করোনা সঙ্কটে সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব

রনি রেজা
রনি রেজা - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৭ মার্চ ২০২০, ০০:২৭,  আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২০, ১০:০৬

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। পুলিশ ও হাসপাতাল ছাড়া সব ধরনের সরকারি অফিস বন্ধ হতে যাচ্ছে। এ সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বন্ধ থাকবে। সীমিত করা হয়েছে ব্যাংক সেবা।

সোমবার দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সচিবালয়ে জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এ তথ্য জানান। খবর ডেইলি বাংলাদেশ। লক্ষ্য করুন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অনুযায়ী এই সঙ্কটকালে সেবা দিচ্ছেন পুলিশ, চিকিৎসক আর ব্যাংকাররা। গার্মেন্টস সেক্টরের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা নেবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

বাকি রইল গণমাধ্যমের কথা। খোলা থাকার তালিকায় এ সেক্টরের কথা উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমগুলো বন্ধ থাকবে। আসলে কি থাকবে? প্রশ্নটি বোকার মতো করেই ফেললাম। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নিশ্চয় জানা থাকার কথা, কোনো ক্রান্তিকালেই গণমাধ্যম বন্ধ থাকে না।

যুদ্ধবিগ্রহ, জরুরি অবস্থা, মহামারীসহ যে কোনো ক্রান্তিকালে সাংবাদিকদের তৎপরতা থাকেই। ক্রান্তিভেদে অন্যরাও যুক্ত হন। যুদ্ধবিগ্রহে সেনাবাহিনীসহ সমস্ত এলিট ফোর্স, জরুরি অবস্থায় প্রশাসন, মহামারীর সময় চিকিৎসকরা সেবা দেন নিঃস্বার্থভাবে। সব ক্রান্তিতেই একমাত্র নিরলস কাজ করে যান সাংবাদিকরা। শুধু ক্রান্তিকালে কেন?  সব সময় কি চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করেন না? মৃত্যুঝুঁকি তো এদের নিত্যসঙ্গী। আর প্রভাবশালীদের হুমকি, চোখ রাঙানি, ষড়যন্ত্র, ফাঁদ... এসব ডালভাত।

সঙ্গে সাংবাদিক নামধারীদের অপকর্মের তিরস্কারের ভাগও নিতে হয়। কর্মস্থলের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, ক্ষরণ, বরণ সব সঙ্গী করেই এগিয়ে যান একজন সাংবাদিক; এ সবই মুখস্থ কথা। সাংবাদিক জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধে বলেছিলাম, ‘অনিশ্চয়তাকে নিশ্চিত জেনেই এ পেশায় নাম লিখিয়েছি।’ অগ্রজরা শিখিয়েছেন ‘মুখ বুজে সব সহ্য করে নেয়ার নামই সাংবাদিকতা।’

এ প্রসঙ্গে অগ্রজ সাংবাদিক খালেদ ফারুকী ভাই বলেছিলেন, ‘যেদিন পৃথিবী ধ্বংস হবে সেদিনও সাংবাদিকরা লিখতে থাকবেনÑপৃথিবীতে অস্বাভাবিক ভ‚-কম্পন শুরু হয়েছে। হয়তো কিছুক্ষণের ভেতরই ধ্বংস হয়ে যাবে...। হয়তো শেষ বাক্যটি লেখার পূর্বেই ধ্বংস হয়ে যাবে সব। মৃত্যু হবে সাংবাদিকের। তবু চলবে কলম। লেখাটি প্রকাশের সময় পাবে না জেনেও কলম থামাবে না সাংবাদিক নিজেই।’ কথাগুলো শুনে কিছুটা আশ্চর্য লাগলেও পরবর্তী বাস্তবতা মননে ঠাঁই করে নিয়েছে।

হয়তো নিজের মৃত্যুর মুহূর্তেও একজন সাংবাদিক ভাবতে থাকেন, তার মৃত্যুর শিরোনামটা কেমন হবে? কিংবা কয় কলামে ছাপা হবে...। অদ্ভুত লাগলেও এসব সত্য। বছর তিনেক আগে একটি খবর প্রকাশ হয়েছিল, ‘সংবাদ পাঠের সময় একটি দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে তার স্বামীও রয়েছেন বলে জানতে পারেন সংবাদ পাঠিকা অথচ পরম ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে সংবাদ পাঠ অব্যাহত রাখলেন তিনি পরবর্তী আরো ১০ মিনিট।’ এটা আন্তর্জাতিক খবর।

কয়েকদিন আগে এমন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হলাম নিজেই। টাঙ্গাইলের একটি সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ সম্পাদনা করতে করতে হু হু করে কেঁদে উঠলেন এক সহকর্মী। জানা গেল দুর্ঘটনাটিতে মারা গেছেন ওই সহকর্মীর ভাতিজা। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বিয়ের দু’দিনের মধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে জরুরি সংবাদ সংগ্রহে ছুটতে হয়েছে, এমন খবরও আছে। তাহলে সাংবাদিকদের ঝুঁকি, ক্রান্তিকালের সেবা কিংবা পেশাদারিত্বের কথা আলাদা করে বলার কী আছে? নিশ্চয় আছে।

 ক্রান্তিকালে যারা সেবা প্রদান করেন তাদের আলাদা মর্যাদা থাকতে হয়। যদি কেউ এ সময় মারা যান বা ক্ষতিগ্রস্ত হন রাষ্ট্রীয় ক্রান্তিকালে সেবা দেয়ার স্বীকৃতি পাবেন। কিন্তু একজন সাংবাদিক; যিনি রাষ্ট্রীয় ঘোষণা অনুযায়ী ছুটিতে থাকার কথা; তিনি যদি মারা যান বা ক্ষতিগ্রস্ত হন, রাষ্ট্র কি স্বীকৃতি দেবে? কোথাও তো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ সাংবাদিকদের কাজ করতে হবে নিজ দায়িত্বেই। সেদিন বাবা ফোন করে বললেন, ‘এমন পেশায় আছো কিছু তো বলার নেই। তবু বলি সাবধানে থেকো। যত কম বেরিয়ে পারা যায়। দেশের পরিস্থিতি যত খারাপ হবে তোমাদের ব্যস্ততা তত বাড়বে; জানি। এর ভেতর দিয়েও যতটা সম্ভব সাবধানে থেকো।’

 বাবা জানেন, ‘যে সময়ে সবাই আতঙ্কে বাসার বাইরে যাচ্ছে না; তখন তার ছেলে চাইলেও বাসায় থাকতে পারবে না। যখন সবাই ছুটি পেয়ে বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে তখন তার ছেলে কর্মে মহাব্যস্ত। হোক পেশাদারিত্বের জন্য কিংবা দেশের জন্য। এসব জানেন বলেই বাবার অন্তরের কথাগুলো স্পষ্ট বলতে পারেন না।

তাই বলে বাবার অব্যক্ত কথাগুলো পড়তে না পারার মতো মূর্খ নিশ্চয় আমিও নই। তবু চুপচাপ হুঁ হাঁ করেই শেষ করলাম সেদিনের কথোপকথন। আল্লাহ না করুক; যদি কোনোভাবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হই কিংবা মৃত্যু হয় আমার; বাবা কার কাছে সান্ত¡না খুঁজবেন? কী বলে প্রলাপ করবেন? আমার পরিবারের লোকগুলোই বা কীভাবে মেনে নিবেন? ন্যূনতম সাš¡Íনা কি পাবেন রাষ্ট্র কিংবা সাংবাদিক সংগঠনগুলোর থেকে?

হয়তো পাবেন অথবা পাবেন না কিন্তু আমি ও আমরা তো প্রতিদিন অনিশ্চয়তার ভেতরই দায়িত্ব পালন করছি। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কতটুকু স্বীকৃতি পাব; জানা নেই অথবা সরকারের বন্ধ ঘোষণার সময়ে কাজে তৎপর থাকাটা অপরাধে পরিণত হবে কিনা তা-ও জানা নেই। কিছু সিদ্ধান্ত এসেছে বটে। সেগুলোও স্পষ্ট করতে পারছে না সঙ্কটকালের কর্মের বিষয়টি।

নিরাপত্তার কথা ভেবে সাংবাদিকদের আশ্রয়স্থল জাতীয় প্রেসক্লাব লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে আগেই। কিছু কিছু অনলাইনও সংবাদমাধ্যম তাদের কর্মীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাসায় বসে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে কিন্তু সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি। যা অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু জাতিকে খবর জানাতেই হবে।

প্রযুক্তির এ যুগে প্রায় গণমাধ্যমেরই অনলাইন ভার্সন রয়েছে। তাই অনলাইনে বাসায় বসে যতটুকু সম্ভব খবর জানানো যেতে পারে। সম্ভবমতো অধিকাংশ সাংবাদিকরা বাসায় বসে কাজ করতে পারেন। প্রতিবেদকরা ফোন-সামাজিক মাধ্যমে তথ্য নেয়া ও যতটুকু খবর সংগ্রহে বাইরে না গেলেই নয়; সেটুকুর জন্য পিপিইসহ বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যে সব সাংবাদিক এই ক্রান্তিকালে সেবা দিচ্ছেন তাদের জন্য বাড়তি প্রণোদনারও ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যমের মালিকপক্ষকেও বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

লেখক: রনি রেজা- কথাশিল্পী ও সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এমএইচ





ads






Loading...