12 12 12 12
দিন ঘন্টা  মিনিট  সেকেন্ড 

ভালোবাসা দিবসে বাসন্তী ছোঁয়া

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ - সংগৃহীত

poisha bazar

  • ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:৩০,  আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:১৮

পহেলা ফাল্গন আর ভালোবাসা দিবস। দুটি দিনই আমাদের অনেক কাঙ্খিত। এখন তো এক প্রকার উৎসবে রূপ নিয়েছে। আর দুটি দিনই আসে প্রায় একই সঙ্গে। এবার পহেলা ফাল্গন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এসেছে একইদিনে। ষড় ঋতুর পরিক্রমায় প্রকৃতিতে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। সেই ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন আজ।

পাতার আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকা বসন্তের দূত কোকিলের মধুর কুহুকুহু ডাক। প্রকৃতির সবুজ অঙ্গন ছেয়ে যাবে রঙিন ফুলে ফুলে। মাঘের শেষ দিক থেকেই গাছে গাছে ফুটছে আমের মুকুল। বসন্তের অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠেছে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম। বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যি সত্যি সে ঋতুর রাজা। মন তাই গেয়ে উঠবে ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে/ ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে...’।

বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি অনাদিকাল থেকেই। কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায় আছে বসন্তের বন্দনা। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে তার আপন মহিমায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিককালের বাউল কবির মনকেও বারবার দুলিয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না। আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তরঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপরও রং ছড়ায়। ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গন ঘটেছিল মহান ভাষা আন্দোলন।

যা আজ বিশ্বব্যাপী ২১ ফেব্র্রুয়ারির মোড়কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর কাহিনীকে উপজীব্য করে জহির রায়হান রচনা করেছেন উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গন’। বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে আমরা পালন করি ‘পহেলা ফাল্গন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। এ উৎসব এখন পরিণত হয়েছে বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের উৎসবে। বসন্তের প্রথম মুহূর্তকে ধরে রাখতে তাই তো সবাই মেতে ওঠে নানা উৎসব ও সাজে।

বাসন্তি রঙের শাড়িতে বাঙালি নারীকে অপরূপ দেখায়। এতে পিছিয়ে নেই পুরুষরাও। বসন্ত অনেক ফুলের বাহারে সজ্জিত হলেও গাঁদা ফুলের রঙকেই এদিনে তাদের পোশাকে ধারণ করে তরুণ-তরুণীরা। খোঁপায় শোভা পায় গাঁদা ফুলের মালা। বসন্তের আনন্দযজ্ঞ থেকে বাদ যায় না গ্রাম্যজীবনও। আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে গ্রামে বসন্তের আমেজ একটু বেশিই ধরা পড়ে। বসন্তকে তারা বরণ করে আরও নিবিড়ভাবে।

বাংলায় বসন্ত উৎসব এখন প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে। মুঘল সম্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব। তখন অবশ্য ঋতুর নাম এবং উৎসবের ধরনটা এখনকার মতো ছিল না।

তবুও অন্য ঋতুর চেয়ে এই ঋতুকে পালন করা হতো আলাদাভাবে। তাই পহেলা ফাল্গন বা বসন্ত উৎসব কেবল উৎসবে মেতে ওঠার সময় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্য, বাঙালিসত্তা। সে ঐতিহ্যের ইতিহাসকে ধরে রাখতে পারলেই বসন্ত উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে পারবে বাঙালি চেতনাকে।

বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে। এছাড়া তরুণ-তরুণীরা বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শাহবাগ, চারুকলা চত্বর, পাবলিক লাইব্রেরি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ধানমণ্ডি লেক, বলধা গার্ডেন মাতিয়ে রাখবে সারাদিন। ফোন, ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে বসন্তের শুভেচ্ছা বিনিময়। দিনভর চলে বসন্ত বন্দনায়।

‘বসন্ত উৎসব’ সম্পর্কে ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা জানান, ভারতবর্ষে বসন্তোৎসবের ইতিহাস বেশ পুরনো। হিন্দুদের পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলোতেও এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দু বৈষ্ণবরা এ উৎসব বেশ আয়োজন করে পালন করে থাকেন। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে।

ষড়ঋতুর শেষ ঋতু বসন্ত। আর শীতের তীব্রতার পর বসন্ত যেন স্বস্তি নিয়ে আসে এদেশের মানুষের জীবনে। সহজ কথায় বসন্ত হচ্ছে রঙের ঋতু। তাই এই ঋতুর প্রথম দিনটি পালনও করা হয় দারুণ আনন্দের সঙ্গে। ফাল্গন মানেই এক সময় চোখে ভাসতো বাসন্তী শাড়ি। সেই ধারণাতেও এসেছে ভিন্নতা। এখন তরুণীরা ফাল্গনের রং হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হালকা হলুদ, কমলা, সবুজ, লাল ইত্যাদি। বসন্ত পালনে পিছিয়ে নেই ছেলেরাও। পাঞ্জাবী পরে তারাও উদযাপন করছে বসন্ত।

প্রিয়জনের মন রাঙাতে ফুলের কী কোন বিকল্প আছে? বিকল্প নেই বলেই হয়তো পহেলা ফাল্গন ও ভ্যালেন্টাইনস ডে’কে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করেন দেশের বৃহত্তম ফুল উৎপাদনকারী জেলা যশোরের গদখালীর ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীরা। পহেলা ফাল্গন উপলক্ষে শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় পার করেন যশোরের গদখালীর ফুলচাষীরা।

এরই মধ্যে উৎপাদিত ফুলের একটি বড় অংশ পৌঁছে গেছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। গোলাপ, রজনীগন্ধা, জারবোরা, গাঁদা,  কেলেনডোলা, জারবেরা, চন্দ্র মল্লিকাসহ ১১ ধরনের ফুলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। সারা বছর ফুল সরবরাহ করা হলেও মূলত এ দুটি দিনকে ঘিরে ফুল বিক্রি করে বেচা কেনার হিসেব মেলান তারা। এই দুটি উপলক্ষকে ঘিরে প্রতি বছর প্রায় ১২ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। যশোরের উৎপাদিত ফুল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় বিপাকে পড়তে হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

বসন্ত ঋতু লুকিয়ে আছে ফাল্গন ও চৈত্র মাসের ভেতর। তবে অনুভবের জায়গা থেকে বলতে গেলে শুধু ফাল্গন মাসের কথাই বলতে হবে। বাংলা বছর গণনায় ফাল্গন ১১তম মাস হলেও কালের আবর্তনে এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এটি শুধু একটি মাসের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চীনেও বসন্ত বরণ হয়ে থাকে। এই বসন্ত বরণ উৎসব হলো তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। তারা চন্দ্রপুঞ্জিকা অনুযায়ী এ উৎসব করে থাকে। তারা সিন চুন খোয়াইলা বলে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকে। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় আপনাকে বসন্তের শুভেচ্ছা।

সারা পৃথিবীর ঋতু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এই বসন্ত ঋতু তথা ফাল্গন মাসে দক্ষিণ এশীয় নাতিশীতোষ্ণ অ লের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানেই এ সময়টি আশীর্বাদ রূপে আসে। এ সময়টা বিশ্বের বিভিন্ন আমলে মৃদু মানের বর্ষা হয় যার ফলে সেসব স্থানে বৃক্ষরা পত্রপল্লবে নিজেদের জানান দেয়। অন্যদিকে হীমাচল প্রদেশসহ কাস্মীর আমলের তুষারপাত ক্রমে কমে আসে এবং মানুষ তাদের স্বাভাবিক কাজকর্মের ভরসা পেতে থাকে।

পৃথিবী সূর্যের দিকে ঢলে পড়ে বলেই শীত তার ইতিটানতে বাধ্য হয়। এই সময়টাতে প্রাণিকুলের প্রজননের মোক্ষম সময়। পৃথিবীজুড়ে নতুন নতুন প্রাণের সংসার হতে থাকে। তারা প্রকৃতির শ্রী বৃদ্ধির পাশাপাশি টিকিয়ে রাখে পরিবেশ ও প্রতিবেশ। আমরা ফাল্গন মাসকে আদর করে ফাগুনও ডেকে থাকি। কোন মাসের নামে পিতা-মাতা সন্তানের নাম না রাখলেও এ মাসটির নামে মেয়েদের নাম রাখেন ‘ফাল্গনী’। এ ক্ষেত্রে আমরা ফাল্গনী মুখোপাধ্যায়ের নামটি উদাহরণ হিসেবে টানতে পারি।

এই ফাল্গন মাসকে নিয়ে আমাদের লোক গানের পাশাপাশি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রয়েছে নানা রচনা। যেমন বাউল সুরে গাওয়া হয় নারী হয় লজ্জাতে লাল, ফাল্গনে লাল শিমুল বন, এ কোন রঙে রঙিন হলো বাউল মন..মন রে....এ কোন রঙে রঙিন হলো বাউল মন। নারী লজ্জাতে লাল হয় না পুরুষ লজ্জাতে লাল হয় তা বিতর্কের বিষয়। তবে ফাগুনের মাসে শিমুলের বন যে লাল হয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমান কালের অন্যতম কবি খালেদ হোসাইন লিখেছেন এভাবে... তুমি ভালো থাকো আর না-থাকো/ফাল্গন আসবেই এ দেশে।/ ফুল যদি ঝরে যায়, নদী যদি মরে যায়/ ফাল্গন আসবেই এ দেশে।

আজ পহেলা ফাল্গন’ ১৪২৬, আজ ভালোবাসা দিবসও। আমাদের মাঝে শুকনো পাতায় ভর করে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। গাছে গাছে সবুজ পাতা আর নানা রঙ্গের ফুল। শিমুল বন আর কৃষ্ণচ‚ড়ারা সেজেছে সূর্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রক্তিম রঙে। কোকিলরা গান ধরেছে ভ্রমরের গুনগুনানির তালে তালে। চারদিকে শোনা যায় ঝড়া পাতার নিক্কন ধ্বনি। বসন্ত বারৈ খুঁজে পায় নিজের নামের স্বার্থকতা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন- ‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত।’ বাসন্তী ছোঁয়ায় সবার জীবনে ভালোবাসার দোল লাগুক আজ।

- লেখক: শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ- সিনিয়র সাংবাদিক।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...