দানের অঙ্গীকার

দানের অঙ্গীকার - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ০১ জুন ২০২০, ০০:৪৮,  আপডেট: ০১ জুন ২০২০, ১১:৫৮

দানের অঙ্গীকার হলো এমন একটা প্রতিশ্রুতি যেটা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী ব্যক্তি ও তাদের পারিবারিক প্রচেষ্টা, যে তারা তাদের সম্পদের অর্ধেক বা তার চেয়েও বেশি সম্পদ তাদের জীবদ্দশায় অথবা মৃত্যুর পরে উইল করে দাতব্যে দান করবে।

এই দান দ্বারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সবচেয়ে সুবিধাবি ত নিপীড়িত মানুষ উপকৃত হবে এবং এটা একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। আমেরিকার বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেট ২০১০ সালে বিল গেটসও তার স্ত্রী মিলিন্ডা গেটসকে সঙ্গে নিয়ে এটা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এখানে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২৩টি দেশ থেকে ২০৪ জন বিলিয়নিয়ার ব্যক্তি, দম্পত্তি ও পরিবার স্বাক্ষর করেছেন।


তাদের অনেকেই একা অথবা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এটা বোঝাবার জন্য যে এটা তাদের পারিবারিক প্রতিশ্রুতি এবং এই অঙ্গীকারে শুধুু আমেরিকা থেকেই ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ ও বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার সি.ই.ও. ইলেন মাস্ক, নিউইয়র্ক শহরের সাবেক মেয়র মাইকেল-বুক্সামবার্গ, সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা টেডটার্নারসহ ৪০ জন ধনকুবের রয়েছে।

এছাড়াও রয়েছে আমাদের ভারতীয় ধনকুবের ইউপ্রো লিমিটেডের চেয়ারম্যান আজম প্রেমজি এবং আফ্রিকা মহাদেশের তাঞ্জানিয়ার ধনকুবের মোহাম্মদ দিওজি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী শেখ মোহাম্মদ বিন মুসাল্লাম বিন হাম আল আমেরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ধনী ব্যক্তিরা।

ওয়েলথ এক্সের রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের সম্পদের পরিমাণ ২০২২ সালের মধ্যে ৬০০ বিলিয়ন ছাড়াবে এবং এই টাকা দিয়ে তারা প্রত্যেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিশ্বকে অধিক শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য করা, প্রতিটা প্রান্তে প্রতিটা লোকের জন্য। ব্যক্তিগতভাবে আমরা অনেকেই এদের ভক্ত।

এদের সম্পর্কে জানি অথবা যদি জানার চেষ্টা করি এবং আমরা যদি মার্ক জাকারবার্গের পোস্টগুলো পড়ি যেমন (১) আজকে বিষ্টের (তার কুকুর) ৬ষ্ঠ জন্ম দিন POSTED (১১-০১-২০১৭) (২) আমি যখন শিশু ছিলাম POSTED (১৬-১২-১৬) (৩) এক বছর আগে প্রিসিলা এবং আমি এই চিঠিটা ম্যাক্সের কাছে লিখেছিলাম POSTED (০২-১২-১৬) ইত্যাদি। এ ছাড়াও আমরা জানি বিশ্বের অনেক ধনী ব্যক্তিদের আয়েশি জীবন সম্পর্কে।

এই দানের অঙ্গীকারের মাধ্যমে তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীকে সুখী ও সমৃদ্ধির চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের তৃতীয় বিশ্বের রোহিঙ্গা শিশু যার নিথর দেহ পড়েছিল নাফ নদীর তীরে এবং ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর, তিন বছর বয়সী শিশু আয়লান কুর্দির ছোট্ট দেহটি উপুড় হয়ে পড়েছিল তুরস্কের সমুদ্র সৈকতে।

ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশী সিরিয়ার নাগরিক ছিল আয়লানের পরিবার। সম্প্রতি এল সালভাদরের নাগরিক ২৫ বছর বয়সী অস্কার আলবার্তো মার্টিনেজ, তার মেয়ে ২৩ মাস বয়সী আঞ্জি ভ্যালেরিয়া এবং ২১ বছরের স্ত্রীকে নিয়ে গত (২৩-০৬-১৯) রোববার মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। প্রত্যাশা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়ার।

অবৈধ ও বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে মার্কিন মুলুকে পা দেয়া আর হলো না তার। রিও গ্রান্দে নদী পার হতে গিয়ে নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে অস্কার ও তার মেয়ে ভ্যালেরিয়ার। পরেরদিন সোমবার তীরের কাছাকাছি বাবা-মেয়ের মরদেহ ভেসে ওঠে। তবে প্রানে বেঁচে গেছেন অস্কারের স্ত্রী।

কিস্তু তাকিয়ে দেখা ছাড়া তার কিছু করার ছিল না। বাবা-মেয়ের মৃতদেহের এই ছবি ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে প্রতিবেদন। জীবন আর সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান। এটা জেনেও দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে শত শত নাগরিক তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটু উন্নত জীবনের আশায় ছোট ছোট নৌকায় পাড়ি দেয় ভূমধ্য সাগর।

উইরোপ পৌঁছানোর প্রত্যাশায়। দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য। আর এক ফিলিস্তিনি শিশু আলি দাওয়াপশির পোড়াদেহ পড়েছিল ইসরালি আগ্রাসনের দ্বারা ভস্মীভ‚ত তার বাড়ির পাশে। হাজারও শিশু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষত আফ্রিকায় অনাহারে, অর্ধহারে, অপুষ্টিতে ভুগছে ন্যূনতম বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার থেকে বি ত। সেই খবর তারা কতটুকু রাখে অথবা সময় পায়।

আমরা জানি কোনো সাধারণ মানব জীবনই কোনো অসাধারণ মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম মূল্যবান নয়। কোনো শিশুরই ভাগ্য লটারির বিষয়বস্তু হতে পারে না যে সে কোথায় কোনো পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেছে, তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮-টঘ তথ্য অনুসারে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ২০১৭ সালে ৮২১ মি: পৌঁছেছে, বিশ্বে এখনো প্রতি নয়জনের একজন মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে।

Poverty Report ২০১৮ অনুযায়ী বিশ্বে ১০.৯% মানুষ অতি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে এবং সারা পৃথিবীতে শহরে যে লোক বাস করে তার এক তৃতীয়াংশ বস্তিতে অমানবিক জীবনযাপন করে। বিশ্বে এখনো ৬৩ মি: শিশু তাদের মৌলিক অধিকার শিক্ষার সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বিতারিত।

যদিও দানের অঙ্গীকারে আবদ্ধ বিলিয়নিয়ারদের ৬২% ই তাদের দানের একটা বড় অংশ শিক্ষায় করে থাকে। একটা ধনী দেশ অথবা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব তখনই হবে যখন প্রতিটা শিশু সমান সুবিধা প্রাপ্ত হবে। যেখানে কোনো বিবেচনায় থাকবেনা তার বংশ পরিচয়,কোথায় বসবাস, তার লিঙ্গ, জাত, পেশা, শ্রেণি অথবা যেভাবেই তাকে বিশ্লেষিত করুন।

UNHCR (Un High Commissioner For Refugees) তথ্যমতে বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লোকজনের সংখ্যা ২০১৬ সালের শেষে ৬৫.৬ মিলিয়নে পৌঁছেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর সর্বো”” এবং ইহা ২০১১ সাল থেকে ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে আমরা যদি এই ৬৫.৬ মি: লোকজন, যারা স্থানচ্যুত তাদের একটি রাষ্ট্রে রাখি, তা পৃথিবীর ২১ তম বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

ধরুন ২১.৫ মি: রিফিউজি, ৪০.৮ মি: অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুত লোক এবং ৩.২ মি: আশ্রয় প্রার্থী তারা সব একটি রাষ্ট্রে বসবাস করে। এই দেশটি এমন একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হবে যা অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে তিনগুণ বড় এবং এটা হবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির দেশ।

এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হবে ৯.৭৫% প্রতি বছর। যার অর্থ এই প্রবৃদ্ধি যদি বজায় থাকে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে এটা পৃথিবীর ৫ম বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান হলো এই কল্পিত রাষ্ট্র সম্পর্কে যা আমাদের বিস্মিত করবে। এই রাষ্ট্রটি হবে পৃথিবীর সবচেয়ে গরিব এবং বহুসমস্যায় পরিপূর্ণ, সামাজিক সুযোগ-সুবিধা এমন কি মানবিক ও মৌলিক অধিকার বি ত, অবহেলিত এক জনগোষ্ঠী।

একটি শান্তিময় পৃথিবী, যা আমাদের প্রতিনিয়ত চেষ্টা তার জন্য এটা কত বড় ভয়াবহ দুঃসংবাদ। এই বাস্তবিক ধনীর বিশ্বে অথবা ওই সমস্ত বিলিয়নিয়ার, যারা পৃথিবীর বেশির ভাগ সম্পদ দখল করে আছে। সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে। তাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই এই সমস্ত লোকদের সাহায্য করা এবং তৈরি করা সকল মানবিক সুযোগ-সুবিধা পৃথিবীর সবচেয়ে সুবিধাবি ত লোকজনের জন্য।

এটা আমাদের সবারই জানা এবং সবাই অনুভব করছি, যে আমরা এক অন্ধকার যুগে বাস করছি। আন্তর্জাতিক উন্নয়নের নামে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের জাতি গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলে ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাচ্ছি পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দ্বদ্ব এবং অমানবিক কার্যকলাপে। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি বিশ্বের দ্রæত রূপান্তর, যা বাস্তব পরিবর্তন এর মাধ্যমে এসেছে।

এটা একটা ভালো শুরু ও সুসংবাদ কিছু বছর ধরে আমরা ১৭ Sustainable Development goals (SDG) কর্মসূচি হাতে নিয়েছি, যা সর্ব সম্মতিক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জন করব। সবার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যেমন ব্যক্তি, সরকার, প্রাইভেট সেক্টর ও সুশীল সমাজের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। তাহলেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব এবং দানের অঙ্গীকারের সুফল সমহারে পৃথিবীর সকল প্রান্তে পৌঁছে পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ করে তুলতে পারব ইনশাল্লাহ্।

লেখক : মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম- বিশ্লেষক।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...