এমএফএস এজেন্ট: করোনাকালের উপেক্ষিত যোদ্ধা

দৈনিক মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ২২ মে ২০২০, ১৩:৩২

করোনার মরণ ছোবলে মানুষ যখন খাঁচায় বন্দি পাখির মতো মুক্তির নেশায় কাতর, অর্থনীতির চাকাগুলো যখন স্থবির, তখন অনেকের মনে স্বস্তি ধরে রেখেছে মোবাইল ব্যাংকিং। নিরাপদ দূরত্বে থেকে ঘর থেকেই প্রয়োজনীয় লেনদেনসহ জিনিসপত্র কিনতে বা বিক্রি করতে পারছেন অসংখ্য নগরবাসী।

কিন্তু এজেন্ট স্বল্পতার কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে অনেককেই। পরিস্থিতির কারণে অনেক এজেন্ট তাদের দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। তাই মহামারীর এ সময়ে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস অপারেটরদের খোলা রাখার সরকারি পরিকল্পনাটি নিয়ে অসংখ্য মানুষ তুষ্ট হলেও রুষ্ট অনেকেই।

রাজধানীর মালিবাগে বসবাসরত আমার প্রতিবেশী মিসেস সামসুন্নাহার তাদেরই একজন। বিধবা সামসুন্নাহার ঘরে বসেই এতদিন কেনা কাটা করে আসছিলেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বদৌলতে। তিনি জানান, আমি আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা আমার বিকাশ অ্যাকাউন্ট এ ট্রান্সফার করে শপিং সেন্টার থেকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে আসছিলাম।

কিন্তু খোলা বাজারের বেলায় পেলাম ধাক্কা। দোকানিরা নগদ টাকা চায়। গত ১৫ মে বিকেলে, হন্যে হয়ে ঘুরেও এলাকার কোনো মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকান খোলা পেলাম না। চলমান লকডাউনের জন্য কোনো এজেন্টের দোকান খোলা না থাকায় নিজের টাকা ‘ক্যাশ আউট’ করতে পারলাম না।

শুধু সামসুন্নাহার নন, অনেক লোকই এখন বিকাশের মাধ্যমে কেনাকাটা করছেন। ঘরে বসে তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা আনতে পারছেন। প্রকাশিত তথ্যমতে, গত বুধবার একদিনেই ৭০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে শুধু বিকাশের মাধ্যমেই। প্রায় ২ লাখ গরিব এজেন্ট এ সুবাদে আয় করতে পারছেন। এসব এমএফএস এজেন্টরা এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কমিশন দিয়ে নিজেদের জীবন ধারণ করছে।

কিন্তু তারা ভালো নেই। তাদের কথা ভাবার সময় এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধানমণ্ডি এলাকার এক এজেন্ট জানান, ‘স্কুল-কলেজ সব বন্ধ, আমার স্টেশনারি দোকান থেকে কেউ এখন আর খাতা, কলম, পেন্সিল কিনতে আসে না। করোনা ভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বাসায় খালি হাতে ফিরতে হয়। কোনো রকমে এখন বিকাশ ব্যবসার কমিশন দিয়ে ৪ জনের সংসার চালাচ্ছি।’

মার্কেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশিরভাগ এমএফএস এজেন্টরা মূলত তাদের প্রধান ব্যবসার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় এমএফএসের এজেন্টশিপ গ্রহণ করে। কিন্তু করোনা পরবর্তী লকডাউন পরিস্থিতিতে এসব এজেন্টের প্রধান ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। লকডাউন সম্পর্কিত সরকারি নির্দেশনায় তাদের কমিশন কমে যাওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মূল চালিকাশক্তি এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে পড়ায় হতাশ অনেকেই।

করোনা মহামারীর এই সময়ে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে আমাদের প্রতিদিনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য এমএফএসের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই, মহামারীর জাঁতাকলে লাখ লাখ এমএফএস এজেন্টর নিষ্পেষিত হচ্ছে। লকডাউন ও জনগণের চলাচল নিয়ন্ত্রণের কারণে তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আংশিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ই-মানির তরলতা ও এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে নগদ অর্থ নিশ্চিতকরণ, সীমিত ব্যাংকিং সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থ জমা দেয়া এমএফএস সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার পরও বিকাশের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এমএফএস সরবরাহকারীরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে লেনদেন পরিচালনা করে আসছে।

একদিনে লাখ গ্রাহক বিকাশের মাধ্যমে তাদের বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করেছেন। বিকাশের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে গ্রাহকরা বেশিরভাগ বিল পরিশোধ, ‘সেন্ড মানি’, ক্রেডিট কার্ড বিল পরিশোধ এবং পণ্য ও ওষুধ ক্রয়ের জন্য তাদের সেবা গ্রহণ করছেন। এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে নগদ ‘ক্যাশ ইন’ ছাড়াও বিকাশ গ্রাহকরা যে কোনো সময়ে সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভিসা এবং মাস্টারকার্ড থেকে তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর করছেন।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরাও কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব চলাকালে তাদের পরিবারের বিকাশ অ্যাকাউন্টে তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্স প্রেরণ করছেন। ফলস্বরূপ, বিকাশ চলমান সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের লেনদেনের প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে।

সন্দেহ নেই যখন বাজার নিয়ে সবাই চিন্তিত, তখন এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা হলেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখছে টাকার তরলতা এবং কেনাকাটার প্রবাহ ধরে রেখে। ক্যাশ-ইনের মাধ্যমে ই-মানি এবং ক্যাশ আউটের মাধ্যমে টাকা সরবরাহ করা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে এমএফএস অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে কিন্তু এমএফএস এজেন্ট এবং ডিস্ট্রিবিউশন কর্মীরা রয়েছে উপেক্ষিত-সরকারের সুদৃষ্টির বাইরে।

কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকা লকডাউন হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এজেন্ট পয়েন্ট খোলা রাখা যাচ্ছে না এবং ডিস্ট্রিবিউশন কর্মীরা টাকা এবং ই-মানির সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারছেন না। ব্যাংকিংয়ের সময় সীমিত করে দেওয়ার কারণে ডিস্ট্রিবিউশন কর্মীরা নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল। সরকার এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকিংয়ের সময় বাড়িয়ে দিয়ে এ ব্যাপারে এমএফএসগুলোকে সাহায্য করেছে।

বর্তমানে মহামারীটির অগ্রগতি এবং লকডাউন পরিস্থিতির কারণে ব্যক্তি পর্যায়ে টাকা লেনদেন, বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন, ইন্টারনেট প্রভৃতি) এবং নগদ অর্থ স্থানান্তর করতে গিয়ে জনগণের দুর্দশা চরম আকার ধারণ করেছে। এমতাবস্থায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ নিজ সুবিধার্থে, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এর মাধ্যমে তাদের অর্থ হস্তান্তর, পণ্য ক্রয়, মোবাইল ব্যালেন্স রিচার্জ এবং বিল পরিশোধ করার দিকে ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ক্ষেত্রে যথাযথ ভ‚মিকা রেখেছে। একটি সার্কুলার জারির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব এমএফএস সেবাপ্রদানকারী সংস্থাসমূহকে নিরবচ্ছিন্ন আর্থিক সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে যথাযথ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। শুধু তাই নয়, এমএফএস কর্তৃক ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেনের সীমা (সেন্ড মানি) পঁচাত্তর হাজার টাকা (৭৫,০০০) থেকে দুই লাখ টাকায় (২,০০,০০০) উন্নীত করা হয়েছে।

মহামারীর এই ক্রান্তিলগ্নে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো চুপ করে বসে নেই। সরকারের আহ্বানে অতি অল্প সময়ে এমএফএস সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লাখ লাখ গার্মেন্টস কর্মীদের এমএফএস অ্যাকাউন্ট খুলে নিশ্চিন্তে এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফ্যাক্টরি কর্তৃক নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মীর এমএফএস অ্যাকাউন্টে বেতন-ভাতা বিতরণ করতে সহায়তা করছে।

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্যাশ-আউট চার্জের ০.৪ শতাংশ ব্যাংক এবং ০.৪ শতাংশ গার্মেন্টস কর্মীদের বহন করতে হবে। কর্মীদের প্রাপ্য যথাযথভাবে দেওয়ার স্বার্থে গার্মেন্টস মালিকদের কর্মীদের ০.৪ শতাংশ বহন করায় এগিয়ে আসা উচিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিকাশের ক্যাশ-আউট চার্জের ক্ষেত্রে বাকি ১.০৫ শতাংশের বেশিরভাগ অংশ এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর এবং সরকারি কর প্রদানে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

এই সংকটে এজেন্ট এবং ডিস্ট্রিবিউটরদের তাদের প্রাপ্য বিকাশ, রকেট ও শিওর ক্যাশের মতো প্রাইভেট এমএফএস সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহ সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করছে। এ ক্ষেত্রে এমএফএস শিল্পের জন্য প্রণোদনার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে এবং গরিব এজেন্টদের স্বার্থ বিবেচনায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

দেশের সব চেয়ে বৃহৎ এমএফএস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন যে, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের চার্জ এবং করের ক্ষেত্রে কোনো সাহায্য না পেলে বিকাশকে ক্যাশ-আউট চার্জের ১.০৫% অংশের পুরোটা সম্পূর্ণ একা বহন করতে হবে, যা তাদের সক্ষমতাকে হ্রাস করবে।

এমতাবস্থায় কেউ কেউ এমএফএসের মতো দ্রুত জরুরি সেবার চার্জ আরও কমানোর দাবি করছে যা এই শিল্পের জন্য একটি অশনিসঙ্কেত যা লাখ লাখ গরিব এজেন্টকে নিরাশ করছে। বাস্তবতা হচ্ছে, ‘ক্যাশ আউট’ ফি এর বিরাট অংশটি এজেন্টদের দিতে হয় বলে এমএফএস সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ খুবই সীমিত লাভ করে থাকে।

সেই সীমিত লাভ থেকে এমএফএস সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহ নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা এবং সরকারকে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স প্রদান করে থাকে। এমতাবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিং শিল্পটি যাতে স্বচ্ছন্দে পরিচালিত হয় এবং উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে সীমিত কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার আয়-উপার্জন যাতে অব্যাহত থাকে তা নিশ্চিতকরণে কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

বর্তমান সরকারের দূরদর্শী নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এমএফএস বাস্তবায়ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য একটি ছোট পদক্ষেপ ছিল, তবে সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য এটি একটি বিশাল পদক্ষেপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু গার্মেন্টসকর্মীদের বেতন-ভাতাই নয়, ‘সামাজিক সুরক্ষা নেট’-এর সমস্ত ভাতা এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রাহকদের মাঝে বিতরণ করা হবে যারা ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এমএফএসের মাধ্যমে গ্রহণ করেছেন।

এমএফএস গরিব এজেন্টরা নিঃশব্দে প্রতিদিন এবং প্রতিনিয়ত নিজেদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে ফেলে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আর্থিক সেবা প্রদান করে যে বিশাল অবদান রাখছেন তা উপলব্ধি করার সময় এখনি এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতো প্রমাণিত জরুরি আর্থিক সেবা যেন কোনোরকম ঝুঁকির মুখে না পরে এই জন্য বাংলাদেশ সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সকল নীতিনির্ধারকদের যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন বাস্তবায়ন করতে হবে।

আশঙ্কা হচ্ছে, কোভিড-১৯ ভাইরাসজনিত সংকট মোকাবিলায় আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে এবং তা দেশের সার্বিক অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিকাশের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা আনার সুবিধাটা করোনা আক্রান্ত অর্থনীতির স্থবির শিরায় কিছুটা হলেও রক্ত সঞ্চালন করছে।

এই রক্ত প্রবাহ যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে সন্দেহ নেই। সুতরাং এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত এজেন্টদের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। তাদের কথা ভাবা মানে এমএফএস শিল্পটির দিকে নজর দেয়া। কারণ কমিশন বা ফিয়ের একটা বিরাট অংশ তাদের পকেটে যায়। এমএফএসের প্রতি উদাসীনতা বা বৈরিতা এসব গরিব এজেন্টদের পেটে লাথি মারবে। সেই সঙ্গে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে এমএফএসের পরীক্ষিত অবদানকে ব্যাহত করবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক এবং বাংলাদেশ জার্নালিসট ফাউন্ডেশন ফর কনজ্যুমারস অ্যান্ড ইনভেসটরস (বিজেএফসিআই)-এর চেয়ারম্যান।




Loading...
ads






Loading...