করোনা ভাইরাসের সামাজিক অভিঘাত

দৈনিক মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:২৫,  আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০১:৩১

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকছে। মানুষ একত্রে থাকবে, একে অন্যের সুখে-দুখে পাশে থাকবে এটাই মানবধর্ম। কিন্তু বিশ্বে এমন এক রোগ দেখা দিল যা মানুষকে মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার বিধান জারি করে রেখেছে।

এখন বিচ্ছিন্ন থাকাটাই বেঁচে থাকা। নিজের এবং অন্যের জন্য এটাই ভালো। তাই নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে মানুষ পরিচিত হচ্ছে, যথা আইসোলেশন, হোম কোয়ারেন্টাইন, সোশ্যাল ডিস্টেন্স ইত্যাদি। প্রাণ বাঁচানোর জন্য এই বিচ্ছিন্নতা। একা ঘরবন্দি থাকা। মানুষকে এক ঘরে করে দিচ্ছে করোনা ভাইরাস।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা এই বিচ্ছিন্নতাকেই করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার ১ নম্বর উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চিকিৎসকদের মতে এ ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে বলে অতি দ্রুত তা মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে মারাত্মক ভয়ভীতি তৈরি হতে থাকে। এতে গোটা বিশ্বের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

মানুষের জীবন যাত্রার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে থাকে। আক্রান্ত করে মানুষের সামাজিক জীবনকে। সামাজিকভাবে এই করোনা ভাইরাস আমাদের স্বার্থপর করে তুলছে। মানুষ মানুষের পাশে না থেকে মৃত্যু ভয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না। এমনকি তার মৃত্যুর পর লাশ দাফন করতেও বাধা দেয়া হয়।

ঠাণ্ডা, জ্বরের কারণে তাকে ট্রাক থেকে ফেলে দেয়া হয়। বাসা থেকে বের করে বাইরে ফেলে রাখা হয়। কোনো কোনো হাসপাতাল রোগীর চিকিৎসা দিতে রাজি হচ্ছে না। কিছু কিছু স্বাস্থ্যকর্মী রোগীকে নিয়মিত চিকিৎসাও দিতে চাচ্ছেন না। করোনা ভাইরাসের সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব বা অভিঘাত রয়েছে।

দিন আনে দিন খায় এমন নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। কোনো কাজ না পেয়ে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে অভুক্ত থাকতে হচ্ছে। খাদ্যাভাবে তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। স্বল্প আয়ের এই মানুষগুলোর জন্য অচিরেই ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। সমাজে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যেতে পারে।

দেশে বেকার লোকের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। তাছাড়া কাজ না থাকায় প্রবাসী মানুষজন যদি দেশে ফিরতে থাকে তবে দেশে আরেক ধরনের আর্থ-সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। যতদূর জানা যায় করোনা ভাইরাসের জীববিজ্ঞানগত, রোগতত্ত¡গত কার্যকারণ, বিবর্তন নিয়ে সংশ্লিষ্ট গবেষকরা এখন পর্যন্ত খুব বেশি জানেন না।

একই সঙ্গে আমরা জানি না যে এ রোগের সম্ভাব্য সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব-অভিঘাত আসলে কেমন হতে পারে। আমরা জানি না কারণ, এটা কোনো সাধারণ ‘ঝুঁকি’ নয়; এটা হলো ‘অনিশ্চয়তা’ যা পরিমাপ প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি দিন নূতন করে আমাদের সামনে আসছে আর আমরা নূতন নূতন তথ্য উপাত্ত পাচ্ছি।

বিশ্বের ২০৫টি দেশ এবং অ লে এই রোগের সংক্রমণ হয়েছে। এই লেখার সময় পর্যন্ত সাড়ে ১১ লাখেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৫৯ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যা মানব সভ্যতার জন্য এক বিরাট হুমকি স্বরূপ। অদৃশ্য এই জীবাণুর বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তাহলে কিভাবে বাঁচব এই মহামারী থেকে? তবে কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না।

প্রিয়জনদের আতঙ্কিত হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে হবে; তাদের সাহস জোগাতে হবে এবং অবশ্যই সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য-পরিচ্ছন্নতা বিধি মেনে চলতে হবে; ঘরে থাকতে হবে; প্রয়োজনে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে যেতে হবে এবং অন্যকে পাঠাতে হবে। আমরা অসম্ভব আশাবাদী মানুষ, করোনা তথা কোভিড-১৯ এর ঊর্ধ্বমুখী রেখা অচিরেই নিম্নগামী হবে এবং দ্রুত এ রোগের রোগ মুক্তির ওষুধ আবিষ্কৃত হয়ে যাবে; মানুষের সংহতি বাড়বে; মানুষ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

আর চতুর্থ বিপ্লবের এযুগে আমরা পারস্পরিক যোগাযোগ অনেক গুণ বাড়াতে সক্ষম। প্রয়োজনে আমরা অবশ্যই সেটাও করব; প্রয়োজনে আমরা আমাদের মানবকল্যাণ-উদ্দিষ্ট জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার করব। বংশ পরম্পরায় আমরা অনেক ধরনের বিপদ-আপদের সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু যেহেতু মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও ক্ষমতা অসীম সেহেতু আমরা প্রতিবারই বিপদ-আপদকে পরাস্ত করেছি এবারো সেটাই হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখক: আনোয়ার ফারুক তালুকদার- ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...