করোনা ভাইরাস ও নাগরিক সচেতনতা

সাহাদাৎ রানা - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • সাহাদাৎ রানা
  • ২৪ মার্চ ২০২০, ০০:২৫,  আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২০, ০৯:৫৩

করোনা নামের ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় সারা বিশ্ব। প্রতিদিনই অনেক দেশে মারা যাচ্ছেন অনেক মানুষ। এ কারণে পুরো বিশ্বের কাছে করোনা ভাইরাস মানেই যেন এক আতঙ্কের নাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পুরো পৃথিবীতে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। যে আতঙ্ক এখন এসে লেগেছে বাংলাদেশেও।

শুরুতে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান না পাওয়া গেলেও ধীরে ধীরে পাওয়া যাচ্ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী। সম্প্রতি বাংলাদেশে একজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন। এমন খবরে সবার মধ্যে কাজ করছে ভয়।

এমন ভয়ের মধ্যে প্রশ্ন আসে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন? অবশ্য এ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। ভয়ের কারণ এখন পর্যন্ত এই রোগের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। তবে বাস্তবতা হলো ওষুধ আবিষ্কার না হলেও এখন এ রোগ প্রতিরোধে সবেচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। কিন্তু আমাদের ভয়ের পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। প্রধান কারণ হলো আমরা নাগরিকরা সেভাবে সচেতন নই।

এছাড়া আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ত্রæটি রয়েছে। প্রথমত আমরা নিজেদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদাসিন। কিন্তু এক্ষেত্রে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ জনবহুল একটি দেশ। তাই আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ আরো বেশি করে দেখা দিলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা নিয়ে অনেকে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে সামান্য ডেঙ্গু রোগ আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিমাণ ভুগিয়ে যাচ্ছে তাই শঙ্কার জায়গাটা আরও বেড়ে যায়। এ কারণে করোনা নিয়ে বাড়তি ভয় সবার মধ্যে।


আশার খবর হলো সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু এবং মাথাপিছু আয়ও। প্রতি বছর বাড়ছে বাজেটের আকারও। এতো কিছুর বাড়ার পরও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ব্যয় তেমন বাড়ছে না। এ বিষয়ে একটু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৩২ ডলার। এই ব্যয় শুধু দক্ষিণ এশিয়াই নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যেও সবচেয়ে কম।

এমন তথ্য আমাদের জন্য সত্যিই অস্বস্তির। বাস্তবতা হলো আমরা এখনো নানা কারণে স্বাস্থ্য সেবায় আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। তবে এটাও সত্য যে বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে।

বিশেষ করে সংক্রামক রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সফলতা প্রভ‚ত। এমন একটা সময় ছিল যখন হাম, বসন্ত, কলেরা, প্লেগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়েছে। সেই কঠিন সময় আমরা অনেক আগেই পার করে এসেছি। হাম, বসন্ত, কলেরা ও প্লেগ এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। এমনকি পোলিও নির্মূল হয়েছে অনেক আগেই। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের ভ‚মিকা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওরস্যালাইন এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন; আর এর কৃতিত্ব বাংলাদেশের। উন্নত কোনো দেশে হলে নিশ্চিত নোবেল মিলত।

অথচ আমরা ভেবেও দেখি না, অত্যন্ত সরল এক সমাধান সারা বিশ্বের প্রতিনিয়ত অযুত-নিযুত মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। এ যেন এক জাদুকরী নিদান। এছাড়া সফলতা এসেছে মা ও শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও। আগের তুলনায় মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে এসেছে। আবার বিপরীত চিত্রও রয়েছে। বতর্মান সময়ে আমাদের দেশে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে চলেছে; যা রীতিমতো আশঙ্কার, আতঙ্কের। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হƒদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, পক্ষঘাতগ্রস্ততা, কিডনি রোগ, অটিজম ও মানসিক রোগীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত।


এখন যাওয়া যাক মূল প্রসঙ্গে। এখন সবার জন্য আতঙ্কের নাম হয়ে এসেছে করোনা। তাই প্রশ্ন উঠেছে আমাদের সক্ষমতা নিয়ে। তবে আশার খবর হলো করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ইতিমধ্যে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সব হাসপাতালে গাউন, মাস্ক ও গøাভস যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে শুধু সরকারের একার পক্ষে উদ্যোগ নিলে হবে না। সার্বিক বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। যদি বিদেশ থেকে বাংলাদেশে কেউ আসে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখার ক্ষেত্রে ভ‚মিকা নিতে হবে। এক্ষেত্রে ডিসি, সিভিল সার্জন, এসপি, ইউএনও, সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের অগ্রণী ভ‚মিকা রাখতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে।

যদি কেউ এক্ষেত্রে আইন না মানে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। করোনা ভাইরাসের কারণে ইতোমধ্যে সরকার ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করার এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই হবে না। পাশাপাশি ছেলেমেয়েরা যেন বাইরে ঘুরে না বেড়ায় সেই দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে অভিভাবকদের। তবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।


এখানে আরো কিছু জায়গায় শঙ্কার বিষয় রয়েছে। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ গুজব তৈরি করছে। আর সেই গুজবে কান দিয়ে কিছু মানুষ অতিরিক্ত খাদ্য দ্রব্য কিনছে। সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ীরা মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেননা, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রয়েছে। এক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কিছু মানুষ তা মানছেন না।

তাই এ বিষয়ে সরকারকে আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন। করোনা ভাইরাসের বিষয়ে সবচেয়ে আশার খবর হলো, করোনা একটি ছোঁয়াচে রোগ হলেও অধিকাংশ মানুষ এ রোগে সুস্থ হয়ে যান। এক্ষেত্রে করোনা প্রতিরোধে সঠিক সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ ও সচেতন থাকার কোনো বিকল্প নেই।

সতর্ক ও সচেতনতার মধ্যদিয়ে মূলত করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। এখন সবাইকে মনে রাখতে হবে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষ করে নাগরিকদের সচেতনতা এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে সচেতন হতে হবে। অন্যকেও সচেতন হতে পরার্মশ দিতে হবে। তবেই সম্ভব করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করা।

লেখক: সাহাদাৎ রানা- সাংবাদিক




Loading...
ads






Loading...