করোনা আতঙ্ক: সাম্য ও সুস্থিতি বজায় রাখা অনিবার্য

করোনা আতঙ্ক: সাম্য ও সুস্থিতি বজায় রাখা অনিবার্য - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৩ মার্চ ২০২০, ০০:২০

করোনা ভাইরাস একটি মরণঘাতি জীবাণু- যেটা কভিড-১৯ নামে রোগের জন্ম দিয়েছে। এটা মানুষের দেয়া একটি নাম। রোগটি নতুন, এর কোনো ওষুধ নেই যে জন্যে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম প্রাদুর্ভাব ঘটে। এর ব্যাপক বিস্তারে চীনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। চীনে কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব হলেও এখন সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। এ যেন প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়। ঝড় যেমন এক জায়গা থেকে উৎপত্তি হয়, সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় প্রবল বেগে আঘাত হানে। করোনা যেন সেরকমই ঘূর্ণিঝড়।

তবে চীন এখন অনেকটাই নিরাপদ। করোনা নিয়ন্ত্রণে চীনের সাফল্যের পেছনে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা ছিল নার্স, চিকিৎসকদের। তাদের মানবিক মূল্যবোধের জায়গা ছিল সুদৃঢ়। চীনে যখন মহামারী আকার ধারণ করে তখন নার্স চিকিৎসকরা যাতে ক্লান্তিহীন নিরাপদে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকতে পারেন তার জন্য ব্যবহার করেছেন বিশেষ ধরনের ডায়াপার। যাতে বাথরুমে সময় নষ্ট না হয়। অনেক নার্স তাদের শখের চুল কেটে ফেলেছেন এজন্য যে, চুলের যতে যেন সময় ব্যয় করতে গিয়ে রোগীদের সেবায় ব্যাঘাত না ঘটে। এ হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

সাম্য ও সুস্থিতি বজায় রেখে তারা মানবতার সেবায় নিয়োজিত থেকেছেন সর্বক্ষণ। সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে একটুও কার্পণ্য করেননি কেউ। তাই খুব সহজেই তারা সাফল্য পেয়েছে। বর্তমানে ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় মহাদেশেই করোনার বিস্তৃতি ঘটেছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত ১৭৬ দেশে করোনার সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বে ১৩ হাজারের ওপরে মৃত্যুবরণ করেছে করোনার আঘাতে। সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ইতালিতে। বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহনকারী ইতালি যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। করোনার ভয়ঙ্কর ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত মানব সভ্যতা। তারপরও করোনা মোকাবিলায় মানুষের চেষ্টার কমতি নেই। চীন যেহেতু পেরেছে সবাই তা পারবে। এ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই কাজ করতে হবে আমাদের।

আজ অতি দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে বাংলাদেশে করোনা ইস্যুতে নানারকম অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে একটি চক্র গোষ্ঠী, ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থোদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। করোনা একটি ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে রোগ। আমি ডাক্তার কিংবা রোগতত্ত¡ বিজ্ঞানীও নই তাই করোনা কী ধরনের ছোঁয়াচে রোগ তা বলার ক্ষমতা বা যোগ্যতা আমি রাখি না। পত্র-পত্রিকায় খবর ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামত দেখে জানতে পেরেছি, এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ। যিনি আক্রান্ত হবেন তার সংস্পর্শে অন্যজন আসামাত্রই আক্রান্ত হবেন।

পারস্পরিক সংস্পর্শের মাধ্যমেই রোগটির বিস্তার ঘটে বলে জানতে পেরেছি সেজন্যই করোনা এখন মহা আতঙ্কের অনুষজ্ঞ হয়ে উঠেছে। তবে আমার একটি নিজস্ব মতামত হচ্ছে, ছোঁয়াচে হলেই যে এটা খুবই মারাত্মক তা আমি বিশ্বাস করি না। বেশিরভাগই তো সুস্থ হয়ে ওঠে। এটাকে এড়ানো যায় যদি আমরা জীবনে সেরূপ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি। মানুষ তো মরণশীল, প্রত্যেক মানুষকে কোনো না কোনোভাবে মরতেই হবে। এটা প্রকৃতিরই নিয়ম। এ নিয়ম উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারো নেই। করোনার ভয়ে কিংবা করোনায় আতঙ্কিত হয়ে যদি সঠিকপথ থেকে সরে আসি তবে করোনা আমাদের ওপর জেঁকে বসবেই। করোনায় কাতর হয়ে সমাজে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে এ থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের মনোশক্তির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। ঠাণ্ডা, কাশি, জ্বর, মাথাব্যথা এসব স্বাভাবিক সিজনাল রোগেরও সেবা মিলছে না কেন? বাংলাদেশের অধিকাংশ চিকিৎসকই করোনায় ভীত-সন্ত্রস্ত। হাসপাতালে জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশির রোগীর কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না। চিকিৎসা ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কোনো কাঠামো নেই। যদিও বলা হচ্ছে, চিকিৎসাসেবা একেবারে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। করোনার কথা বাদ দিয়েই বলতে চাই যে, অধিকাংশ জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার আধুনিক উপকরণ নেই।

ভাঙ্গাচোরা যন্ত্রপাতি, মেশিনপত্র দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালানো হয়। অনেক হাসপাতালে ইসিজি মেশিন পর্যন্ত নেই। প্রতিবছরই এসব আধুনিক যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। গোলমেলে হিসাব দেখিয়ে সিভিল সার্জন গং সাহেবরা টাকা আত্মসাত করেন সে খবর কে না জানে? সরকারি হাসপাতালগুলোর বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ব্যক্তিগত চেম্বারে প্রাইভেট চিকিৎসায় সময় ব্যয় করেন বেশিরভাগ। এদের ভিজিট ১০০০ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আবার অনেক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেয়া হয়। সেখান থেকে তারা কমিশন পান।

রোগী যত গরিবই হোক না কেন তাদের কাছে ক্ষমা নেই। তাদের টাকা চাই, প্রচুর টাকা চাই। এসব ডাক্তারকে কোনো আয়করও দিতে হয় না। যা হোক, এসব ডাক্তার কীর্তিকলাপ নিয়ে কথা বাড়াতে চাই না। কথা হচ্ছে, সম্প্রতি করোনা ভাইরাস নিয়ে সম্ভার সৃষ্টি হচ্ছে অনেক। গবেষণাও চলছে করোনা প্রতিষেধক টিকার। শুনেছি আমেরিকা টিকা আবিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু এর বণ্টন ঘটতে সময় লাগবে প্রায় এক থেকে দের বছরের মতো আবার কেউ কেউ এটাও ভাবছে যে, এ টিকার বণ্টনে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লালসা বৃত্তিতে নজর দেয়া হয় কিনা! অশুভ ও অসম বণ্টনই বিশ্বের যত অশান্তি।

পৃথিবীতে মানুষের বুদ্ধি প্রসারিত হয়েছে সত্য কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার বিবেকবোধ জাগ্রত হয়নি তেমন। প্রিয় পাঠক মানুষের প্রতি যতটা মানুষের মমত্ববোধ তার চেয়ে অনেক বেশি মমত্ববোধ টাকা বা সম্পদের প্রতি। করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়েছে দুর্নীতিবাজ কর্তা-ব্যক্তিদের কারণে। টাকার লোভ সামলাতে না পারার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইতালি ফেরত দু-একজনের সঙ্গে আমি ফোনে কথা বলে জানতে পেরেছি যে, তারা যখন বাংলাদেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেমে দেশে আসেন, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা কোয়ারেইন্টাইনের হুমকি দিয়ে কিছু নগদ টাকা পেয়ে ছেড়ে দেন। এ রকম অসংখ্য প্রবাসীকে তারা টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন।

 প্রথম যখন করোনা ভাইরাস আমাদের দেশে ধরা পড়ে ইতালিফেরত প্রবাসীদের দেহেই ধরা পড়ে। এখন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মানুষ ভয়ে আতঙ্কিত। সরকারি তরফ থেকে হোম কোয়ারেইন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দেয়া হলেও তা কি পালন করা হচ্ছে? পালন করা সম্ভবও নয়। কেননা যিনি হোম কোয়ারেইন্টাইনে থাকবেন তার আলাদা রুম, আলাদা বাথরুম, তাকে সেবা দানের বিশেষ ব্যবস্থা পরিবারের পক্ষ থেকে করতে হবে কিন্তু আদৌ কি সেটা সম্ভব?

কোনো কোনো পরিবারের ভাড়াবাড়িতে রুম মাত্র ২টা, বাথরুম ১টা, স্বল্প পরিসরে কীভাবে কোয়ারেইন্টাইনের ব্যবস্থা হবে? গ্রামের বাড়িতেও সম্ভব নয়। সুতরাং রাষ্ট্রীয়ভাবেই কোয়ারেইন্টাইন করা উচিত ছিল প্রথম থেকেই। তা যখন করা হয়নি। এখন এগুলো বলে কোনো লাভ নেই। বর্তমানে মহামারী মোকাবিলায় সাম্য ও সুস্থিতি বজায় রেখে নয়া পদ্ধতিতে কর্মবিধি প্রণয়ন করতে হবে।

সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের বিস্তারে একটি নবতর দুর্যোগকাল অতিক্রম করছে মানবজাতি। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য বিশেষ কিছু মনোভাবের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে। প্রথম যে অবস্থাটির কথা ভাবতে হবে তা একাকিত্ব।

একাকিত্বকে ইন্দি য়-পরিতৃপ্তির আংশিক পরিহার বলে ভাবা যেতে পারে। তার পক্ষে আরো বেশি সম্ভব তার অন্তর সত্তার প্রতি কান পাতা, আন্তর সম্পদের সংস্পর্শে আসা এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলোর কিছু কিছু বহিঃপ্রকাশ সম্পর্কে অবহিত হওয়া। আমাদের দুর্ভাগ্যের বিষয় যে বয়ঃসন্ধিতে আগত ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাগুলোতে একাকিত্বের সমর্থনে কিছু বলা হয়নি। বিপরীত পক্ষে, দলবদ্ধভাবে চলার প্রবণতা এবং জনপ্রিয়তাকে উচ্চমূল্য দেয়া হয়েছে। একাকিত্বকে পীড়নমূলক নিঃসঙ্গতা অথবা প্রত্যাহরণ কিংবা নিরন্তর নির্জনবাসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না।

 সাম্প্রতিক এ ভয়াবহতার প্রেক্ষিতেই এ পথ অবলম্বন করতে হবে। যুগে যুগে এমন কিছু সময় আসে বা ভবিষ্যতেও আসবে যার জন্য পূর্ব প্রস্তুতিমূলক এই একাকিত্বকে চিকিৎসা ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করতে হবে। এতে আধ্যাত্মিক ভাবোদয়ের সুযোগ তৈরি হবে যা কিনা হƒদয়মনের প্রসন্নতায় ভয়ঙ্কর ব্যাধি কোনোরূপ ওষুধ পান ছাড়াই পলায়নপর হবে। এ শিক্ষাটা আমাদের নেয়া উচিত।

এ সমস্ত করোনার মতো ভয়ঙ্কর ব্যাধি মোকাবিলায় মানুষকে আর একটি অনন্য গুণের অধিকারী হতে হবে। এটি হচ্ছে সজাগ থাকা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধতা। যে কোনো প্রকার ব্যাধি মোকাবিলার ক্ষেত্রে এগুলো প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত হলেও হƒদয়শীলতায়ও বিশেষ মাত্রা লাভ করে। কোনো রোগীকে ভয় নয়, যতই ছোঁয়াচে হোক রোগটিকে প্রতিহত করতে হবে মনোশক্তি দিয়ে। এর প্রতিষেধক বের হয়নি তাতে কী হয়েছে? মানবীয় প্রজ্ঞায় রোগ পরাজিত হবেই। মনের দৃঢ় বিশ্বাসই এ ভাইরাসের প্রধান প্রতিষেধক। সাম্য ও সুস্থিতি এনে দেবে সাফল্য।

লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...