ইসলামের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ

ইসলামের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ২৯ মার্চ ২০২০, ০০:৪০,  আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০, ০৯:২৩

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতিকে দিয়েছে একটি ঠিকানা। দূর করেছে আত্ম পরিচয়ের সংকট। এর আগ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় নিয়ে এক চরম দ্বদ্ধ ছিল। আমরা কি বাঙালি, না পাকিস্তানি, না কি মুসলিম? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেউ দিতে পারত না। পাকিস্তান যে দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল তাতে পাকিস্তানিদের জাতীয়তা পাকিস্তানি নয়, মুসলমান হওয়া উচিত ছিল। জাতীয়তা ধর্মের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, না- অঞ্চল, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে এ নিয়ে দ্বদ্ধের জেরেই ভারত থেকে পৃথক হয়েছিল পাকিস্তান।

ভারত থেকে পৃথক আরেকটি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন কোনো অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে হয়নি, হয়েছিল ধর্মের বিভিন্নতা দেখিয়ে। সে হিসেবে তাদের জাতীয়তা পাকিস্তানি কোনোভাবেই হতে পারে না। ধর্মীয় পরিচয় ছাড়া তাদের অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে না।

ভারতবর্ষ বহু জাতির আবাসস্থল। জাতিগত বিভিন্নতার কারণে এখানে পৃথক রাষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান মতবাদের প্রবক্তারা ধর্মকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। ভারতীয় জাতীয়তা থেকে বাঁচতে তারা সাতচল্লিশের আগে উচ্চকণ্ঠে প্রচার করতেন, মুসলমানের জাতীয়তা কোনো দেশের বা ভূ খণ্ডের ভিত্তিতে নয়; ধর্মের ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। অবশেষে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র হয়ে গেল, মুহাম্মাদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানের জাতীয়তা ইসলাম নয়, পাকিস্তানের জাতীয়তা হবে পাকিস্তানি। এখানের অধিবাসী প্রতিটি নাগরিক হিন্দু হোক কি মুসলিম, সবাই পাকিস্তানি জাতীয়তায় পরিচিত হবে।

উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যাদেরকে জিন্নাহ লিয়াকতরা এতদিন ধর্মের নামে নাচিয়েছিল তারা এতে খুব আশাহত হয়, তারা তাদের পাসপোর্টে জাতীয়তার স্থানে ইসলাম না লিখে পাকিস্তানি লিখতে বাধ্য হয়। হয়তো তারা ইসলাম ও পাকিস্তানকে সমার্থক মনে করতে থাকে। এভাবে কিছুটা আত্মতৃপ্তি তাদের ভেতরের যন্ত্রণা লাঘব করেছিল সম্ভবত।

সবকিছুতে ধর্মকে টেনে আনার দ্বারা ধর্ম ছোট হয়। নবীজী তার সাহাবীদের বলেছিলেন, আমি তোমাদেরকে দীন সম্পর্কে কোনো কথা বললে তা অনুসরণ কর, আর পার্থিব বিষয়ে যদি কিছু আমি বলি, তা মানা তোমাদের জন্য আবশ্যক নয়। আনতুম আলামু বি উমুরি দুনিয়াকুম। ‘তোমরাই অধিক জান তোমাদের দুনিয়ার বিষয়ে।’

সবকিছুতে ধর্মকে টেনে আনা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির শামিল। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করো না।’ মূলত ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম। স্বাভাবিক বাস্তব প্রয়োজনে মানুষকে যা করতে হয় সে ক্ষেত্রে কোরান হাদিসে শাখাগত সব নির্দেশনা থাকে না। বরং কিছু মৌলিক কথা থাকে। তার আলোকে এসব বিষয়ের সমাধান বের করতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টিও এমনই। কোরান হাদিস খুঁজে মুক্তিযুদ্ধে নামেনি আমাদের পূর্বপুরুষ। প্রতিনিয়ত হানাদারদের হাতে নিপীড়িত হচ্ছিল দেশের সাধারণ জনগণ। বছরের পর বছর পাকিস্তান নামক দুঃসহ এক নরকে তাদের বাস করতে হচ্ছিল। ধর্ম চর্চার মতো পরিবেশ একদমই ছিল না। মানুষ দু’বেলা দু’মুঠো খেতেও পেত না। অন্ন বস্ত্র চিকিৎসা বাসস্থান শিক্ষাসহ মৌলিক সব অধিকার থেকে হচ্ছিল বি ত। দুশ’ বছর গোলামির পর আরও ২৩টি বছর চরম অন্যায় অবিচারে ডুবে ছিল এ দেশের মানুষ।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী বলেছেন, যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায় তাদের ধর্ম নিয়ে ভাববার ফুরসত হয় না। অর্থনৈতিক ন্যূনতম স্থিতিশীলতা না হলে কোথাও ধর্মচর্চা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। চরম বিলাস ব্যসনে যেমন ধর্মচর্চা করা যায় না, চরম দারিদ্র্যের ভেতরও উপাসনার মন তৈরি হয় না। যে লোকটা ডাস্টবিনে কুকুরের সঙ্গে লড়াই করে আবর্জনা থেকে নিজের আহার কেড়ে আনে তার নামাজ হবে কি করে? ধর্মতত্ত¡ নিয়ে বাহাস করার মতো ফুরসত সে কোত্থেকে পাবে?

এর বাস্তবতা হচ্ছে একাত্তর পর্যন্ত বাংলাদেশে মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল সাকুল্যে চার হাজার। ‘পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেলে ইসলাম থাকবে না’ বলে খুব বিলাপ করেছিল ভণ্ড রাজাকাররা। পঞ্চাশ বছরের মাথায় বাংলাদেশের মাদ্রাসা সংখ্যা সদ্য করা বোর্ডের হিসেব অনুসারে ৩০ হাজার। কোথায় ৪০০ আর কোথায় ৩০ হাজার? সুস্থ পরিবেশে সংস্কৃতি ও ধর্ম চর্চার সহজতর হওয়ার এ উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

তো বৈষম্য, দমন-পীড়ন, অপমান লাঞ্ছনায় জর্জরিত হয়ে বাঙালিরা এক সময় রুখে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির কণ্ঠস্বর। তার ৭ মার্চের কথাগুলো ছিল সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ের কথা। সর্বস্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যে যেভাবে পেরেছে প্রতিরোধ করেছে হানাদার বাহিনীকে। সত্যি, তখন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলা হয়েছিল। প্রাণের টানেই মানুষ যুদ্ধে গেছে।

যুদ্ধ শেষে কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা আসবে; এর জন্য মানুষের ভেতর বাসা বেঁধেছিল বাসনা। স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে বীর বাঙালি। বিজয় দিবসে প্রতিটি ঘরের ছাদে পতাকা ওড়ানোর সময়টি কল্পনা করুন। কী আনন্দ আর উত্তেজনা উচ্ছল উদ্বেল করেছিল সে সময় বেঁচে থাকা ভাগ্যবান বাঙালিদের।

মুসলমানের তো ইমান এই স্বাধীনতা। কালিমা তাইয়িবায় তাকে শেখানো হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো গোলামি করা যাবে না। মুসলমান সত্যিকারের মুসলমান হলে গোলামির মানসিকতা তার থাকতে পারে না। তবু ব্যতিক্রম হয়। উপমহাদেশে উগ্র মৌদুদিবাদীদের ধর্ম চর্চা বহু মানুষের স্বাভাবিক বোধ নষ্ট করে দিয়েছে। তারা বোঝে না নিজের জাতির অকল্যাণকারীকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না। সামান্য স্বার্থের জন্য পুরো জাতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আর এ জন্য ধর্মের অপব্যবহার আল্লাহ বরদাশত করবেন না। এই সাধারণ কথা বোঝার মতো বোধশক্তি নষ্ট করে দিয়েছে বিকারগ্রস্ত মৌদুদিবাদী চক্র।

ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে অতীত সোনালি অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধকে দেখলে আনন্দ হয়। সে সময় মাসআলা দেখার মতো পরিস্থিতি একদম ছিল না। কিন্তু ঘটনাগুলো যেভাবে ঘটেছে তাতে অবাক হতে হয়, ইসলামী ফিকহের সিদ্ধান্ত মেনেই একেকটি ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক রূপ বিচ্ছিন্নতাবাদও হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। কোনো নেতৃত্ব ঠিক না করে সুসংগঠিত কোনো প্রয়াস না হলে ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে তা সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ হতো।

কিন্তু ইতিহাদ সাক্ষী, আমাদের গৌরবের মহান মুক্তিযুদ্ধ সুসংগঠিতভাবেই সম্পাদিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের ১৬৯ আসনের ভেতর ১৬৭ আসনে জয়লাভ করেন। পার্বত্য অ লের চাকমাদের আসনটি বাদ দিলে মূলত একটি আসনেই আওয়ামী লীগ সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হয়। সাংবিধানিকভাবেই সরকার গঠনের ক্ষমতা লাভ করেন বঙ্গবন্ধু।

২৫ মার্চ কালো রাতে গ্রেফতার হবার পর তার একনিষ্ঠ সহকারী ও শিষ্যরা দ্রæতই একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠন করেন। তাজউদ্দীন হন প্রধানমন্ত্রী, নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি। জেনারেল উসমানীকে করা হয় প্রধান সেনাপতি। এগারোটি সেক্টরে ভাগ করা হয় সৈনিকদের। সেক্টর কমান্ডার নির্ধারণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় স্বাধীনতা। নিয়মতান্ত্রিকভাবে যোদ্ধারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এভাবে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হয় মুক্তিযুদ্ধ।

নয় মাস যুদ্ধের পর অগণিত মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অসংখ্য শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হয় বাংলাদেশের। বাংলাদেশ নামে নতুন একটি দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় সগৌরবে। মহিমান্বিত আমাদের ইতিহাস। উজ্জ্বল এক গৌরবান্বিত সংগ্রামের ভেতর দিয়ে আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা আমাদের দিয়েছেন এ মাটি।

এ দেশকে রক্ষা করা তাই আমাদের সবার কর্তব্য। এদেশের উন্নতির জন্য কাজ করা আমাদের জন্য সম্মানের বিষয়। এ মাটিতে আমাদের জন্ম, এ মাটিতেই আমাদের জীবন, এখান থেকেই কাল কেয়ামতে আমাদের উঠতে হবে। কাজেই এদেশের মাটিকে যারা অপবিত্র করতে চায়, অপমান করতে চায়, ধর্ম অধর্মের নামে নষ্ট করতে চায় এর পরিবেশ; তাদেরকে রুখে দিতে হবে। দেশাত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিতে হবে প্রিয় মাতৃভ‚মিকে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

লেখক: মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান- মুফতী ও মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ

মানবকণ্ঠ/এমএইচ






ads