নারীর সঙ্কট, নারীকেন্দ্রিকতা

নারীর সঙ্কট, নারীকেন্দ্রিকতা
ড. হুমায়রা ফেরদৌস তানিয়া - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ২৫ মার্চ ২০২০, ০২:৫৫,  আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২০, ১০:০৭

কর্মজীবী মায়ের সন্তান হিসাবে ছোটবেলায় প্রায়ই একটা কথা শুনতাম যে, ইশ কি কষ্ট না, সারাদিন একা থাক, মাকে কাছে পাও না, এই রকম নানা আহা উহু। কিন্তু আমি আসলে কিছুতেই বুঝতে পারতাম না যে একা থাকলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? আমি তো দিব্যি স্কুল থেকে এসে হোমওয়ার্ক করে, বই পড়ে, পড়াশোনা করে নিজের মতো জীবন যাপন করছি।

সময়মতো ঘুম থেকে উঠছি বা অন্য সব করছি। আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না বরং যখন যা দরকার নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে করছি, বইয়ে পড়ি যে নিজের কাজ নিজে করতে হয়, আমি ঠিক তাইই করছি। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ঠিক কোন জায়গায়?

আমার ক্লাস থ্রি থেকে সিক্স আব্বু সিঙ্গাপুরে ছিল, পোস্টিং ছিল তার ওখানে আর আম্মার সরকারি চাকরির সুবাদে আমরা বাংলাদেশে থাকতাম, মাঝেমধ্যে যেতাম সেখানে, কিন্তু কেউ আমাকে বলত না যে ইশ কি কষ্ট, বেচারা বাবার কাছ থেকে দূরে আছে। আমার প্রতি এই অহেতুক বেদনা প্রদর্শন আর আম্মার কাজকে অবহেলা করার জন্য আমি এই সকল আত্মীয়দের ওপর খুবই বিরক্ত হতাম। আর মনে মনে ভাবতাম এরা তো দেখি আমার চেয়েও ছোট, একা থাকতে পারে না, সারাক্ষণ মা দরকার এদের!

তো যাই হোক যেটা বলছিলাম, স্কুলে বা কলেজে আমি কুইজ টিম রিপ্রেজেন্ট করতাম, এছাড়া গার্ল গাইডস করতাম, সেখানে অনেক সময়ই নানা বিষয়ে প্রশ্ন আসলে বা মতামত দেয়ার হলে আমি বেশ ভালোভাবে অংশ নিতে পারতাম। তো তখন অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করত কিভাবে এত কিছু জানা সম্ভব হলো? বা সাহিত্যের জ্ঞান, সাধারণ জ্ঞানের জন্য আমি কোনো বিশেষ ট্রেনিং নেই কিনা বা এর জন্য আমি অন্য কিছু করি কিনা। আমি মনে মনে হাসতাম আর খুব শান্ত হয়ে বলতাম এর সিংহভাগ কৃতিত্ব আসলে আম্মার।

তখন আবার সম্পূরক প্রশ্ন, তোমার মা না সারাদিন বাসায় থাকে না! তাহলে? আমিও মুখ টিপে হেসে জবাব দিতাম আম্মা বাসায় থাকলে আর জানা হতো না, থাকে না দেখেই না জানতে পারছি। ওরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেত। আসলে আম্মা যখন অফিস থেকে আসত তখন প্রতিদিনের বই, ম্যাগাজিন, পত্রিকা কিছু না কিছু নিয়ে আসত। সিনেমা থেকে শুরু করে ক্রীড়া, অর্থনীতি থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্য, কোনো কিছু বাদ নাই।

আর আমার কাজ ছিল এই সব বাসায় একা থেকে মন দিয়ে পড়া আর পরের দিন আবার নতুন কিছুর জন্য অপেক্ষা করা। ফলে আমি খুব ছোটবেলায় সিনেমার জন্য আলাদা পত্রিকা আছে, ক্রীড়া জগতের কারা নক্ষত্র, তাদের নিয়ে লেখা, বা সমসাময়িক রাজনীতি সব জেনে যাই, এমনকি কেউ কেউ যে সংবাদ বিকৃত করার হীন চেষ্টা চালায় সেগুলো বুঝতেও কোনো সমস্যা হতো না অথচ তখন আমার বয়স আক্ষরিক অর্থে বারো বা তেরো!

এছাড়াও আমি একদিন আগ্রহবশত গুনে দেখেছিলাম যে বাসায় ছোট-বড় সব মিলিয়ে ডিকশনারি ছিল প্রায় আট থেকে দশটা। সবই আমার আম্মার অবদান। উচ্চারণ-বানান-আ লিক কী নাই? আমার ভাষা নিয়ে মারাত্মক সংবেদনশীলতা আছে, তবে এমন যার শৈশব তার ভাষার প্রতি এত স্পর্শকাতরতা না থাকার কি কোনো যৌক্তিক কারণ আছে?

ভাবা যায় আম্মু আমাকে বর্ণমালা শিখিয়েছেন ছড়ার ক্যাসেটের মাধ্যমে! সেটা সেই তিন দশক আগের কথা। তখন বাংলা একাডেমি থেকে ছড়ার ক্যাসেট পাওয়া যেত, আমাকে আম্মা ছয়টা ক্যাসেট কিনে দিয়েছিল, একটা সংখ্যার, একটা এবিসিডির, একটা স্বরবর্ণের, একটা ব্যঞ্জন বর্ণের, আর বাকি দুইটা বাংলা ও ইংরেজি ছড়ার। ফলে সঠিক উচ্চারণে বাংলা শিখেছি আমি, অনেকের চেয়ে আগেই, অন্তত যারা আমাকে নিয়ে আহা-উহু করত তাদের ছেলেমেয়েদের চেয়ে তো আগে বটেই।

আম্মা আমাকে সব কিছু খাওয়ানোর অভ্যাস করিয়েছেন, কাটা মাছ থেকে কলার মোচা ঘণ্ট, সরিষা বাটা দিয়ে সাজনাসহ শক্ত চালের ভাত সব। শক্ত চালের ভাত এই জন্য বললাম যে জীবনে ভাত শক্ত একদিন হতেই পারে, প্রতিদিন সেটা ঠিক হবে না আর হয়ে গেলেও এতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না, একটু কষ্ট করে খেয়ে নিতে হয়, এই শিক্ষাও আম্মার।

আসলে আম্মা কর্মজীবী হওয়ার কারণে যে কত সুবিধা পেয়েছি বলার নয়। শুধু আর্থিকভাবে যে তা নয়, মানসিক সাপোর্ট এবং যে কোনো সমস্যার বাস্তব সমস্যা সমাধানে আম্মার কোনো জুড়ি ছিল না। আম্মু ...স্কুলের এই ফর্ম ফিল আপ করব কি করে? ঠিক মতো দরখাস্ত ভাঁজ কিভাবে করে? কোন কাজে কি ধরনের খাম ব্যবহার করতে হয়? কাগজপত্র বিভিন্ন ফাইলে গুছিয়ে রাখতে হয় কিভাবে?

আম্মু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট করে কী করে? আম্মু অফিসিয়াল চিঠি কেমন করে লেখা? আম্মু এই কবিতার বই লাগবে... আম্মু অফিস থেকে আসার সময় আমার জন্য অমুক দোকানের চানাচুর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বানিয়ে নিয়ে আসবা, বা আমি বাসায় পিজা বানাব, বইয়ে পড়েছি যে এর জন্য ইস্ট চাই, সেটা কোথায় পাব? আম্মু হয়তো বলল নিজেই গিয়ে নিয়ে আস, দেখ সাবধানে রাস্তা পার হবা, একা একা কাজ করতে শিখ। এই সবই আম্মা হাতে ধরে শিখিয়েছেন।

আবার স্কুলে স্ক্যাপবুক বানাতে হবে, আমার তো/আমার মা সব জানে/ এই সুবিধা আছেই, তাই আম্মুর কাছেই প্রশ্ন স্ক্যাপ বই কোথায় পাওয়া যায়? স্ট্যাম্প জমাচ্ছি, স্ট্যাম্প অ্যালবাম কিনে দাও, নিচে খেলার জন্য ভালো ব্যাডমিন্টন কর্ক এনে দাও ইত্যাদি নানান কিছু আছে যেগুলো আমি এখন বুঝি যে শুধু আম্মা চাকরি করত দেখেই এই ব্যবহারিক জ্ঞান ধারণ করত, নতুনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এখনো যে কোনো কিছু খুঁজে বের করতে, কিনতে যে আমার তেমন কোনো সমস্যা হয় না, কাউকে জিজ্ঞেস করা লাগে না সেটা আম্মার কারণেই।

কাপড়ের যত্ন নেয়া কাকে বলে সেটাও আম্মার কাছ থেকেই শেখা, সিল্কের কাপড়ের জন্য আলাদা ওয়াশিং পাউডার হয়, সেটা নিউমার্কেটের পিছনে একটা দোকান আছে সেখানে পাওয়া যায় (নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছি, তখন সুপারশপ হয় নাই)। আবার শীতের কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে নিম পাতা দিয়ে রাখলে সেগুলো ভাল থাকে এই তথ্যও আম্মু জানিয়েছেন। শুধু যে আম্মা আমার একজন মেন্টর হিসাবে কাজ করেছেন তা নয়, চাচাত-ফুফাত-মামাত-খালাত ভাই-বোন যে যখন আম্মার কাছে হেল্প চেয়েছে আম্মা সাধ্যের মধ্যে যতটুকু পারতেন করেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা আম্মা করেছেন আসলে আমি যখন সিক্স থেকে সেভেনে উঠি তখন, এর আগ পর্যন্ত আমি পড়াশোনা করেছি রীতিমতো খেলার ছলে, ইচ্ছা হলে পড়েছি না হলে নাই, কিন্তু আম্মু প্রেশার দেন নাই, তার কথা, আগে দেখি ওর আগ্রহ বা দুর্বলতা কোথায়? আগে বেসিকটা ঠিক হতে হবে। অন্য অনেকের অভিভাবকেরা যখন কেন বাংলায় এক নম্বর কম পেল এই নিয়ে পেরেশান আম্মা তখন আমার ঔষধ, ওষুধ আর অষুধের পার্থক্য বুঝাচ্ছেন!

ক্লাস সেভেনে ওঠার আগ দিয়ে তার মনে হলো যে এখন একটু অঙ্কে জোর দেয়া দরকার, কারণ এখন বীজগণিত শুরু হবে, এখন ভিত্তি শক্ত না হলে পরে ও বিপদে পড়বে, এমনিতে পাটিগণিত তো খারাপ পারে না ও, বীজগণিতও ভালো করে পারুক। তো আমার এক ভাইয়াকে বললেন একটু দেখানোর জন্য, প্রেশার দেয়ার দরকার নাই।

আর আমি এই নতুন এবিসি (!) দিয়ে লেখা গণিতে এত আনন্দ পেলাম যে কিছুদিনের মধ্যেই আমার বীজগণিতের প্রতি মারাত্মক মায়া জন্ম গেল। সেই মায়া এমনই প্রবল হলো আর কাটলই না, পদার্থ বিজ্ঞান যে পরে পড়েছি সেটার কারণও ছিল আম্মার সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ, আমার কোনদিকে পারদর্শিতা ছিল সেটা তিনি ধরতে পেরেছিলেন।

মাকে ছোটবেলায় চাকরি করতে দেখেছি বলেই হয়তো আমি মারাত্মক কাজপাগল, কাজ ছাড়া আমি এক মুহূর্ত থাকতে পারি না, অন্তত যেটা আমার ভালো লাগে আমি সেইটুকু করতে চাই। এই চাই বলেই হয়তো নিজের কর্মজীবন পনেরো বছর হয়ে গেল দেখতে দেখতেই। আম্মার কথা অনুযায়ী কোনো কাজই ছোট নয় এটা শুনে টিউশনি দিয়ে শুরু করা, পড়াশোনার পাশাপাশি চার বছর চাকরি করা, তারপর শিক্ষকতা শুরু করে বিদেশে পড়তে যাওয়া, বেশ দ্রæত ও কোন ঝামেলা ছাড়াই পিএইচডি করে ফেলা, পরে আবার দেশে ফিরে চাকরি করা, সঙ্গে সংসার করা ও ব্যবসা আরম্ভ করা সব কিছুই তো হয়ে যাচ্ছে বেশ অনায়াসেই।

আর এখন যখন সেই আত্মীয় বা প্রতিবেশী বা অন্যরা আগের সেই যুক্তিই দিয়ে যাচ্ছে মা বাসায় না থাকলে বা চাকরি করলে ছেলে-মেয়ে বখে যাবে, নষ্ট হবে তখন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি আমি আসলে কি তাহলে ব্যতিক্রম? না উনাদের বুদ্ধির লেভেল...থাক আর বললাম না, তবে আমার ছোটবেলায় নেয়া সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই তো এরা পরিবর্তন করতে পারল না... কি আর করা, সবাই সব কিছু পারে না, মা লাগে এদের সব সময়!

লেখিকা: ড. হুমায়রা ফেরদৌস তানিয়া- বিভাগীয় প্রধান, পদার্থ বিজ্ঞান  বিভাগ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

 




Loading...
ads






Loading...