প্রাথমিকে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন

দৈনিক মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:৪৩,  আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:২৭

মানবিক গুণসমৃদ্ধ যা কিছু অর্জন তাই শিক্ষা। আর প্রাথমিক পর্যায়ে বা জীবনের শুরুতে যে শিক্ষা অর্জন করে তাই প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক পর্যায়ে বা জীবনের শুরুতে যে বিদ্যালয়ে বা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষা অর্জন করে তাই প্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা। একটা সময় ছিল এই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পাড়ি দিতে হতো দীর্ঘপথ। তৎকালীন সময়ে যে কারণে শিক্ষার হার ছিল নগণ্য।

 বিদ্যালয়গামী ছাত্র-ছাত্রী ছিল সংখ্যায় কম। শিক্ষক ছিল অপ্রতুল। বই কিনতে হতো অর্থ দিয়ে লাইব্রেরি থেকে। ফলে দারিদ্র্যের কারণে ঝরে পরত অনেক শিক্ষার্থী। পড়ালেখার প্রতি মানুষের আগ্রহও ছিল কম। বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে। রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষক রয়েছে পর্যাপ্ত সংখ্যক। বই দেয়া হচ্ছে সরকার থেকে বিনামূল্যে। যার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে এখন বিদ্যালয়মুখী। তাছাড়া পড়ালেখার ব্যাপারে এখন অনেক পরিবারই সচেতন। সন্তানের পড়ালেখা করাতে অনেক পরিবারই দরিদ্রতাকে জয় করছে।

অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের প্রাথমিক থেকেই গুরুত্বসহকারে তৈরি করছে। আমাদের সময় যে যতটার অভাব ছিল বর্তমান সময়ে সেই যতটা প্রাক-প্রাথমিক থেকেই পাচ্ছে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। আর কেনই বা করবে না, একটি বাড়ির ভিত্তি যদি মজবুত না থাকে তাহলে সেই বাড়ি কিন্তু বেশিদূর পর্যন্ত উঁচু করা যাবে না। ঠিক তেমনি একটি সন্তানকে যদি শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই যত না করা যায় তাহলে রতো হবে না। যেমন আপনি যদি শুরু থেকেই আপনার সন্তানের হাতের লেখা সুন্দর করতে জোর না দেন তাহলে পরবর্তীতে তার লেখার কাঠামো পরিবর্তন করাতে সম্ভব হবে না।

 আবার শিশুবেলা থেকেই যদি একজন শিক্ষার্থীকে বই রিডিং পড়ার ওপর জোর না দেয়া যায় তাহলে সে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণসহকারে পড়তে পারে না। তাই প্রাথমিক শিক্ষাই শিক্ষার মূলভিত্তি। এই সময়ে অভিভাবকদের উচিত মানসম্মতভাবে গড়ে তোলা এবং গড়ে তুলতে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেছে নেয়া ও সন্তানের যত্ন নেয়া। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারপরও কিছু অসচেতন অভিভাবক আছে যারা সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে চান না বা শিক্ষার মর্মটা উপলব্ধি করেন না।

 পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ বছরের প্রথম দিনে দেশের ৪ কোটি ২০ লাখেরও বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে ৩৫,৩১,৪৪,৫৫৪টি বই বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ কোটি ৫৪ লাখ ২ হাজার ৩৭৫টি বই বিনা মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে, যা প্রাথমিক  শিক্ষার ক্ষেত্রে মাইলফলক।

২০১০ সাল থেকে বর্তমান সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করছে। এছাড়াও চালু রয়েছে বৃত্তিমূলক ব্যবস্থা। সরকারি শিক্ষকদের বেতন হয়েছে দ্বিগুণ। তবুও সবকিছুর মাঝেও দেখা যায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কিছু ঘাটতি রয়েছে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের উন্নতি করাতে শিক্ষকরা হিমশিম খাচ্ছে। আবার মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও মানসম্মত উন্নতি করাতে পারছে না। আর কেজি স্কুলগুলো সেই সুযোগটা লুফে নিচ্ছে। তবে পূর্বের প্রাথমিকের কিছু চিত্র বর্তমানে অনেকাংশে কমেছে। পূর্বে যেমন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাস হতো না। বর্তমানে তা বহুলাংশে কমেছে।

এখন যে বিষয়গুলো ঘাটতি বলে মনে হয় তা হলো (১) এক ক্লাসে অধিক ছাত্র-ছাত্রী  (২) শিক্ষার্থী অনুপাতে ক্লাসের সময়সীমা স্বল্প (৩) শিক্ষকদের যোগ্যতা (৪) পাঠ্যপুস্তক ও প্রশ্নকাঠামো। সরকার বই প্রদানসহ বিভিন্ন সুযোগ দিলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে একটি ক্লাসে ছাত্রছাত্রী রয়েছে অধিক পরিমাণে। যার ফলে শিক্ষকরা যথাযথ ক্লাস নিতে পারছে না।

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ৮৬ জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। এর বিপরীতে ক্লাসের সময় ৫৫ মিনিট। একটি শিক্ষার্থীকে ১ মিনিট করে যদি পড়া ধরা হয় সেখানে সময় লাগবে ৮৬ মিনিট। এর সাথে শিক্ষককে পড়াটা বোঝানোর একটা ব্যাপার থাকে। লেখানো ও লেখা দেখার একটি বিষয় থাকে। কারণ অনেক অভিভাবকই বাড়িতে গেলে শ্রেণির কাজ দেখতে চান।

আসলে কিভাবে শিক্ষকরা পড়াটাকে বুঝিয়ে যাচাই-বাছাই করবে বা লেখাবে? অভিভাবকদের আবেদন কিন্তু থাকে যে শিক্ষক প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন আদায় করে নিবেন। যদি শ্রেণিকে স্বল্প শিক্ষার্থী দিয়ে ভাগ করা যায় অথবা ক্লাসের সময় বাড়ানো যায় তবেই পড়াটা বা ক্লাসটা আরো কার্যকর হতো।

স্বল্প সময়ে শিক্ষকরা বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে না বলে বাধ্য হচ্ছেন প্রাইভেট পড়াতে। আর অভিভাবকরাও বাধ্য হচ্ছেন প্রাইভেটে দিতে। বর্তমানে প ম শ্রেণির যে সিলেবাস বা প্রশ্নকাঠামো তাতে একটি দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক প্রয়োজন। বিভিন্ন শিক্ষকদের মন্তব্য থেকে জানা যাই যে, পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি বিষয়টি তুলনামূলক জেএসসি থেকে কঠিন। কিন্তু সেখানে অনেক শিক্ষিকা রয়েছে যারা এসএসসি পাস। ফলে তাদের যোগ্যতার অনেক ঘাটতি রয়েছে।  

একসময় সৃজনশীল ছিল না বা পড়ালেখার কারিকুলাম এমন ছিল তা সেই সময়ের জন্য তারা উপযুক্ত ছিল। ইংরেজি ও গণিতে ভালো করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নেয়া প্রয়োজন। তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বা প্রশ্নকাঠামোর দিকে তাকালে লক্ষ্য করা যায় সেখানে কিছু অংশ পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূর্ত। যদি বাংলার বিষয়ে বলি সেখানে রয়েছে বিরামচিহ্ন। অথচ বিরামচিহ্নের যে নিয়মটা রয়েছে কোথায় কি থাকলে কোন চিহ্ন হয় তা পাঠ্যপুস্তকে নাই।

ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করছে। ইংরেজির প্রায় অর্ধেকের বেশি অংশ থাকে পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো গ্রামার নাই অথচ পরীক্ষাতে আসছে ডব্লিউ এইচ কশচিন। এটা করতে গেলে সাবজেক্ট, নম্বর, ভার্ব, টেন্স জানা দরকার। এগুলো না পড়িয়ে রিয়ারেঞ্জ বা ডব্লিউ এইচ কশচিন করালে ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’ দেবার মতো পরিস্থিতি করা হয়। তাছাড়া যেখানে টেন্স শেখানো হচ্ছে না সেখানে আনসিন প্যাসেজ দিলে কিভাবে লেখা সম্ভব? ধাপে ধাপে না শেখালে ভিত্তি কিভাবে মজবুত হবে?

সে ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণি থেকে কিছু কিছু গ্রামার যোগ করা দরকার। তাছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হিমশিম খেতে হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, প্রাথমিক বিজ্ঞান ও ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্ন আসে কিন্তু কোনো অধ্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্নের নমুনা নেয়। পূর্বে কেমন প্রশ্ন হবে তার নমুনা দেওয়া হতো এখন কেন নেই? তাতে কি গাইড বিক্রেতাকে সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে না? নমুনা দিলে কি খুব ক্ষতি হতো? জাতীয় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন কমিটি অতি দক্ষ ও মেধাবী তবুও রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে এই বিষয়গুলো আমার কাছে পরিবর্তন বা সংযোজন প্রয়োজন বলে মনে হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে এবং যে সৃজনশীলতা নিয়ে জাতি গঠনে এগিয়ে চলছে তাতে পাঠ্যপুস্তক সংশ্লিষ্ট প্রশ্নকাঠামো করলে উদ্দেশ্য বেগবান হবে। ফলাফল আরও সুন্দর হবে সর্বোপরি সৃজনশীলতা এগিয়ে যাবে।

- লেখক : সাংবাদিক

 

মানবকণ্ঠ/এমএইচ






ads