অরক্ষিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নগর সুরক্ষার কাজে লিপ্ত

স্বপ্না রেজা
স্বপ্না রেজা - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ২১ মে ২০২০, ০২:৩০,  আপডেট: ২১ মে ২০২০, ১১:১০

ঢাকার দেখভাল করবার জন্য আগে ছিল একটা সিটি কর্পোরেশন। একজন নগরপিতা নগরের ভালোমন্দ নিয়ে ভাবতেন। বিষয়টি সম্ভবত অপ্রতুল বোধ হওয়ায় এক সিটি কর্পোরেশনকে ভেঙে দুই টুকরো করা হলো।

জন্ম হয় সেই থেকে দুই নগরপিতার। সেই থেকে চোখে পড়ার মতো দুই সিটি কর্পোরেশন ভবনে বসেন দুইজন নগরপিতা, দুইজন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, দুইজন প্রধান প্রকৌশলী, দুইজন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, দুইজন বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজন করে কর্মকর্তা।

বেড়েছে কর্মচারীও। দেখা গেল সবাই মিলে ব্যস্ত এক ঢাকাকে সুরক্ষার কাজে। নগরবাসীকে এর প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হলো। নগরবাসী বুঝলেন। অনেকে আশ্বস্ত হলেন নগরসুবিধার কথা ভেবে। অনেকে মাছি তাড়াবার মতো হেসে উড়িয়ে দিলেন। যাই হোক এই বিভাজনে উত্তর সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন অভিজাত এলাকার নগরবাসীদের জীবনে কিছুটা স্বস্তি এলো।

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নগরপিতার নির্দেশে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হলো, চলাচলে সড়ক প্রশ্বস্ত করা হলো, যানজট নিরসনে যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হলো, করা হলো বৃক্ষরোপণে নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা অথচ একই সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন বস্তি এলাকাবাসীর জীবনে তেমন কোনো স্বস্তি দেখা গেল না বরং উচ্ছেদ ও আগুনে বস্তি অদৃশ্য হলো, ছাই হলো।

বস্তিবাসী হলো আশ্রয়হীন। যদিও বস্তিতে ওয়াসার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা হলো কোথাও কোথাও। বিনামূল্যে নয় এই সুবিধাপ্রাপ্তি বরং অর্থের বিনিময়ে বস্তিবাসী এই সুবিধা পেয়েছেন। একবার শুনেছি বস্তিবাসীর কাছ থেকেই বেশি অর্থ পানির মূল্য হিসেবে পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন এলাকায় তেমন স্বস্তি নগরবাসী কোথাও পেয়েছেন কিনা জানা নেই। তবে উচ্ছেদ ও আগুনে পুড়ে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার নগরবাসীর জীবন বিপন্ন হয়েছে বারংবার। বিশেষ করে পুরনো ঢাকার অবস্থা ছিল মর্মান্তিক।

কোনোভাবেই রাসায়নিক উপকরণ তৈরির কারখানা ও গুদাম কোনোভাবেই আবাসিক এলাকা থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করতে পারেনি দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। যদিও এমন ছবি পত্রিকায় এসেছে গুদাম ও কারখানা অন্যত্র স্থানান্তর করার লক্ষ্যে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নিজ হাতে মালামাল সরাচ্ছেন।

বহুবার পুরনা ঢাকাকে নিরাপদ করতে ঘিঞ্জি, চাপা রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছেন অনেকেই, পত্রিকার সংবাদ হয়েছেন অনেকেই কিন্তু অবস্থাচিত্র বদলায়নি। নিরাপদ হননি পুরান ঢাকাবাসী। যাই হোক, তুলনামূলকভাবে নগর অব্যবস্থাপনার করুণ চিত্রটা দক্ষিণ সিটিতে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

আজকের লেখাটা দুই সিটি কর্পোরেশনের সফলতা বা ব্যর্থতার হিসেব কষতে বসা নয় বরং আতংকিত হওয়ার মতো একটা বিষয় যা দেখে ও শুনে আঁতকে উঠতে হলো। করোনাকালে অরক্ষিত অবস্থায় হাজার হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী নগর পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন এবং ইতিমধ্যে এক হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

এই সংবাদ প্রচার করেছে চব্বিশ ঘণ্টা সংবাদ পরিবেশনকারী স্থানীয় একটি নিউজ টেলিভিশন। দেখা গেল মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, উপযুক্ত পোশাক ছাড়াই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ময়লা-আবর্জনার ভেতর দাঁড়িয়ে কাজ করছেন কথা বলছেন। এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাড়ি বাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে আনে।

কী সাংঘাতিক অরক্ষিত অবস্থা! কেউ দেখার নেই যেন! কিংবা থাকলেও কেউ যেন দেখছে না! করোনাকালে কত কী করার পরিকল্পনা শুনছি, ব্যবস্থাপনার গল্প শুনছি, শুনছি কে কী করছেন অথচ এখানে কারোর ভ্রƒক্ষেপ নেই। এখন প্রতিদিন দেখছি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

যদিও এটা ঠিক যে, টেস্টেও সংখ্যা বেড়ে গেছে বলে আক্রান্তের সংখ্যা দৃশ্যমান হচ্ছে। যদি একজনার টেস্ট করা হতো তাহলে তো বলার সুযোগ হতো মাত্র একজন করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে বাংলাদেশে। সেই সুযোগ তো হারিয়ে গেছে। এখন করোনা টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।

ফলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। টেস্টের সংখ্যা আরো বাড়ানো হলে মনে হয় আক্রান্ত সংখ্যা আরো বড় হবে। লকডাউন বা সোশ্যাল ডিসটেন্স না মানা, শপিংমল খুলে দেয়া, উন্মাদদের মতো মানুষের ঈদের বাজার করা, ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া, পোশাকশিল্প কারখানা খুলে দেয়া, পোশাকশিল্প শ্রমিকদের নিয়ে বেতন বেতন খেলা ইত্যাদিকেই করোনা সংক্রমণের কারণ ভাবা হচ্ছে।

পথে সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে অথচ কারোর দৃষ্টি পড়ছে না এই সব পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করার বিষয়টির ওপর। এই অরক্ষিত অবস্থায় তাদের যেমন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, ঠিক তেমনি এদের দ্বারা লাখ লাখ বাসাবাড়ির মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অনেকে গৃহবন্দি থেকেও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, সেই ক্ষেত্রে এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দ্বারা সংক্রমণের সম্ভাবনা আছে কিনা, ভাবছি কী সেটা? আর তাছাড়া এসব পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জীবনের কী কোনোই মূল্য নেই? নগর পরিচ্ছন্ন না থাকলে ভাবুন কী দশা হবে নগরবাসীর। সুস্থতার জন্য নিজ ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য।

সবার সুস্থতার জন্য নগর পরিচ্ছন্ন রাখা তো জরুরি। নাকি ভাবছি, আপাতত এটা দ্বিতীয় স্তরের ভাবনা। তাছাড়া সম্মুখসারির যোদ্ধা তো এরাও, তাই না? করোনায় আক্রান্তদের, আক্রান্ত না হওয়াদের সবার ময়লা, আবর্জনা যারা পরিষ্কার করছেন তাদের কথা না ভাবা, তাদের অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করতে দেয়া তো আদতে গোটা দেশকেই ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

তাই না ? মস্ত বড় দুই সিটি কর্পোরেশনে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আছেন, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কর্তারা আছেন, বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তারা আছেন। অথচ করোনা আক্রান্তের তিন মাসের মধ্যেও বিষয়টি কারোর মনে উদয় হলো না একবারও! দেখলাম দুস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করছেন কেউ কেউ অথচ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য, নগরবাসীর মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে দেওয়ার জন্য নগর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় যারা কাজ করছেন দিনরাত, তাদের পিপিই এর মতো পোশাক দেওয়ার চিন্তা মাথায় এলো না!

আমরা প্রায় দেখে আসছি অত্যাবশ্যকীয় কাজটাই গৌণ হয়ে পড়ে এদেশে। এমন সংস্কৃতি বেশ চর্চা হয় এখানে। হয়তো পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অনুর্বর মস্তিষ্কে না আসাটা সেটারই এক ধারাবাহিকতা, অব্যাহত চর্চা। সত্যি বিষয়টি খুব দুঃখজনক।

সিটি কর্পোরেশন এডিস মশা নিধনে অতীতে বহু তৎপরতা দেখিয়েছে। মশার ওষুধ নিয়ে অনেক আর্থিক কেলেংকারির গল্পও বাজারে এসেছে। বাসাবাড়িতে এডিস মশার ডিম পাওয়া গেলে সিটি কর্পোরেশন থেকে জরিমানার হুমকি-ধমকিও দেয়া হয়েছে।

জরিমানাও করা হয়েছে। মশা মারতে কামান দেখিয়েছে। নগরবাসী দুঃখে মন পুড়িয়েছে সিটি কর্পোরেশনের এমন আচরণে। লজ্জায়, দুঃখে মাথা ঠুকরেছে, কে চান এডিস মশাকে ঘরে এনে ডিম পারতে দিতে। এই ডিম তো মামলেট বা সিদ্ধ করে খেয়ে কারোর প্রোটিন অভাব মিটবে না বরং মরণঘাতী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

তাহলে? নির্বোধ দায়িত্বশীলরা একবারও নিজেদের কৃতকর্মকাণ্ডের দিকে তাকালেন না। কত অপরিচ্ছন্ন সড়ক, অলিগলি, ডোবা, নর্দমা নগরজুড়ে। সামান্য বৃষ্টিতে পানি থৈ থৈ করে ওঠে। নৌকা চলে। ওসব জায়গায় বংশবিস্তার করে বাইরে থেকে যে বাসাবাড়িতে এডিস ঢুকে যেতে পারে, এই বাস্তবতা দেখা গেল না নির্বোধের মাঝে।

ভাব এমন ওসব বাসাবাড়ি থেকেই বংশ বিস্তার করে কেবল। যাই হোক, এডিসের সময় চলে এসেছে করোনাকালে। এ নিয়ে সিটি কর্পোরেশন দুটিতে ব্যস্ততা ও সতর্কতা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ঘোষণা দেখছি, শুনছি। পাশাপাশি অবাক হচ্ছি, এডিস মশা দেখা যায়, এডিস মশা নিধনের বিষয়টি ইতিমধ্যে মানুষ কিছুটা হলেও জয় করেছে, নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে।

কিন্তু অদৃশ্য অণুজীব করোনা প্রাণঘাতী এক ভাইরাস, যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে, প্রতিহত করতে ও বুঝতে গোটা বিশ্ব এখনও হিমশিম খাচ্ছে। দিন দিন চরিত্র বদলে নেওয়া করোনাকে কেউ সঠিকভাবে বুঝতে পারছেন না এবং একশ’ বছরের মধ্যে পৃথিবীর কারোরই এমন অভিজ্ঞতা হয়নি অথচ তেমন এক প্রাণঘাতী অদৃশ্য অণুজীবের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভাবনা কোথাও না দেখে আতংকিত হচ্ছি। এর ভয়াবহতা টের পাচ্ছি।

যাই হোক, ঢাকার জীবনে এক সিটি কর্পোরেশনের যে প্রভাব ছিল, দুই সিটি কর্পোরেশনে সেই প্রভাবের খুব একটা ব্যত্যয় হয়নি। প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি নগরবাসীর। তারপরও বহু পরিকল্পনা, আয়োজনে ও অর্থ বরাদ্দে কাজ করছে দুই সিটি কর্পোরেশন।

পাল্লা দিয়ে অনিয়মও হয়েছে অতীতে ও বর্তমানে কতটা হচ্ছে তা জানা সম্ভব না হলেও নগরবাসীর জন্য স্বস্তি, সুখকর তেমন কিছু বের হয়ে আসছে না। যদি দেখতাম নগরের জন্য যে সব পরিচ্ছন্নতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তারা সুরক্ষিত হয়ে কাজ করছেন দুই সিটি কর্পোরেশনের অতি সক্রিয় তৎপরতায়, স্বস্তি পেতাম।

আশ্বস্ত হতাম এই ভেবে যে, চেতনা জেগেছে। মূল জায়গায় হাত দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মী নয়, এতে গোটা নগরবাসীর জীবন সুরক্ষিত হওয়ার পথটাই প্রশ্বস্ত হতে পারে। করোনা তো মানুষ থেকে মানুষে পৌঁছায়। কাজেই এক মানুষকে সুরক্ষিত করে রাখলে অন্য মানুষও সুরক্ষিত হয়।

এই সহজ হিসাব আশা করি বুঝবে সিটি কর্পোরেশন। মানুষের আস্থা, ভরসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সিটি কর্পোরেশন কেবলমাত্র প্রাণহীন ব্যালেট বক্স হয়ে থাকবে। পরিণামে আগামীতেও আরো বেশি রকম জনবিমুখ হয়ে পড়বে সিটি নির্বাচন।

লেখক: স্বপ্না রেজা- কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...