সাগর-রুনির মেঘ এখনো আকাশে ভেসে বেড়ায়

স্বপ্না রেজা
স্বপ্না রেজা - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:৪৮,  আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:৫৫

সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড থমকে দিয়েছিল প্রায় সবাইকে। শিশু সন্তানের সামনে এমন পাশবিকভাবে বাবা-মাকে হত্যা করে ফেলা সহজ ও স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড নয়। হত্যাকারীরা শুধু সাগর-রুনিকেই হত্যা করেনি, হত্যা করেছে একজন শিশুর নিষ্পাপ জগতটাকে। মেঘ দেখেছে সভ্যতার আড়ালে অসভ্য ও পাশবিক হত্যাকাণ্ড। যেমনটি ঘটেছে ১৯৭১ সালে পাকি বর্বরদের দ্বারা। তখন তো অনেক শিশুকে পাকি বর্বর কর্তৃক বাবা-মাকে হত্যার এমন নৃশংসতাই প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল।

দেশ স্বাধীন হবার সাঁইত্রিশ বছর পর সেই সকল শিশুর কাতারে মেঘের জায়গা হয়েছে। আমি এগারো বছর আগের কথা বলছি। সত্য যে, একটা স্বাধীন দেশে মেঘ নির্মমভাবে তার বাবা-মায়ের হত্যাকাণ্ড দেখেছে, তাকে দেখতে হয়েছে। নিঃসন্দেহে জগতের সবচাইতে করুন অভিজ্ঞতা মেঘের। মেঘের ভেতরকার কষ্ট আর কার। কে জানবে তার ভেতরকার হাহাকার। পরম নির্ভরতার আশ্রয়কে মেঘ নৃশংসভাবে শেষ হতে দেখেছে। কেন দেখতে হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবার দায়ভারইবা কার, উত্তর মেলেনি।

অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনা ঘটে জগতে। যার কিছু থাকে মানুষের কল্পনাতীত। প্রকৃতি তেমন ঘটনা ঘটালে মানুষ হার মেনে নেয়। ভেবে নেয়, এটা নিয়তি। কিছু করার ছিল না। প্রকৃতি তার নিয়মে চলে, চলবেই। যা নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে। ক্ষমতার বাইরে। এখানে মানুষের হাত নেই ইত্যাদি ইত্যাদি ভেবে মানুষ আশ্বস্ত হয়। হতে চেষ্টা করে।

এসব ভাবে নিছক স্বস্তি পাবার জন্য। প্রকৃতির সাথে অভ্যস্থ হবার এ এক আয়োজন। এতে অনেকটা নিজেকে লুকিয়ে ফেলে মানুষ। কিন্তু আবার মানুষ কোনো অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটালে অন্য মানুষ ভেবে নেয়, কঠিন ষড়যন্ত্র অপরের বা প্রতিপক্ষের এবং তা ভয়ঙ্কর কিছুতে আবৃত। যেটা রয়ে যায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বাইরে, কল্পনাতীত। সাধারণ মানুষ সরল অঙ্কের মতো চলে, চলতে অভ্যস্থ হয়। জগতে বিশ্বাস আর আস্থা নামক দুটো বিষয় থাকতে হয় মানবসভ্যতা, মানব সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে। এসব মানুষই তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সৃষ্টি করেছে আচরণের মধ্য দিয়ে।

যখন কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী দ্বারা এই আস্থা বা বিশ্বাস নষ্ট হবার উপক্রম হয় কোনো সংঘটিত ঘটনার কারণে, তখন বেশিরভাগ মানুষ অবিশ্বাস্যের স্রোতে ভেসে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে একসময়ে। সংশয়ের ঘোরে আস্থা হারায়। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘতর তদন্ত প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাকে কল্পনার বাইরে ঠেলে দিয়েছে।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আট বছর পূর্ণ হলো ১১ ফেব্রুয়ারি। বিচার প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ৮ বছর বললে কতটা ভুল বা নির্ভুল বলা হবে জানি না। আদতে এটা ব্যর্থতা নাকি অন্যকিছু, এমন সংশয় কিন্তু ডালপালা মেলে অবস্থান করছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে। প্রচণ্ড উত্তাপ ছিল তার ঘোষণায়। সেই ৪৮ ঘণ্টা এখন ৭০,০৮০ ঘণ্টায় ঠেকেছে।

তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। মুখ থুবড়ে আছে কোনো এক অজানা প্রান্তরে। এদিকে সাহারা খাতুনের কণ্ঠ উত্তাপ নিভে গেছে। তার সেই মন্ত্রিত্ব নেই। কতদিন আর থাকে। কেউ কেউ মনে করেন, সাগর-রুনি ক্ষমতাসীন দলের কেউ হলে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে সাহারা খাতুনের কণ্ঠ উত্তাপ নিভে যেত। ব্যাপার এখানে তা নয়। তার কণ্ঠের উত্তাপ নিভে গেছে অজানা রহস্যে, যা কেবল হয়তো তিনিই জানেন। কিংবা আদতে জানেন না।

জনমনে কিন্তু এ রহস্য দিনদিন ঘনীভ‚ত হয়ে দলা পাকিয়েছে। এক পর্যায়ে গোয়েন্দা পুলিশ দলা পাকানো রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হলে র‌্যাব দায়িত্ব পেয়েছে। এখনো অব্দি রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। বরং ৭১ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়। কেন এমন দীর্ঘসূত্রতা তদন্ত প্রক্রিয়ায়? রহস্য কি তাহলে এমন জটিল কিছু, যা উদ্ঘাটন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে গোয়েন্দা সংস্থার, নাকি অন্য দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে ঘটনাটি? প্রশ্ন জেগেছে জনমনে। প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক। এই জেগে ওঠা প্রশ্ন বিচার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা হারাতে সহায়ক হয়। দেশ আর সমাজকে অপরাধমুক্ত ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি।

সম্প্রতি মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত হত্যার বিচার খুব দ্রুত হতে দেখেছি। বর্বরোচিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত হবার পেছনে মাননীয় সরকার প্রধানের কঠোর নির্দেশ ছিল। সেইসাথে দেশের আনাচেকানাচে সবখানে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জোর আওয়াজ ছিল, প্রতিবাদ ছিল। আমরা দেখি প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে জোর আওয়াজ ওঠে। কিন্তু বিচার হয় না।

যাইহোক নুসরাত হত্যার তদন্ত দ্রুত করে রায় হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে সম্ভবত মাননীয় আইনমন্ত্রী স্বস্তি প্রকাশ করে অনেকটা এমন বলেছিলেন যে, নুসরাত হত্যার দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া ও রায়টা বিচারহীনতার সংস্কৃতির অপবাদ থেকে বেরিয়ে আসার মতো। বিচারহীনতার সংস্কৃতি মন্ত্রী নিজেই উপলব্ধি করেছেন বিধায় তাকে সাধুবাদ। মন্ত্রীর সাথে আমরা সাধারণ মানুষও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। কারণ, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো এই ভেবে। অন্তত একটা হত্যাকাণ্ডের বিচার তো হলো।

কিন্তু আদতে কী বিচারহীনতার সংস্কৃতির থেকে বেরিয়ে আসা হলো। মোটেও নয়। অনেক হত্যার বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে আছে তদন্তের অজুহাতে। কেন ঝুলে থাকছে, থাকে, কেন হত্যার কারণকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়, কারা করে এসব, তা দেখছে কে বা কারা, জানে কেউ ? জানলে নিশ্চিত বিচারহীনতার সংস্কৃতির চর্চা থাকত না।

সামাজিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনের চাইতেও শক্তিশালী। সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন আপামর জনসাধারণ। আর রাজনৈতিক আন্দোলন চলে রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী আর সমর্থক দ্বারা। জনগণের আস্থা হারালে রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের ক্ষমতা আরো ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে আসে। দলের অস্তিত্ব সঙ্কট দেখা দেয়।

অতীতের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সমর্থ হয়েছিল। বর্তমান বিএনপির অবস্থা আরো একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাগর-রুনির নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সাংবাদিক মহল পারতেন তেমন একটা সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে, যাতে কিনা হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটনের সম্ভাবনা থাকত। শুরুতে অনেক সাংবাদিককে সোচ্চার হতে দেখা গেলেও পরে আর দেখা যায়নি। সেটা নিয়েও অনেক ধরনের গল্প বাজারে রয়েছে।

প্রতিবছর একটি সময়ে আবার অনেক সাংবাদিক স্মরণসভা করেন, হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। কিন্তু সেটাও যেন মৌসুমি বায়ুর মতো গল্প হয়ে দাঁড়ায়। রীতিমতো পোশাকি লাগে। সাংবাদিক মহলের বিভাজন, অনৈক্য, ব্যক্তি-গোষ্ঠী স্বার্থপরতা ইত্যাদি কারণ সাগর-রুনির হত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে শিথিল করেছে, দীর্ঘতর করেছে। জনগণের এমন ধারণা অযৌক্তিক নয় মোটেও। একটি দেশে ক্ষমতাধর শ্রেণি হলো সাংবাদিক গোষ্ঠী। সাংবাদিকের কলম বেশি শক্তিশালী অতীতের মতো তা বর্তমানেও প্রমাণিত।

অনেক ইস্যু নিয়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী দৃষ্টি কাজ করে আমরা দেখি। অনেক রহস্য উদ্ঘাটন হয় সাংবাদিকের তৎপরতায়। দেখেছি কোনো কোনো সাংবাদিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখেন, রাখছেনও। কিন্তু কেন নয় এমন তৎপরতা সাগর-রুনির হত্যার বিরুদ্ধে? সাংবাদিক মহল তো পারতেন কলম বর্জন করতে। নাকি তারা এই জোড়া হত্যাকাণ্ডকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন? এটা তো ঠিক যে, আজ যদি সাগর-রুনির হত্যার বিচারের দাবিতে তারা সোচ্চার, অনড় অবস্থান নিতেন, তাহলে সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাও কমত।

সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার একটা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া জরুরি। আইন ও বিচার প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি আস্থার জন্য এই স্বচ্ছতা জরুরি। বিচার প্রক্রিয়া ও আইনের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ও নির্ভরতা সৃষ্টি না হলে হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ বাড়বে। অপরাধপ্রবণ ব্যক্তির সংখ্যা বাড়বে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের নিরাপত্তা বিষয়ক সেক্টরগুলোকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য সরকারকেই কঠোর নজরদারি করতে হবে। ‘গুজব’ কিন্তু কোনো কিছুর অস্পষ্টতা ও অনিয়ন্ত্রণ অবস্থা থেকে উদ্ভুত এক অবস্থা। যার জন্য সংশ্লিষ্টরা দায়ী থাকেন। সাগর-রুনির হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা এবং অস্পষ্টতা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সম্পর্কে ‘গুজব’ সৃষ্টি হতে পারে। যা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে।

অবিশ্বাস জাগাতে পারে। জনগণের কাছে পুরো বিষয়টি গ্রহণযোগ্যতা নাও পেতে পারে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভেবে দেখা দরকার। পরিশেষে দাবি, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই জঘন্যতম অপরাধ। এই বোধ আইন ও বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্টদের ভেতর জাগ্রত করতে না পারলে প্রকৃতপক্ষে জনগণ নিরাপদবোধ করবে না। আইনের শাসন নিছক প্রহসন হয়ে থাকবে। মেঘ দেখুক, জানুক তার বাবা-মায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। গোটা জাতি তার পাশে আছে। পাশে আছে সরকার।

- লেখক : স্বপ্না রেজা- কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক




Loading...
ads






Loading...