সময় এসেছে মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার করার

সময় এসেছে মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার করার - সংগৃহীত

poisha bazar

  • ২৩ মার্চ ২০২০, ০০:৪৮,  আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২০, ১০:২৯

চলমান মুজিববর্ষে বাঙালি নব উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হয়ে মুজিববর্ষ উদযাপনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বাঙালির  ঘরে ঘরে এখন একটাই কলরব বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষের উদযাপনের মাধ্যমে বাঙালি আবার নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আগামী দিনের যাত্রা শুরু করবে। সেই নতুনের যাত্রায় উদীয়মান প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রগতিশীল যাত্রীরা বঙ্গবন্ধুকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করবে। বাঙালির চেতনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধুমাত্র একটি নামই নয়।

বঙ্গবন্ধু হলেন সেই বটবৃক্ষের ছায়া, যার ছায়ায় গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির মানুষ আশ্রয় নিয়ে সচেতনায় শান্তি লাভ করে থাকে। বটবৃক্ষ যতই পুরনো হয়, ততই তার পত্র পল্লব সবুজের সমারোহে ঝিলমিল করে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কিছু বলা যায়। কবি শামসুর রাহমানের মতো যদি বলি তাহলে বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু হলেন বয়সী বটের ঝিলমিলি পাতা। এখন প্রশ্ন হলো এদেশের মানুষ কি বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছে? তিনি বাঙালির কত বড় বন্ধু ছিলেন, এক শ্রেণির মানুষ আজো তা অনুধাবন করতে পেরেছে কি না সন্দেহ আছে।

এদেশের এক শ্রেণির মানুষ এখনো বঙ্গবন্ধুকে ভালো চোখে দেখে না। ভাবে এই লোকটার জন্যই তো অনেক প্রাপ্তি থেকে তারা বি ত হয়েছে। নিজেদের লাভ লোকসানের হিসাব থেকে তারা এখনো স্বপ্ন দেখে পুরনো জায়গায় চলে যাওয়ার। এই শ্রেণির লোকদের চিন্তা চেতনা এতটাই পশ্চাদমুখী যে, তারা বুঝতে পারে না এদেশের সাধারণ মানুষ অর্থাৎ যারা আমাদের এই দেশটাকে নিজের মায়ের মতো ভালোবাসে তারা জানে মাতৃভূমি আর নিজের জন্ম ধাত্রী মায়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

এদেশের মানুষ আজো নীরবে নিরালায় বঙ্গবন্ধুর কথা ভেবে চোখের জল বিসর্জন করে থাকে। সচেতন মানুষ মনে করে বঙ্গবন্ধু যদি আজকের দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতেন তাহলে যারা অন্ধকারে লুকিয়ে থেকে সাধারণ মানুষের প্রাপ্তিটুকু কেড়ে নিতে চায়, সেইসব লোকেরা কখনো সাহস পেত না বাঙালির মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত হানতে। দেশের সমৃদ্ধিও কখনো আটকে থাকত না দেশবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলদের কালো থাবার আঘাতে।

আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের লোকেরা একটা বিষয় ভালো করে বুঝে যে, যারা বাঙালি চেতনায় বিশ্বাস করে না, তারা কখনো চায় না আমার এই দেশ মাতৃকার সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পেতে পেতে দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা উন্নতির শিখরে চলে যাক। প্রতিক্রিয়াশীলরা মনে করে দেশ যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সামনের দিকে অগ্রসর হয় কিংবা দেশের মানুষ যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষ প্রগতির পতাকাতলে সমবেত হয়ে প্রগতির গান গাইবে।

প্রগতির পতাকা যেখানে আপন মহিমায় উড়তে থাকে সেখানে প্রতিক্রিয়াশীলরা সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারে না। প্রতিক্রিয়াশীলরা একথাও ভালো করে বুঝে যে, সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিতে না পারলে তাদের রাজনীতি মাঠে মারা যাবে। তাদের অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীলদের রাজনীতি মাঠে মারা গেলে, যারা দেশের উন্নতি কামনা করে না, তারা মানুষের মনে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে না। তাই আমরা এদেশের মাঝে বিভিন্ন সময় অপ্রীতিকর নৃশংস ঘটনা ঘটতে দেখেছি।

বঙ্গবন্ধুকে যে রাতে পরিবারসহ হত্যা করা হয়েছে, সেই রাত্রে কি শুধু বঙ্গবন্ধুকেই পরিবারসহ হত্যা করা হয়েছিল? সেই রাতে অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাতে শুধু বঙ্গবন্ধুকেই পরিবারসহ হত্যা করা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই রাতে হত্যা করা হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা আমাদের সকল আদর্শকে। সেই রাতে আঘাত আনা হয়েছিল আমাদের চেতনায়, আমাদের চিন্তায়, আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শুভ্র বাস্তব কল্পনায়। ১৫ আগস্টের কাল রাত্রিতে আমরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে পরিবারসহ হারাইনি। এদেশের মুক্তি পাগল মানুষ সেই রাত্রিতে হারিয়েছিল তার সকল গণতান্ত্রিক অধিকার। আমাদের সংবিধানকে প্রতিক্রিয়াশীলরা কাটা ছেঁড়া করে প্রগতির ধারাকে মুছে ফেলতে উদ্যত হয়। বাংলাদেশ বেতার হয়ে যায় রেডিও বাংলাদেশ। সবচেয়ে চরম আঘাত আসে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর।

দেশের জন্য যারা যুদ্ধ করেছিল, সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়। সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্রের চেতনা কেটে ফেলা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, দেশের মানুষ কি প্রতিক্রিয়াশীলদের কার্যকলাপ মেনে নিয়েছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় শাণিত হয়ে এ দেশের মানুষ প্রতিক্রিয়াশীলদের কার্যকলাপ মেনে নেয়নি।

তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন দেশের মাঝে তার পিতার হত্যার পর প্রথম আসেন, সেদিন এদেশের সাধারণ মানুষ সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে তাকে এক নজর দেখার জন্য উপস্থিত হয়েছিল। সেদিনের দেশের মানুষের বাঁধভাঙ্গা জাগরণ দেখে প্রতিক্রিয়াশীলরা ঠিকই বুঝেছিল, জীবিত মুজিব থেকে মৃত মুজিব অনেক শক্তিশালী। প্রতিক্রিয়াশীলরা আবার ষড়যন্ত্র শুরু করে। কিন্তু দেশের মানুষ প্রতিক্রিয়াশীলদের সব রকমের ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে সামনের দিকে এগোতে থাকে। মুজিব পাগল মানুষের সংগ্রামী চেতনায় আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দ্বারপ্রান্তে দেশকে নিয়ে এসেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অনেক দেরিতে হলেও বাঙালি করেছে। অনেক আসামির সাজা কার্যকর হয়েছে। অনেক অপরাধী সাজা মাথায় নিয়ে দেশের বাইরে লুকিয়ে আছে। সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে দেশের বাইরে লুকিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করতে। আজ দেশের সর্বত্র একটা কথাই আলোচিত হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর হত্যার পিছনে যারা ছিল, যারা কখনো সামনে আসেনি কিংবা যারা পর্দার আড়ালে থেকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীলনকশার পথ মসৃণ করেছিল, তাদের কি বিচার হবে না? তাদের মুখোশ কি দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত হবে না? আজ দেশের মাঠে-ঘাটে গ্রাম-গঞ্জের বাজারে চা স্টলে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায়, দেশের মানুষের সুস্থ আড্ডায় একটি কথাই উচ্চারিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হোক।

দেশের সর্বত্র মানুষের আলোচনায় বুঝা যায় যে, দেশের মানুষ চায়, যারা বন্ধু সেজে কিংবা শত্রু সেজে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে পর্দার আড়ালে থেকে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের বিচার হোক। আজ সময় এসেছে পর্দার অন্তরালে থাকা মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার করার। যদি পর্দার অন্তরালে থাকা বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার না করা হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তাই আজ দেশের সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের উচিত হবে মুজিব হত্যার পর্দার অন্তরালে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের দাবি নিয়ে সোচ্চার হওয়া। দেশের মানুষ যদি পর্দার অন্তরালে থাকা মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের জন্য সোচ্চার হয়, তাহলেই সরকার দেশের মানুষের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে মুজিব হত্যার পর্দার অন্তরালে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের ভালো মানুষের মুখোশ উন্মোচন করে বিচারের ব্যবস্থা করবে এবং বঙ্গবন্ধুও তার পরিবারের হত্যার বিচার সম্পূর্ণ হবে।

লেখক: ফনিন্দ্র সরকার- আইনজীবী ও কবি

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...