মহিমান্বিত রজনী

মুহাম্মদ আবুল হোসাইন
মুহাম্মদ আবুল হোসাইন - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ২০ মে ২০২০, ১০:৩৫

রমজান মাসের শেষ দশকে এমন একটি রাত্রি রয়েছে যে রাত্রির ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। পবিত্র কুরআ’নুল কারিমে এই রাত্রিকে ‘লাইলাতুল কাদর’ মহিমান্বিত বা ভাগ্য রজনী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এই মাসে সিয়াম সাধনাসহ যতপ্রকারের ইবাদত করার চেষ্টা আমরা করেছি, তার ভুল-ত্রুটি থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করে মহান আল্লাহর দরবারে কবুল করানোর আরজি দেওয়ার এটিই একমাত্র রজনী।

‘কাদর’ শব্দটি আরবি। ইহার অর্থ মাহাত্ম্য ও সম্মান। এই রাতের অধিক মাহাত্ম্য ও সম্মানের কারণে এটাকে মহিমান্বিত রজনী বলা হয়। আবার ভাগ্য অর্থেও শব্দটি প্রয়োগ হয়ে থাকে। তখন অর্থ হবে, এই রাত্রিতে মানুষের পরবর্তী একবছরের ভাগ্য ফেরেশতাগণের নিকট হস্তান্তর করা হয়, যার মধ্য মানুষের বয়স, মৃত্যু ও রিজিকসহ সবকিছু রয়েছে।

পবিত্র কুরআ’নুল কারিমের সাতানব্বইতম ‘আল-কাদর’ পূর্ণাঙ্গ সূরাটিতে এই মহিমান্বিত রজনীর মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমি এটা (আল-কুরআন) মহিমান্বিত রজনীতে অবতীর্ণ করেছি। আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে তুমি কী জান? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাসের চাইতে উত্তম।

ওই রাত্রিতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিবরাঈল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজের জন্য অবতীর্ণ হন। শান্তিময়, এই রাত ফজর উদয় পর্যন্ত’। [সূরা আল-কাদর।] সূরা দুখানের আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে: ‘পবিত্র রজনীতে তাকদির সংক্রান্ত সব ফয়সালা লিপিবদ্ধ করা হয়’। [সূরা আদ-দুখান: ৪।] এর মর্ম হলো, এ বছর যেসব বিষয় প্রয়োগ করা হবে, সেগুলো লাওহে মাহফুজ থেকে নকল করে ফেরেশতাগণের কাছে সোপর্দ করা হবে।

এই রজনীর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিসেও বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। এই মাসের শেষ দশকে যে কোনো দিন ‘লাইলাতুল কাদর’ হতে পারে, তাই রাসূলুল্লাহ (দ.) শেষ দশককে এত বেশি গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি ইবাদতের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন এবং পুরো রাত্রি জাগ্রত থেকে নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, দুয়া ও জিকিরের মাধ্যমে অতিবাহিত করতেন।

এমনকি তিনি তার পরিবারের সদস্যদেরও ইবাদত করার জন্য ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন। উম্মুল মুমেনীন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘যখন রমজানের শেষ দশক আসত তখন রাসূলুল্লাহ (দ.) তার চাদর কষে নিতেন (অর্থাৎ বেশি বেশি ইবাদাতের জন্য প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাতে জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন’। [সহীহ বুখারী: ২০২৪; সহীহ মুসলিম: ১১৭৪]।

ইমাম ইবনে খুযায়মা ও বায়হাকী (রহ.) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন। শাবান মাসের শেষ দিনে রাসূলুল্লাহ (দ.) রমজান মাসের মর্যাদা বর্ণনা করে দীর্ঘ এক ভাষণ প্রদান করেন এবং ওই ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই মাসে এমন এক মহিমান্বিত রাত রয়েছে যে রাতের মাহাত্ম্য হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (দ.) বলেছেন: ‘রমজান মাসে এমন এক রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো’। [নাসায়ী ও মুসনাদে আহমাদ]।

এই রাতে অগণিত ফেরেশতা আল্লাহর বান্দাদের ইবাদাত পর্যবেক্ষণ করার জন্য জমিনে বিচরণ করে থাকেন এবং ফজর উদিত হওয়ার পর আসমানে আরোহণ করে মহান আল্লাহকে বান্দাদের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন। হাদিসে এসেছে, ‘কাদর রাত্রিতে পৃথিবীতে ফেরেশতারা এত বেশি অবতরণ করেন যে, তাদের সংখ্যা পাথরকুচির চেয়েও বেশি’। [মুসনাদে তায়ালাসী: ২৫৪৫]।

রাসূলুল্লাহ (দ.) এই রাতের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি। শুধু রমজানের শেষ দশকের বেজোড় দিনগুলোতে এই রজনী তালাশের নির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (দ.) বলেছেন: ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কাদর তালাশ কর’। [সহীহ বুখারী: ২০২০; সহীহ মুসলিম: ১১৬৯।]

অন্য হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে: ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কাদরের সন্ধান কর’। [সহীহ বুখারী: ২০১৭।] তবে এই রাতের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে, যার সংখ্যা প্রায় চল্লিশটি বলে ইমাম ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) উল্লেখ করেছেন।

ততমধ্যে উল্লেখযোগ্য উক্তিটি হলো, সাহাবীদের মধ্য উবাই ইবনে কা’ব, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও হুযাইফা (রা.)-সহ একদল সাহাবী ছাব্বিশ তারিখ দিনগত সাতাশ তারিখের রাতকে সম্ভাব্য মহিমান্বিত রজনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই উক্তিটিকে অধিকাংশ আলেমগণ গ্রহণযোগ্য হিসেবে মত দিয়েছেন এবং তার আলোকে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সম্ভাব্য হিসেবে ওই তারিখে মহিমান্বিত বা ভাগ্য রজনী পালন করা হয়।

এই রাত্রিতে বিভিন্ন প্রকারের ইবাদাত রয়েছে। ততমধ্যে বিখ্যাত আলেমগণ এই রজনীতে ইবাদাতের পূর্বে গোসল করে নতুন পোশাক পরিধান করে সুগন্ধি লাগানোকে মুস্তাহাব বলেছেন। বর্ণিত আছে, প্রসিদ্ধ সাহাবী আনাস বিন মালিক (রা.) রমজানের চব্বিশ তারিখ রাতে গোসল করে নতুন কাপড় পরিধান করে শরীরে সুগন্ধি লাগাতেন।

প্রখ্যাত তাবেয়ী ইব্রাহিম নখয়ী (রা.) লাইলাতুল কাদর উপলক্ষে রমজানের শেষ দশরাতের সম্ভাব্য রাতগুলোতে গোসল করে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং ক‚ফার প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আবু মারইয়াম ইবনে হুবাইশকে ছাব্বিশ তারিখ দিনগত সাতাশ তারিখ রাতে গোসল করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

তাছাড়া প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আইয়ূব সাখতিয়ানী (রা.)-সহ অনেক তাবেয়ীগণ রমজানের শেষ দশরাতের যে কোনো একরাত লাইলাতুল কাদর হবে মনে করে শেষ দশরাতের অধিকাংশ রাতে গোসল করে নতুন পোশাক পরিধান করতেন এবং সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। সুতরাং ইহা থেকে বোঝা গেল, জুমা এবং ঈদের মতো এই রাতে গোসল করে নতুন পোশাক পরিধান করে সুগন্ধি মেখে আল্লাহর ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা উত্তম।

এই রাতের আমলের মধ্য উল্লেখযোগ্য হলো, ফরজের পর যত বেশি সম্ভব নফল নামাজ পড়া। কেননা, এই রাতের নফল নামাজের উসিলায় করুণাময় ক্ষমাশীল আল্লাহ বান্দার পূর্ববর্তী অপরাধগুলো মাফ করে দেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (দ.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সাওয়াব লাভের আশায় নামাজের মাধ্যমে কাদর রজনী কাঠাবেন, তার পূর্ববর্তী গুণাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে’। [সহীহ বুখারী: ১৯০১]।

মহিমান্বিত রজনীর অন্যতম আমল হলো কুরআন তেলাওয়াত করা। রাসূলুল্লাহ (দ.) রমজানের শেষ দশরাতে এমনভাবে তারতীল সহকারে কুরআন তেলাওয়াত করতেন যে, রহমত বা দয়াসংক্রান্ত কোনো আয়াত আসলে তিনি আল্লাহর নিকট চাওয়া ছাড়া পরবর্তী আয়াতে যেতেন না। আর আজাব বা শাস্তিসংক্রান্ত আয়াত আসলে তিনি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা ছাড়া পরবর্তী আয়াত তেলাওয়াত করতেন না এবং প্রত্যেক আয়াত তেলাওয়াতের সময় গভীরভাবে চিন্তা করতেন।

প্রসিদ্ধ সাহাবী আবূ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (দ.) বলেছেন: ‘তোমাদের মধ্য কেউ একরাতে কুরআনুল কারিমের এক-তৃত্বীয়াংশ পড়তে কী অক্ষম? প্রতি উত্তরে বলা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ (দ.)! কে ওইটাতে সক্ষম হবে? এই উত্তরে রাসূলুল্লাহ (দ.) সূরা ইখলাছ পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন’। [মুসনাদ তায়ালাসী: ১০৬৮]।

যিকির এই মহিমান্বিত রজনীর অন্যতম একটি আমল। কারণ, জিকির হলো বান্দা কর্তৃক আল্লাহর মহানত্ত্ব ঘোষণার অন্যতম মাধ্যম। মহান আল্লাহর বিশেষ ফেরেশতাগণ জমিনের মধ্য জিকিরের মজলিস তালাশে মগ্ন থাকেন এবং কোথাও জিকিরের মজলিস পেলে সেখানে শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেষ্টনী দিয়ে রাখেন; মজলিস শেষান্তে আসমানে আরোহণ করে মহান আল্লাহর নিকট জিকিরকারী বান্দাদের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন। তাই ভাগ্য রজনীতে জিকিরের মাধ্যমে বান্দা এই সুযোগটি গ্রহণ করতে পারেন।

সুতারাং এই মহিমান্বিত রজনী প্রত্যেক বান্দার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই রাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের পরবর্তী একবছরের ভাগ্য ফেরেশতাদের নিকট হস্তান্তর করেন। তাই এই রাত্রিতে জাগ্রত থেকে বিভিন্ন প্রকারের ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা প্রত্যেক বান্দার ওপর কর্তব্য।

লেখক: মুহাম্মদ আবুল হোসাইন- সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




Loading...
ads






Loading...