পরিবেশ আজ কোন দিকে হাঁটছে

মোহাম্মদ মহসীন - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ২৪ মার্চ ২০২০, ০০:২৮,  আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২০, ০৯:৫২

মানুষ সৃষ্টির সেরা। এটাও প্রকৃতির দান। প্রকৃতির কোলে জšে§ছি বলে মৃত্যু অবধারিত। তা অস্বীকার করার মতো রাস্তা নেই। আবার মৃত্যুর পরও দোল খেতে খেতে নিয়ে যায় অচিন ঠিকানা। শীতল বিছানায় চিরনিদ্রায় ঘুমাতে হয়। পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের হিসাবও মিলাতে হয় কখনো দেহের কখনো মনের।

প্রকৃতির ওপরই আমাদের বেঁচে থাকা ও জীবনযাপনের জন্য নির্ভরশীল হতে হয়। দুনিয়ার পূর্বের ইতিহাস পরিবর্তন, বিপর্যয়, নাম না জানা কত উদ্ভিদ ও প্রাণীও বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে।

ছেলেবেলায় দেখেছি আঁকা-বাঁকা মেঠোপথের উভয় পাশে ফসলি জমিতে সেচের জন্য নির্ভর করত খাল, পুকুর, ডোবা, নালাও। এতে সবুজ প্রান্তে কিষাণ, কিষাণির মুখে থাকত হাসির ঝলক ও ফুরফুরে গান। আজ নদ- নদীর বুকে পানি নেই। সেচের ব্যবস্থা ক্ষীণ। তাতে অতীত স্মৃতিতে অ¤øান বললে ভুল হবে না।

দিনের টানে ফসলাদির জায়গা ভরাটের ফলে গাঁও গ্রামের আধাপাকা ঘরবাড়ি ফাঁকে ফাঁকে শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্মাণ হচ্ছে ইটের তৈরি দালানও। এতে কাটা পড়ছে বৃক্ষ পাশাপাশি বিতাড়িত হচ্ছে পাখপাখালিরাও।

দেখেছি প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ছিল নানান জাতের ফুল-ফলের বাহারি গাছ। বাড়ির পাশে ছিল বেতঝাড়। প্রকৃতির কোলে ভেসে বেড়াত নানান প্রজাতি ও পাখির গান। সেকালে বাড়ি বানালে পুকুর চাই। যে বাড়িতে ছোট বড় পুকুর থাকত। সে বাড়িকে আদর্শ বাড়ি বলে চিহ্নিত করত। শীত মৌসুমে দল বেঁধে পুকুরে ঠাণ্ডা পানিতে হাত দিয়ে ও ঠেলা জালে মাছ ধরেছি। চোখ লাল করে বাড়ি ফিরেছি। ওখান থেকে শীতকালের মিষ্টি রোদে বসে ভাতও খেয়েছি। ভাত খেতে যদি তরকারি না পেতাম, তাহলে একটু সরিষার তেল, একটু হলুদ বাটা মেখে স্বাদে গন্ধে দারুণ মজা করে খেয়েছি। বর্তমানে সে কথাও অতীত।

শৈশবে ফলমূল খেয়েছি। তাতে ছিল না ফরমালিন। ছিল না মরণব্যাধি ক্যানসার। তখন নানান খাবারে ছিল প্রকৃত মজা। নানান ফলফলাদি ও সবজিতেও জাত গন্ধ ছিল। এখন তার উল্টো।

মাঘ মাসে আখক্ষেত, ঝোপঝাড়ের শেয়াল চৈতন্যধারী এই প্রাণী দল বাড়িতে হানা দিয়ে কুকুরের ছানা নিয়ে তারা খেত। ঘরের পিঁড়ার পাশে গুইসাপ, বেজিও বিচরণ করত। ছোট ছিলাম বলে ভয়ে দিনক্ষণও কাটত। আধুনিক আমলে সেই বৃক্ষরাজি, ঝোপঝাড়, ডোবা, নালা, পুকুর, ফসলের মাঠে গড়ে উঠেছে নানান ধরনের ইমারত। শাপলা শালুক সচরাচর দেখা মিলে। তবে জাতীয় ফুল শাপলা প্রকৃতি থেকে একদিন হয়তো বা বিদায় ঘটবে।

প্রকৃতি আজ কোনদিকে হাঁটছে। অনুমান করা যেতে পারে সামনের দিনগুলো হয়তো পরিবেশের ওপর বিপর্যয়ের হাতছানিও কম নয়।

শৈশবে আরো দেখেছি, শর্ষে ফুলে ভ্রমর ও মৌমাছি, প্রজাপ্রতিরাও নিত্যের খেলা করত। কখনো উত্তর কিংবা দক্ষিণের দূষণবিহীন বাতাসে মন জুড়াতাম। মাঠে ঘাটে খেলায় খেলায় দিন কেটেছে। বইয়ের পাতায় লেখা থাকে, পড়ালেখার ফাঁকে একটু আধটু খেলাধুলা চাই। শিশুরা আজ বিকশিত জীবনের সোপানে বন্দিশালায় আটকে আছে। শৈশবের কথা আজকের শিশুদের কাছে সিন্দাবাদের গল্পের মতো। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাস থেকে জেনেছি, হিন্দুদের থাকার বসতি গিজ-গিজে। লেখকের উক্তি থেকে ধারণা করতে পারি আগামী দিনগুলো নতুন প্রজšে§র তালিকা থাকতে পাড়ে।

শহর কথা বাদ দিলেও গাঁও গ্রামে অপরিকল্পিত শিল্প-কারখানার বর্জ্য দূষিত করছে নদ-নদীসহ বিভিন্ন জলাশয় ও নানান ফসলের মাঠ। আর বর্ষা মৌসুমে সোনারগাঁয়ের শিল্প-কলকারখানার ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি ডোবা, নালা, খালে চলে সরবে, নীরবে। আর বর্ষার শেষে সরাসরি মেঘনা নদী, ধলেশ্বরী ও ব্রহ্মপুত্র নদে। বাদ পড়ছে না পোড়া মবিলও। এতে ছোট বড় নদীতে দেশীয় মাছ পাওয়া দুষ্কর। এই কারণে জেলেদের জীবনও আজ নানা ঘূর্ণিপাকে। তাদের ভাগ্যের চাকা সচরাচর না আর ঘুরলেও সন্তানদের লেখাপড়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, যা আমাদের পুষ্টির চাহিদা মিটাতে তাদের কোনো জুড়ি নেই।

মানুষ আজ দিশেহারা। চারদিকের বাতাসে ছড়াচ্ছে দূষিত বায়ু কার্বন ডাই অক্সাইড। পাশাপাশি পত্রিকা থেকে জানতে পারি, মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনে ক্ষতি সাধনও কম হচ্ছে না। এতে দিনদিন মানুষের মেধা শক্তি লোপ পাচ্ছে। নানা রোগ কঠিনতর হচ্ছে। এই নিষ্ঠুর আচরণে প্রকৃতি যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি বস্তু কণার ক্রিয়া আছে। সমাধানও মেলে। তাহলে আইনের প্রতি কতটা আমরা শ্রদ্ধাশীল? একটু ভেবে দেখা উচিত।

বহির্বিশ্বের দিকে তাকিয়ে পরিবেশ ও প্রকৃতি যেন আগামী দিনগুলো সুন্দর চিন্তায় এগিয়ে যাবে। সেই কল্পে আমাদের নতুন প্রজš§কে রক্ষা করা সময়ের দাবি ছাড়া আর কি?

লেখক: মোহাম্মদ মহসীন - প্রকৃতিবিষয়ক প্রাবন্ধিক

মানবকণ্ঠ/এআইএস

 




Loading...
ads






Loading...