ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সঙ্কট কি আসন্ন?

এম এ খালেক
এম এ খালেক - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৪১,  আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:৪৫

গত ৫ ফেব্র্রুয়ারি, ২০২০ জাতীয় সংসদে ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাসমূহের উদ্বৃত্ত তহবিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান বিল-২০২০ অনুমোদন করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের তীব্র আপত্তি এবং বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যদের ওয়াক আউটের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই বিলটি সরকারদলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে।

এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থ ব্যতীত অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত আর কোনো বিলের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিরোধিতা প্রত্যক্ষ করা যায়নি। বিলে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যে খরচ হয় এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরে যে পরিমাণ অর্থ লাগে তা তাদের নিজস্ব তহবিলে জমা রাখা হবে।

এছাড়া আপদকালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য পরিচালনা ব্যয়ের আরো ২৫ শতাংশ অর্থ এসব প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করতে পারবে। পাশ হওয়া বিলে মোট ৬১টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেয়া হয়েছে যেসব প্রতিষ্ঠান/সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে স্থানান্তর করা হবে।

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলটি নানা কারণেই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাস হওয়া নতুন এই আইন দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ক’দিন আগে জাতীয় সংসদে একটি বিল উত্থাপিত হয়েছে। এই বিলটি আইনে পরিণত হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে।

একটি সূত্র মতে, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার মতো উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে, যা তারা বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত আকারে সংরক্ষণ করছে। নতুন এই আইনটি প্রণীত হওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন  মেটানোর মতো উদ্বৃত্ত অর্থ রেখে অবশিষ্ট অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে স্থানান্তরিত হবে। এই অর্থ সরকার তার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ব্যয় করতে পারবে।

 আগামী ১ এপ্রিল, ২০২০ তারিখ থেকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে আমানতের সুদের সর্বোচ্চ হার হবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের বেলায় ৬ শতাংশ। বর্তমানে দেশের ইনফ্লেশনের হার ৬ শতাংশের কাছাকাছি। কাজেই ব্যাংকগুলো যদি আমানতকারীদের বার্ষিক সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ৬ শতাংশ সুদ প্রদান করে, তাহলে এটা আমানতকারীদের জন্য মোটেও লাভজনক হবে না। তারা বরং ব্যাংকে আমানত না রেখে অন্য কোনো বিকল্প উৎসে তাদের আমানত সংরক্ষণের চেষ্টা করতে পারে।

ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো অনেকদিন ধরেই সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে অঙ্গীকার করে আসছে কিন্তু তারা সেই অঙ্গীকার এখনো পূরণ করেনি। ঋণের ওপর আরোপিত সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিপরীতে তারা কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে বিভিন্ন দাবি আদায় করে নিয়েছে। যেমন, তারা অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও বৃদ্ধি করে নিয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড একই পরিবার থেকে একযোগে চারজন পরিচালক নিয়োগের বিধান জারি করিয়ে নিয়েছে। এরা একাধিক্রমে অব্যাহতভাবে তিন টার্ম অর্থাৎ ৯ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

আগের আইনানুসারে একই পরিবার থেকে একযোগে ২ পরিচালক নিযুক্ত হতে পারতেন। তারা দু’টার্ম অর্থাৎ ৬ বছর অব্যাহতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। আগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মোট আমানতের ২৫ শতাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের সংরক্ষণ করার বিধান ছিল। কিছুদিন আগে তা ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে কিন্তু জাতীয় সংসদে ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাসমূহের উদ্বৃত্ত তহবিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান বিল-২০২০ অনুমোদিত হবার কারণে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহের একটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এখন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেও বেসরকারি ব্যাংকে তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করতে পারবে না। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো আগামী ১ এপ্রিল থেকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। এ ধরনের অঙ্গীকার তারা আগেও একাধিকবার করেছে। কাজেই এখনই শেষ কথা বলার সময় আসেনি। তারা ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার বিপরীতে আমানতের ওপর ৬ শতাংশ সুদহার ১ ফেব্র্রুয়ারি থেকে বাস্তবায়ন করেছে। অর্থাৎ এখন তারা আমানতের ওপর ৬ শতাংশের বেশি সুদ দিচ্ছে না।

যে সব স্থায়ী আমানত আছে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেগুলোর উপরও ৬ শতাংশ সুদ হার প্রয়োগ করা হবে। এখানে সিঙ্গেল ডিজিট নিয়ে সব মহলেই বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সিঙ্গেল ডিজিট বলতে ৯ শতাংশ সুদ হারকে বোঝানো হচ্ছে। বিষয়টি আসলে তেমনটি নয়। কারণ সিঙ্গেল ডিজিট বলতে ১০ শতাংশের নিচের একটি অবস্থানকে বোঝায়। ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ কি সিঙ্গেল জিডিট নয়? কাজেই ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক মালিকরা সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার প্রয়োগ করলেই তা যে ৯ শতাংশ হবেই এমন নাও হতে পারে।

মুক্তবাজার অর্থনীতির সাধারণ সূত্র হচ্ছে, বাজার চাহিদা এবং জোগানের ওপর ভিত্তি করেই একটি পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারণ করা হবে। সেখানে সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে যে অবস্থা বিরাজ করছে সেই বাস্তবতায় ঋণের ওপর সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার আরোপ করা কতটা যৌক্তিক হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ রয়েছে।

কারণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ব্যাংকের তথ্যমতে, তাদের ‘কস্ট অব ফান্ড’ হচ্ছে সোয়া ৮ শতাংশ অর্থাৎ বিনিয়োগযোগ্য ১০০ টাকার তহবিল সৃষ্টিতে তাদের ব্যয় হয় ৮ টাকা ২৫ পয়সা। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে কস্ট অব ফান্ড আরো বেশি। তাহলে তারা কীভাবে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হারে ঋণ প্রদান করবে? আমাদের দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার অস্বাভাবিক রকম বেশি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই সেক্টরে পর্বতপ্রমাণ খেলাপি সদম্ভ উপস্থিতি।

নানাভাবে চেষ্টা করেও খেলাপিঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা যাচ্ছে না। এখন সরকার যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে। খেলাপিঋণ আদায়ের পরিবর্তে তাদের বিভিন্ন প্রকার আইনি প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। ঋণখেলাপিরা অত্যন্ত ক্ষমতাবান। তারা সব সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আশপাশে অবস্থান করে। তারা বুঝে নিয়েছে কোনো সরকার আমলেই তাদের অসুবিধা হবে না। ব্যাংকগুলোর সমস্যা নিয়ে অনেক কথাই বলা হচ্ছে কিন্তু খেলাপিঋণ আদায়ের কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুসারে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে মোট খেলাপিঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার মতো কিন্তু আইএমএফ বা এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপিঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। খেলাপিঋণ আদায়ের ব্যবস্থা না করে বরং তাদের নানাভাবে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এককালীন ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ খেলাপিঋণ ১০ বছরের পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

এভাবে পুনঃতফসিলিকরণকৃত ঋণের ওপর সুদ হার হবে ৯ শতাংশ অথচ যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন তাদের ১২/১৩ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। ‘মিথ্যা যেমন সকল পাপের উৎস’ তেমনি ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপিঋণ হচ্ছে অনেক ধরনের সমস্যার মূল কেন্দ বিন্দু কিন্তু সেই খেলাপিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ দৃশ্যত লোক দেখানো মাত্র। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সেক্টরে তীব্র তারল্য সঙ্কটের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে তার পেছনেও বড় ভূমিকা পালন করছে খেলাপিঋণ কালচার। আমরা প্রায়শই খেলাপিঋণের কথা শুনি কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তেমন একটা সচেতন নই। ‘খেলাপি ঋণ’ হচ্ছে নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকের নিকট থেকে গৃহীত ঋণের কিস্তি ফেরত দানে ব্যর্থতা।

এই ব্যর্থতা ইচ্ছেকৃতও হতে পারে আবার পরিস্থিতিজনিত কারণেও হতে পারে। খেলাপিঋণ নানাভাবে ব্যাংকিং সেক্টরকে বিপর্যস্ত করছে। প্রথমত, ব্যাংক নিজের অর্থে ব্যবসায় করে না। তাকে সাধারণ মানুষের নিকট থেকে প্রতি বছর নির্ধারিত সুদ প্রদানের শর্তে আমানত সংগ্রহ করতে হয়। যেমন, কোনো ব্যাংক যদি ১০ শতাংশ সুদ প্রদানের শর্তে আমানত সংগ্রহ করে তাহলে বছরান্তে তাকে সংশ্লিষ্ট আমানতনকারীকে ১০০ টাকার জন্য ১০ টাকা সুদ প্রদান করতে হবে। ব্যাংক এই ১০০ টাকার পুরোটা বিনিয়োগ করতে পারবে না। ব্যাংক হয়তো ৮২ শতাংশ বা ৮২ টাকা বিনিয়োগ করল। এই ৮২ টাকা ঋণের ওপর এমনভাবে সুদারোপ করতে হবে যাতে আদায়কৃত কিস্তির টাকা থেকে আমানতকারীকে সুদ প্রদানের পরও ব্যাংকের কিছু মুনাফা থাকে।

এই মুনাফা তখনই থাকবে যখন ব্যাংক তার প্রদত্ত ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে পারবে। যদি ব্যাংক ঠিকমতো ঋণের কিস্তি আদায় করতে না পারে তাহলেও কিন্তু আমানতকারীকে নির্ধারিত সুদ প্রদান করতে হবে। উপরন্তু অনাদায়ী ঋণাঙ্কের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় এ জন্যই যে, কোনো কারণে ব্যাংক প্রদত্ত ঋণ আদায় করতে ব্যর্থ হলেও আমানতকারী চাওয়া মাত্র নির্ধারিত সময়ে যেন তার টাকা ফেরত দিতে পারে।

যে টাকা প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয় সেই পরিমাণ অর্থ ব্যাংকের বিনিয়োগ সামর্থ্যরে বাইরে চলে যায়। বর্তমানে ব্যাংকের প্রদর্শিত বা দৃশ্যমান খেলাপিঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকারও এই বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যাংকের ঋণদানের সামর্থ্যরে বাইরে থেকে যাচ্ছে। এই টাকা যদি ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে পারত তাহলে তার অপারেটিং কস্ট কমে যেত। ব্যাংকটি তুলনামূলক কম সুদে ঋণ প্রদান করতে পারত। কথায় বলে, ‘বসে খেলে রাজার গোলাও শেষ হয়ে যায়।’

ঠিক একই কথা বলা যেতে পারে ব্যাংকিং সেক্টরের ক্ষেত্রে। ব্যাংক যদি খেলাপিঋণ সঠিক সময়ে আদায় করতে না পারে, তাহলে তারল্য সঙ্কট থেকে শুরু করে অনেক সমস্যাই মোকাবিলা করতে হবে। যেহেতু ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের গাফিলতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাই আগামী দিনে ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সঙ্কট থেকে শুরু করে অনেক সমস্যাই দেখা দেবে।

- লেখক: এম এ খালেক- অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এমএইচ




Loading...
ads






Loading...