স্মৃতিতে ফারুক চৌধুরী

মনসুর আহমেদ চৌধুরী
মনসুর আহমেদ চৌধুরী - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ১৯ মে ২০২০, ০২:২০,  আপডেট: ১৯ মে ২০২০, ১০:১৮

অত্যন্ত বেদনা আপ্লুত হৃদয়ে স্মৃতির অ্যালবাম থেকে ক্ষুদ্র কয়েকটি স্মৃতিচারণ করতে চাই প্রয়াত ফারুক আহমদ চৌধুরীকে নিয়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫৬ সালে।

এই কূটনৈতিক সার্ভিসে অত্যন্ত কৃতিত্ব ও সাফল্যের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ সরকারের প্রথম ‘চিফ অব প্রটোকল’ হিসেবে নিযুক্ত হন।

যুক্তরাজ্যে ডেপুটি হাইকমিশনার থাকাকালে তিনি কমনওয়েলথে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭৬-১৯৭৮ অবধি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন এবং ১৯৭৮-১৯৮২ পর্যন্ত ইইসি ও বেনেলাক্সে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।

১৯৮৪-৮৬ সাল অবধি বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন। ১৯৮৭-৯২ পর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশ সরকারের হাইকমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহণ করেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর ব্র্যাকের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত থেকে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

পেশায় ছিলেন একজন কূটনীতিবিদ, নেশায় ছিলেন একজন লেখক। তার লেখা ১৪টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো- অনাবিল মুখচ্ছবি (২০১৭); মহা আর্থিক সংকট: কারণ ও পরিণতি (২০১৫); জীবনের বালুকাবেলায় (২০১৪)-বাংলা একাডেমি কর্তৃক সাহিত্য পুরস্কার (২০১৫); রবীন্দ্রনাথ: শান্তির দূত (২০১১); গতকাল সমকাল (২০১১); বিপন্ন পৃথিবী (২০১০); ব্র্যাক উন্নয়নের একটি উপাখ্যান (২০০৭)-সহ লেখক সুবল কুমার বণিক ও সাজেদুর রহমান; জানালায় নানা ছবি (২০০৬); স্মরণে বঙ্গবন্ধু (২০০৪); সময়ের আবর্তে (২০০৪); স্বদেশ স্বকাল স্বজন (২০০২); নানা ক্ষণ নানা কথা (১৯৯৯); প্রিয় ফারজানা (১৯৯৬); দেশ দেশান্তর (১৯৯৪)-বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক ১৪০১ বঙ্গাব্দে ইতিহাসবিষয়ক শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। তার বইয়ে ফুটে উঠেছে জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও তার দৃষ্টিতে সমাজ, পরিবার, মানুষের নানান সমস্যা ও কল্যাণ।

আত্মীয়তার সূত্রে তিনি আমার চাচা। আমি তার অত্যন্ত স্নেহের ও আদরের অন্যতম ভ্রাতুষ্পুত্র। আমি ঢাকায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যখন ব্রেইল পদ্ধতিতে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করি, তখন জিনাত চাচি ও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো। তারা প্রতি তিন বছর অন্তর ছুটিতে দেশে আসতেন এবং তাদের উৎসাহ ও প্রেরণা আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে এক বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

ফারুক চাচার সঙ্গে আমার কর্মজীবনে একাধিক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ১৯৭৯ সালে Antwerp-এ অনুষ্ঠিত World Council for the Welfare of the Blind (WCWB) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। Leadership of Tommorrow শীর্ষক অধিবেশনে আমার একটা পেপার প্রেজেন্টেশন ছিল।

চাচা ও চাচি তাদের সন্তান আদনান ও ফারজানাকে নিয়ে সেই অধিবেশনে আমাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন। ২০ বছর পর তার উদ্যোগে ইম্প্যাক্ট জীবনতরী ভাসমান হাসপাতালের দাউদকান্দি ও মারকুলি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্র্যাকের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন।

ফারুক আহমেদ চৌধুরী ছিলেন খুবই সদালাপী, প্রাণবন্ত, ক্রীড়ামোদী, সংস্কৃতিমনা, শিল্পানুরাগী, সাহসী ও ভোজনবিলাসী ব্যক্তিত্ব। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বারকোটে তার আদি নিবাস। তিনি গিয়াসুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী ও রফিকুননেছা চৌধুরী (লুভা)-এর ৪ পুত্র ও ২ কন্যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান।

ফারুক আহমেদ চৌধুরী ১৯৫৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জিনাত চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ছেলে আদনান চৌধুরী ব্যবসায়ী ও মেয়ে ফারজানা আহমেদ এফসিএ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ম্যানিলায় কর্মরত।

স্বাস্থ্যের ঘন ঘন অবনতি হওয়ায় একাধিকবার রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে তাকে ভর্তি হতে হয়েছিল। সব চেষ্টাকে হার মানিয়ে তার জীবনাবসান হলো ১৭ মে ২০১৭। কীর্তিমান এই নাগরিকের অনুপস্থিতিতে জাতীয় জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হলো তা অপূরণীয়।

লেখক: মনসুর আহমেদ চৌধুরী - প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ইম্প্যাক্ট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।




Loading...
ads






Loading...