটের বোতাম, রেস্টুরেন্টের চেয়ার-টেবিল-গ্লাস-প্লেট-তোয়ালে, দোকানির দেওয়া প্যাকেট না ছুঁয়ে থাকা সম্ভব নয়। এরপরও সাবধানতার কিছু বিষয়আসয় থেকে যায়। যেখানে সরকারের বাইরে মানুষের নিজস্বার্থেই করেনীয় অনেক কিছু রয়েছে।

ব্যক্তিপর্যায়ে মানুষকে সাফসতুর রাখার দায়িত্ব সরকারের নয়। সরকারের পক্ষে সেটা সম্ভবও নয়। নিজেরা ভাইরাস ছড়ালে, জন্ম দিলে সরকার কী করবে? যত্রতত্র থুতু ফেলা, পানের পিক ফেলা এবং নাক ঝাড়া বন্ধ করতেও সরকারের আদেশ-অনুরোধ লাগছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় এই করোনার মাঝেও কফ-থুথু, পানের পিক কদ্দূর কমেছে?

ফুটপাতে কুকুরের মতো পেসাব-পায়খানা করার স্বাধীনতা এখানে অবারিত। মানুষ হ্যান্ডশেক ছাড়াও আলগা মহব্বত দেখাতে গায়ে হাত দিয়ে কথা বলে। দুপুরবেলা সিটি কর্পোরেশনের টুপিখোলা ময়লার গাড়ি রাস্তায় জয়রাইড দেয়। ব্যাংক-নোটও একেকটি ময়লার ভাগাড়। একবার স্পর্শ করলে করোনার আনন্দ র‌্যালি করে শরীরে ঢোকার গ্যারান্টি রয়েছে। এসবের জন্য কাউকে দায়ী করা হয় না। দায়ী করা যায়ও না।

কোথাও জবাব দিতে হয় না! ভাইরাসের এ রকম বাম্পার হ্যাচারিতে নাক ডুবে থাকার পরও এখনতক বেঁচে থাকা পরম সৌভাগ্য অনেকের জন্য। কারণ করোনাসহ নানা ভাইরাসের বিস্তার ঘটাতে আমরাই যথেষ্ট। আলামত এবং পারিপার্শ্বিকতায় জানাই ছিল করোনা থেকে বাংলাদেশ রেহাই পাবে না। কার সাথে কথা বলছি, ঘুরছি-একটুও ভ্রুক্ষেপ নেই।

সেল্ফ কোয়ারেন্টাইন বুমেরাং হচ্ছে পদে পদে। স্বাভাবিক স্বাস্থ্যবিধিও মানতে নারাজ আমরা। করোনা মোকাবিলার নামে মাস্ক পরে ঘুরছি। আবার এক বিড়ি ফুঁকছি চারজনে। মাস্ক আর স্যানিটাইজার নিয়ে যে কাণ্ড ঘটছে তা আমাদের অভ্যাস বদলানোর বার্তা দেয় না। কিছু ঘটনায় মনে হয় করোনা মহামারি নিয়ে আর কথা বলা অনেকটাই অর্থহীন।

মহায়োজনে যার যা খুশি করছেন। করাচ্ছেন। ক্ষমতাবাজিরও কমতি নেই। থেমে নেই চুরি-চাটামিরও। দেশের কিছু মানুষের এত টাকা চাইলে মাউন্ট এলিজাবেথ বা বামরুনগ্রাদের একটি অংশ নিয়ে আসতে পারেন বাংলাদেশে। তারা হয়তো কোনোদিন ভাবেনি, দুনিয়াতে এমন নিদান কাল আসবে! করোনার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে দেখা গেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ধনী পরিবারের সদস্যদেরও।

এমন সব পরিবারের লোকজন করোনার কাছে পরাজিত হচ্ছেন বলে সমাজের নানা স্তরে বড়সড় আলোচনা শুরু হয়েছে। এই শ্রেণির মানুষজন সাধারণ সর্দি, জ্বর বা গা ব্যথা হলেও সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, ইউরোপে দৌড়ঝাঁপ করেন। সারাক্ষণ দেশের চিকিৎসকদের বিষোদগার করা এই শ্রেণি কোনোদিন ভাবেনি এদের কাছেই যেতে হবে তাদের। তাদের অনেকে করোনায় আক্রান্ত। মারাও যাচ্ছেন অনেকেই।

বিত্তবানরা নিজেদের অর্থে বিদেশে গিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মাপাতেই পারেন। কিন্তু, যে রাজনীতিবিদরা জনগণের অর্থে হাত চুলকানি -চোখের পাতা নড়ার রুটিন চেকআপ করাতেও সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে চলে যান নিয়মিত বিরতিতে। করোনার সময় সেই সুযোগ মেলেনি। অথচ ব্যবসায়ী রাজনীতিবীদরা দেশে একটি মানসম্পন্ন হাসপাতাল বানানোর চিন্তা করলেন না।

দেশের মানসম্পন্ন চিকিৎসকদের কাজে লাগালেন না। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে দুর্নীতির মঞ্চ বানিয়ে রাখলেন। বিপদে পড়ে এখন তাদের কী উপলদ্ধি তারা আর স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। তবে, নমুনা সম্ভাবনার নয়। এখনও তাদের নজর বিশেষ ব্যবস্থার দিকেই। এই দুর্যোগ সময়েও ম্যাজিক দেখিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় বিদেশও চলে গেছেন কয়েকজন।

অন্যদিকে, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসার অভাবে নয়, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে পথেই অনেকের মৃত্যু হয়েছে। এটা এখন আর বড় রকমের হায়-আফসোসের ঘটনা নয়। করোনা পরিষ্কার করে দিল আমাদের স্বাস্থ্যখাতের অগোছালো দশা। সংক্রমণের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতা, ভুল পথে হাঁটা নিয়ে কথা হয়েছে। এর পরিণামে জনগণের ঝুঁকি কেবল বেড়েছে।

শুরুতে বলা হয়েছিল বিদেশ ফেরতদেরকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তা করেনি। ইতালিসহ ফেরত সকল প্রবাসীদের মুক্ত করে দিয়েছেন সে সময়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শুরু থেকে বলেছিল শুধু আইইডিসিআর-এর ওপর পরীক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে না দিতে। কিন্তু তারা কারো কথা শোনেনি। পরে করোনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে আইইডিসিআরের ওপর থেকে কর্তৃত্ব সরিয়ে ফেলা হয়।

এ ক্ষেত্রেও ফলাফল যা হবার তাই হয়েছে। সামনে আরো হবে। কে যে এখন করোনা আক্রান্ত নয়,সেটা বোঝাই কঠিন। অন্যান্য রোগীরাও এক সঙ্কটে পড়ছেন। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ক্রমশ করোনা রোগী বাড়ার ফলে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। এ সমস্যা একদিনে হয়নি। এটা ঘটনাচক্রে প্রকাশ পেল মাত্র।

বাজার অর্থনীতির তোড়ে হাসপাতালগুলোর প্রধান কাজ চিকিৎসাসেবা নয়। মানবতা নয়। ব্যবসা। চিকিৎসাও পণ্য। এর প্রাপ্যতা নির্ভর করছে গ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতার ওপর। দেশে দেশে করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে কিছু বার্তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালির মতো যে সব দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা যত বাণিজ্যিক, সেসব দেশে তত বেশি প্রাণহানি হয়েছে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো যেসব দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা যত গণমুখী সেসব দেশে মৃত্যু তত কম।

বিশ্বপরিসরের কিছু রাজনীতি-কূটনীতির হিসাবও থেকে যাচ্ছে নিষ্পত্তিহীন। করোনায় মৃতের হিসাবে চীনকে টপকে ভারত এখন শীর্ষে। এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ভারতে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার প্রায়। আর চীনে ৪ হাজার ৬৩৮। স¤প্রতি লাদাখ সীমান্তে চীন ভারতের উত্তেজনাকেও আরেক ধরনের করোনা বলতে চান অনেকে। চীনের বাঁশিতে ভারতকে নেপালের হুমকি প্রদর্শনকেও এক জাতের করোনাস্ত্র মনে করা হয়।

এর মধ্য দিয়ে নভেল করোনা আর চীনের টার্গেটের একটা প্রচ্ছন্ন হিসাব মেলানোর মহলও আছেন। তাদের মতে, মৃতের হিসাবে করোনার টার্গেট করা দেশগুলোতে এ মৃত্যু সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি। এক আমেরিকাতেই মরলো লক্ষাধিক। একমাত্র রাশিয়া ছাড়া যেসব দেশে এখনো বেশি মানুষ মরছে সেগুলোও আমেরিকাঘেঁষা পরাশক্তির দেশ।

আক্রান্তের সংখ্যায়ও আমেরিকার পর আছে ব্রাজিল, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স ও জার্মানি এবং এরপরই ভারত। অনেক পেছনে চতুর্দশ স্থানে অর্থাৎ চৌদ্দতম স্থানে আছে চীন। বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬২ লাখের বেশি। এর মধ্যে কেবল আমেরিকায়ই ১৮ লাখ। বাদবাকি গোটা দুনিয়ায়।

লেখক: রিন্টু আনোয়ার- সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




Loading...
ads






Loading...