করোনা: দুরাশায়ও ভরসা

রিন্টু আনোয়ার - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ২৪ মার্চ ২০২০, ০০:২২,  আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২০, ০৯:৫৪

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দ্য লাস্ট সানসেট’ শিরোনামে ঘুরছে ছবিটি। যা তুলে ধরেছে চীনের উহান শহরের একটি হƒদয়বিদারক মুহূর্ত। ৮৭ বছর বয়সী লুইকাই করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। ক্রিটিক্যাল অবস্থায় তার অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী ডাক্তার তাকে শেষবারের মতো তার প্রিয় শহর উহানের সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ করে দেন। এটিই ছিল তার জীবনের লাস্ট সানসেট দেখা। দিনে দিনে করোনা ভাইরাসের অবস্থা এখন যে জায়গায় এসেছে, তাতে সেই সুযোগও এখন কারো নেই। মৃত্যু-দাফন সবই হচ্ছে প্রিয়জনহীনভাবে। এমন মৃত্যু কারোরই কাম্য নয়।

বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিও কখনো ভাবেননি তার লাশের পাশে থাকবে না কোনো স্বজন। তার জানাজায় থাকবে না কোনো মুসল্লি। শেষবারের মতো একনজর দেখতে ভিড় করবে না প্রিয় কেউ। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রথম মৃত ব্যক্তির দাফন হয়েছে আজিমপুর কবরস্থানে। এই ব্যক্তির দাফন-কাফনে তার স্বজনদের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি হয়নি জানাজাও। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বাক্সসহ লাশের দাফনের ব্যবস্থা করেছে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের একজন ম্যাজিস্ট্রেট দূর থেকে শুধু তদারকি করেছেন।

মরণঘাতী বিমারির ঘটনা পৃথিবীতে এই প্রথম নয়। তবে, ধরনে এবার ভিন্নতা রয়েছে। আগে এই রকম ঘটনায় গরিবরাই কেবল মরত। ধনীরা অর্থ জোরসহ নানা পথে পার পেয়ে যেত। এবার সেটা হচ্ছে না। সর্বব্যাপী করোনা কাউকে ছাড়ছে না। ভীষণ নিরপেক্ষতায় ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কাউকে আক্রান্ত করছে অহরহ। পরিবার-পরিজন নিয়ে সিংগাপুর, লন্ডন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বাঁচার সম্ভাবনা কম। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়াতে অভিনয় করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন হলিউড অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস ও তার স্ত্রী রিটা।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সোফি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাদিন ডরিস। ইরানের বেশ কয়েক সংসদ সদস্য ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবতেকার, উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী ইরাজ ও উচ্চপর্যায়ের অনেকেই এখন করোনায় আক্রান্ত। চীনের যে ডাক্তার করোনা ভাইরাসটি প্রথম আবিষ্কার করেছেন তিনিও করোনায় মারা যান। ইরানের বিখ্যাত আলেম মোদাররেসি যিনি করোনাকে চীনের ওপর আল্লাহর গজব বলে আখ্যায়িত করেছিলেন তারও রেহাই মেলেনি।

সারা পৃথিবীতে আলেম-পুরোহিত-ফাদাররা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছেন। সান্ত¡না দিচ্ছেন কিন্তু সমাধান দিতে পারছেন না। ধর্ম নিয়ে বিশ্বে যত হানাহানিই থাকুক তারা কেউ ধর্মীয় উপাসনা বন্ধ করেননি কিন্তু এবার সব ওলট-পালট। সময় যত গড়াচ্ছে এই মহামারী তত ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীময়। হাজার হাজার মৃত্যু, লাখে লাখ আক্রান্তের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাঁচার উপায় খুঁজছে মানুষ। কারণ রোগটি নিরাময়যোগ্য কিন্তু অপ্রতিরোধ্য নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য গবেষকরা এমন কিছু উপায়ের কথা বলছেন, যা মেনে চললে এই ভাইরাসের সংক্রমণ একটু হলেও ঠেকানো যাবে। করোনাভাইরাস মোকাবিলার প্রথম কাজ হলো লাখ লাখ মানুষের পরীক্ষা করা। আশার খবর হচ্ছে, বর্তমানে চীনের উহানসহ অন্যত্র আর নতুন করে কোনো করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলেনি। বলা চলে চীন প্রায় করোনা মুক্ত। করোনার চিকিৎসায় জাপানে তৈরি একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ওষুধ মোটামুটিভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। জাপানের ফাভিপিরাভির নামের ওষুধটির কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অনেক বছর আগের কিউবার আবিষ্কৃত ‘ইন্টারফেরন আলফা টু-বি’ ওষুধটিও করোনার ক্ষেত্রে কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ভারতের প্রখ্যাত ডাক্তার ডা. দেবী শেঠির মতে, যাদের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বেশি এবং অপেক্ষাকৃত তরুণ তাদের সংক্রমণ হলেও সাত দিনের মধ্যে এমনিতেই সেরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এক রকম হতাশার মাঝেও বাংলাদেশ তথা বিশ্বের জন্য সুসংবাদ এনেছে আমাদের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। তাদের উদ্ভাবন বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা। আইইডিসিআরের কাছে এ ভাইরাস পরীক্ষার কিট ছিল মাত্র ২ হাজারটি। ইতোমধ্যে খরচ হয়েছে ৩শ’র মতো। সরকার চীনের কাছে ২০ হাজার কিট চেয়েছে। কবে পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা চীনের সরবরাহ করা কিট ব্যয়বহুল এবং তা দিয়ে পরীক্ষার জন্যও প্রয়োজন উন্নত ল্যাবরেটরির।

সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গবেষণাগারে ড. বিজনকুমার শীলের নেতৃত্বে ড. নিহাদ আদনান, ড. মোহাম্মদ রাশেদ জমিরউদ্দিন ও ড. ফিরোজ আহমেদ দুই মাসের চেষ্টায় এই কিটটি উদ্ভাবন করেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত এ কিট দিয়ে যে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে সর্বোচ্চ ৩শ’ টাকায় তা পরীক্ষা করা সম্ভব।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র জানিয়েছে, প্রতিমাসে ১ লাখ কিট উৎপাদনের সক্ষমতা আছে তাদের। কেন্দ্রের প্রধান ডা. জাফরুল্লাহ জানান, ভ্যাট-ট্যাক্স মওকুফ করলে ২শ’ টাকায় তারা এই কিট সরবরাহ করতে পারবে কিন্তু ল্যাবে গিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে মানুষ যদি জটিলতায় পড়ে তা হবে দুঃখজনক।

করোনা আতঙ্কে বর্তমান পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষের মধ্যে মরণাতঙ্ক ঢুকে এক করুণ অবস্থা সূচিত করেছে। স্পর্শতে করোনা ভাইরাস ছড়ায় বলে মানুষে মানুষে এখন করমর্দন বন্ধ হয়ে গেছে। সামনে ঈদ। হয়তো কোলাকুলিও হবে না ঈদ জামাতে। অবস্থার আরো অবনতি হলে ঈদ জামাতও নাও হতে পারে। মানবিক বোধের অবনমনের একটা পর্বও দেখিয়ে দিল করোনা। ইতালিতে বয়স্কদের বাসায় রেখে আইসিইউতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে অপেক্ষাকৃত তরুণদের।

কারণ বুড়োদের বয়স হয়ে গেছে, তারা মরলে ক্ষতি কম! তরুণদের বাঁচতে দিতে হবে। বন্ধ হয়ে গেছে রোববারের গির্জার প্রার্থনা। সৌদিআরবে মসজিদের সাপ্তাহিক জুমা, ওমরা হজ বন্ধ হয়ে গেছে বেশ ক’দিন আগেই। দেশে দেশে বন্ধ হয়ে গেছে মানুষের সব সামাজিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আরাধনা।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক দেশে পর্যটন বন্ধ। ওমরাহ রেজিস্ট্রেশন বন্ধ, তাজমহল বন্ধ। অনেক এলাকা ‘লক’ করা হয়েছে। এতকিছুর পরও জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষকে ঘরের বাইরে যেতে হয়। হোটেল-রেস্টুরেন্টে খেতে বসতে হয়, কাঁচাবাজারের পথে ছুটতে হয়।

আমাদের দেশে শুরু থেকেই ছিল সরকারের গা-ছাড়া ভাব। সরকারের যত ব্যস্ততা ছিল মুজিবশতবর্ষসহ অন্যান্য কাজে। প্রথম দিকে আমাদের দেশে প্রবেশপথগুলোতে বিশেষত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। কেবল কারিগরি অসুবিধার কারণে নয়, দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলাও ছিল দৃশ্যমান। প্রথম থেকেই উপযুক্ত পরীক্ষা করা হলে হয়তো বাংলাদেশে এই ভাইরাস বিস্তারের হার আরো কম হতো। নানান কথামালা, চাতুরির সুযোগ থাকলেও পরিস্থিতির অনিবার্যতায় এখন আর গা ছাড়ার সুযোগ নেই।

এই পরিস্থিতিতে বর্তমানে প্রতিটি মানুষের জন্য সোশ্যাল ডিসট্যান্স বজায় রাখা জরুরি কিন্তু সামাজিক দূরত্ব, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন নিয়ে একটা খটকা লেগে আছে। বিষয়গুলো পরিষ্কার নয় সবার কাছে। সামাজিক দূরত্ব হলো সমাজে যে মানুষদের সঙ্গে আপনি বসবাস করেন তাদের সঙ্গে যে একটা নির্দিষ্ট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। কারণ করোনা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় এবং এই কারণেই বাংলাদেশ সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলাধুলার প্রতিযোগিতা, সমুদ্র সৈকতে জমায়েত স্থগিত করেছে। অন্যান্য দেশেও এই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা-বাড়িতে একা থাকাও এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই সময়ে রেস্টুরেন্ট, বার, ক্যাফেতে যাওয়া বন্ধ করাও জরুরি। এতে একটু হলেও ভাইরাস সংক্রমণের মাত্রা কমে যাবে। আর আইসোলেশন হলো ভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া। এটি সাধারণত সুস্থ মানুষদের জন্য ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি প্রক্রিয়া। আর কোয়ারেন্টাইন হলো করোনা ভাইরাসের হালকা উপসর্গ যাদের দেখা দিয়েছে তাদের অন্য কারো সঙ্গরোধ করার পদ্ধতি। বিষয়টি দেশ, শহর ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।

তবে, এসব সাময়িক সতর্কতা মাত্র। ব্যক্তি বা পরিবার বিশেষের সাময়িক ‘কষ্ট’ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি লাঘব করবে অথচ সাবধানতা-সতর্কতার চেয়ে আমাদের মধ্যে করোনার ভয়ে চাল-ডাল, তেল, লবণ, সাবান, হ্যান্ডওয়াশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি বিলাসী পণ্য কেনার গরজ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শপিং মল পর্যন্ত কেনার জন্য মানুষের হুমড়ি খাওয়া।

আপদকালীন প্রয়োজন মেটানোর চেয়ে এ কেনাকাটার নমুনায় উৎসব ভাব বেশি। যেন বিশাল ও জরুরি কোনো উপলক্ষ। রান্নাঘর, স্টোর, শোয়া-বসার রুমেই মজুদ করছেন পণ্যগুলো। করোনায় নিত্যপণ্যে আকাল আসবে-এ ব্যাপারটা তারা নিশ্চিত হয়েই পণ্যের স্টক গড়ছেন তারা অথচ এই করোনায় নিজেদেরও প্রাণ যেতে পারে-সেটা ভাবনায় নিচ্ছেন না কেউই। কাফনের কাপড় স্টক করার দরকার মনে করছেন না। আল্লাহ্ না করুন সত্যি যদি লাখে লাখ-কাতারে-কাতার লোক মারা পড়ে তখন মজুদকৃত এই খাদ্য কি গলায় ঢুকবে?

সরকারের দিকে একরোখা নির্ভর না করে ঘরে-বাইরে ব্যক্তি পর্যায়ের সতর্কতাই এই ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর হবে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। তাই বলছি আপনি সচেতন হোন অন্যকে সচেতন করুন। মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আমাদের জন্য আল্লাহই একমাত্র ভরসা।

- লেখক:  রিন্টু আনোয়ার - সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 




Loading...
ads






Loading...