হর্নের উচ্চমাত্রার শব্দে পথচলা দায়

মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৪৬

সেদিন এক পথচারীকে দেখলাম, গাড়ির প্রচণ্ড হর্নের শব্দে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সড়কের পাশেই বসে যেতে। এভাবে কত মানুষ যে গাড়ির হর্নের শব্দে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কেউ জানে না। অনিয়ন্ত্রিত, তীব্র হর্নের শব্দে প্রতিদিন সড়কগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে। এ থেকে মুক্তির যেন কোনো পথ নেই। মানতেই হবে, দেশে যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর অবশ্য যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

বাড়ছে মানুষ, তাদের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে যানবাহন। যে কারণে প্রতিদিন সড়ক, মহাসড়কে ঢুকছে অসংখ্য নতুন নতুন যানবাহন। কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে হর্নের মাত্রাও। হর্নের উচ্চমাত্রার শব্দে পথচলা এখন দায়। জরিমানার বিধান থাকলেও হাইড্রোলিক হর্নের শব্দের দূষণ বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যে হাইকোর্ট গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তার পরও অপতৎপরতা কমেনি।

আকস্মিক হর্নের শব্দ একজন মানুষকে বধির কিংবা বেহুঁশ করে দিতে পারে। তাছাড়া পুলিশের কাছে শব্দ পরিমাপের আধুনিক কোনো যন্ত্র না থাকায় তারাও বুঝতে পারেন না কোন গাড়ি অতিরিক্ত মাত্রার ভেঁপু বাজাচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দ দূষণ যে কোনো মানুষের জন্য ক্ষতিকর হলেও এতে শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও ট্রাফিক পুলিশ, রিকশা বা গাড়িচালক, রাস্তার নিকটস্থ শ্রমিক বা বসবাসকারী মানুষ অধিকহারে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। মানুষের শ্রবণসীমার স্বাভাবিক মাত্রা ৪৫ ডেসিবল। এ থেকে বেশি হলে শব্দ দূষণে পরিণত হয়, যা মানুষের শরীরে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে।

শব্দ দূষণের ফলে মানুষের শ্রবণ ক্লান্তি এবং সর্বশেষ বধিরতা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া যে সব রোগ হতে পারে তার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, কণ্ঠনালির প্রদাহ, আলসার, মস্তিষ্কের রোগ, কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস, বদমেজাজ বা খিটখিটে মেজাজ, ক্রোধ প্রবণতা, স্নায়বিক দুর্বলতা, রক্তনালির সংকোচন এবং হার্টের সমস্যা অন্যতম। রাস্তায় হর্নের আওয়াজে মনে হয় গাড়ি চালকরা হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। বিনা প্রয়োজনে হরহামেশাই হর্ন বাজানো হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বা সংরক্ষিত এলাকা যেমন মসজিদ, মন্দির, হাসপাতালের পাশের রাস্তাগুলোতেও হর্ন বন্ধ করে না চালকরা। অথচ হর্নের বিকট আওয়াজে যে কারোরই ক্ষতি হতে পারে।

গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানার সময় নেই চালকদের। ভুক্তভোগীদের মতে, শব্দ দূষণের ফলে তারা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন প্রতিদিন। হঠাৎ করে হর্ন বাজানোর ফলে অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। শব্দ দূষণ সমস্যার নামমাত্র জরিমানা থাকলেও তাও মানা হচ্ছে না। যে কারণে শব্দ দূষণকারীরা আরো উৎসাহ পাচ্ছে। শব্দ দূষণ তথা গাড়ির হর্নের আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। পাশাপাশি কঠোর আইন ও জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে।

চালকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বহির্বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে হর্ন বাজানোর ব্যাপারে কঠোরতা রয়েছে। সেখানে হর্নের যন্ত্রণা নেই। আমাদের দেশে হর্ন বাজানো আইনত যেখানে নিষেধ সেখানে আমরা দেখতে পাই গাড়ি সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকলে বা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক চালক অহেতুক হর্ন বাজাচ্ছেন। এতে রাস্তায় সুস্থভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। এই সমস্যা থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ট্রাফিক পুলিশদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে এবং গাড়ির হর্ন নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পরিবেশ অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত অভিযানকে গতিশীল করতে হবে। মূলত সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে গাড়ির হর্ন নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ বিভিন্ন জরুরি স্থানে হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করতে হবে।

গাড়ি চালকদের মাঝে শব্দ দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। জনগণের মাঝেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। সবাই যদি সচেতন হয় তাহলে শব্দ দূষণ তথা গাড়ির হর্ন নিয়ন্ত্রণ কঠিন কিছু হবে না। সরকারের নজরদারি ও আমাদের সবার সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

লেখক : কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম- শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।





ads







Loading...