আইসিজের আদেশে ভারত, চীন ও রাশিয়ার নীরবতা

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ৩১ জানুয়ারি ২০২০, ১০:২০,  আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২০, ১০:২৮

মিয়ানমারকে গণহত্যা রোধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে আইসিজে। রাখাইনে এখন যে রোহিঙ্গারা আছেন, তাদেরকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য মিয়ানমারকে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিয়েছে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে)। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় ঘোষণা করা অন্তর্বর্তীকালীন রায়ে মিয়ানমারের প্রতি চারটি নির্দেশনা দেয় আইসিজে, রাখাইনে বসবাসরত সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম ঝুঁকিতে রয়েছে।

তাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার সরকারকে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে হবে। আদালত বলেছে, সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বাহিনী যাতে গণহত্যা না চালায় কিংবা উস্কানি না দেয় সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, সে সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী চার মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের কাছে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয় মাসে একটি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এসব প্রতিবেদন গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে।

মিয়ানমারের সর্বোচ্চ নেতা অং সান সু চি তার দেশের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করলেও জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ আদালত রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা প্রতিরোধে মিয়ানমারকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আইসিজেতে ১৭ জন বিচারকের প্যানেলে এই আদেশের পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে ভোট দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ওই জনগোষ্ঠীর হত্যা রোধ করা, তাদের যেন গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি না হয়। এবং ইতোমধ্যে সংঘটিত সম্ভাব্য গণহত্যার প্রমাণ সংরক্ষণ করা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যেকোনো নিরাপত্তা বাহিনী যেন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কোনো গণহত্যায় না জড়ায়, উস্কানি না দেয়, কিংবা নির্যাতনের মুসলমানদের চেষ্টা না করে সেজন্য ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমারকে নির্দেশ দেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের এই আদেশ মানতে মিয়ানমার বাধ্য। তবে আদালত এজন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। তবে এই রায় উপেক্ষা করা মিয়ানমারের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবু বাকার তাম্বাদুর পদক্ষেপের ফলে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে হেগের আদালতে দাঁড়িয়ে তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ প্রশ্নে বক্তব্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক বাসিন্দারা সংগঠিত হামলা চালাচ্ছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, মায়ের কোল থেকে শিশুদের ছিনিয়ে নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ছুঁড়ে মারছে, পুরুষদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে, মেয়েদের ধর্ষণ করছে এবং সব রকমের যৌন নির্যাতন করছে।

কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে আন্তর্জাতিক সংঘাতবিষয়ক অধ্যাপক জন প্যাকার বলেন, গাম্বিয়া একটি ছোট ও দুর্বল দেশ। অন্য দেশগুলো পর্যায়ক্রমে পাশে না দাঁড়ালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলার ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, সেটা বলা মুশকিল। কারণ এখন পর্যন্ত দেশটিকে যারা অর্থায়ন করছে, কোনো কারণে তারা সরে পড়লে গাম্বিয়া কীভাবে মামলা চালিয়ে নেবে, সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জাতিসংঘের সাবেক এই মানবাধিকার কর্মকর্তা মনে করেন, এ ধরনের মামলা শেষ হতে সময় লাগে বছরের পর বছর।

গাম্বিয়া শেষ পর্যন্ত কত দিন নিজের অবস্থানে অটল থাকতে পারে, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। গণহত্যা সনদের বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংগঠনসহ নানা পক্ষের এই মামলায় গাম্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখতে বাংলাদেশ উদ্যোগ নিতে পারে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, নিজের দাবি সামনে না আনলে কখনো দর কষাকষি করা যায় না। নিরাপত্তা পরিষদে আইসিজের আদেশ বাস্তবায়নের কথা রয়েছে, তখন চীনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

এখন পর্যন্ত দেশটি মিয়ানমারের পাশেই আছে। ভারতকেও এখনো সেভাবে পায়নি বাংলাদেশ। এ বিষয়ে জন প্যাকার বলে আদালতের সিদ্ধান্ত চীন আটকে দিতে পারে না। যদিও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন মিয়ানমারকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আদেশ মেনে চলতে মিয়ানমারকে রাজি করাতে পারে চীন। কারণ শেষ পর্যন্ত আইসিজের আদেশ লঙ্ঘন করার মানে জাতিসংঘের সনদকে চ্যালেঞ্জ করা। সেটা চীন করবে না।

রোহিঙ্গা সঙ্কট ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের (আইসিজে) ঐতিহাসিক আদেশ নিয়ে ভারত, চীন ও রাশিয়া কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর বিষয়টি হতাশার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভারতের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না থাকার বিষয়টি সবচেয়ে হতাশাজনক বলে বাংলাদেশের একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতের এ আদেশ মিয়ানমার উপেক্ষা করলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে যাবে। সে ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া আগের অবস্থানে থাকলে আদেশটি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

ভারত কখনই রোহিঙ্গা ইস্যুতে সক্রিয় অবস্থানে ছিল না। দেশটি সব সময়ই কৌশলগত অবস্থানে থেকেছে এবং এ রায়ের ক্ষেত্রেও কৌশলগত অবস্থানে থেকেই প্রতিক্রিয়াহীন রয়েছে। তবে এ আদেশের ফলে চীনের ভূমিকা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। আগামী ছয় মাস ওআইসিকে সঙ্গে নিয়ে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকাকে সঙ্কট সমাধানের দিকে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার একটা বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভারত হয়তো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে এবং থাকবে। আইসিজের আদেশের পর ভারতের একটা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকলে তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ সঙ্কটের সমাধানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। প্রতিক্রিয়া না দেখানোর বিষয়টা তাই বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস তৈরি করেছে। ভারত নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যও নয়। ফলে ভারতের চেয়ে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিশ্ব আদালত ২৩ জানুয়ারি মিয়ানমারের জন্য যে চারটি করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, মিয়ানমার তা প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে ওই আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যাবে।

এ ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ প্রতিপালন না করার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা নিয়ে ভোটাভুটি হবে। ওই ভোটাভুটির ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়া আগের মতো ভেটো দিলে পুরো আদেশটিই কার্যত অর্থহীন হয়ে যাবে। ফলে আদেশের পর চীন ও রাশিয়ার নীরব অবস্থান হতাশা তৈরি করেছে। ভূ-কৌশলগত স্বার্থের বিবেচনা থেকেই ভারত বরাবর রোহিঙ্গা সঙ্কট ইস্যুতে নিশ্চুপই থেকেছে। এ অ লে ভারতের ভূ-রাজনৈতক কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দু’পক্ষের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক রেখে তার স্বার্থের বিষয়টিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।

ওই স্বার্থের বিষয়টি সামনে এলে ভারত স্বাভাবিকভাবেই রোহিঙ্গা সঙ্কট ইস্যু থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। ফলে ভারতের কাছ থেকে আদেশের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া আসবে না, এটাই স্বাভাবিক। এ নিয়ে বাংলাদেশের নতুন করে হতাশ হওয়ারও কিছু নেই। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার অবস্থানের নেপথ্যের কারণটি ভিন্ন। মিয়ানমারের ওপর চীনের ঐতিহাসিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এ অ লে চীনের ভূ-কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা পরিষ্কার। এ ক্ষেত্রে পুরো এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অ লেই প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতরে একটা প্রতিযোগিতা এবং দ্বন্দ্বও রয়েছে। এ দ্বন্দ্বের কারণে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে চীনের অবস্থান স্পষ্ট।

রোহিঙ্গা সঙ্কট ইস্যুতেও চীনের এখনকার অবস্থানের বড় কারণ এটাই। আর রাশিয়ার অবস্থানের কারণ এ অ লে অস্ত্রের বাজার। সেই অস্ত্রের বাজারের বিবেচনায় মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে রশিয়া। কারণ সেখানে তাদের অস্ত্রের বাজার বড় এবং আরো সম্প্রসারণের বিষয়টিও আছে। এখন পর্যন্ত যে অবস্থা তাতে আদেশটি নিরাপত্তা পরিষদে গেলে চীন ও রাশিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা আশা করা যায় না।

তবে বাংলাদেশের সামনে একটা বড় সুযোগ আছে। গাম্বিয়ার মামলাটি হয়েছে ওআইসির মাধ্যমে এবং ওআইসিভুক্ত কয়েকটি দেশে রাশিয়ার অস্ত্রের বড় বাজার রয়েছে। সে কারণে বাংলাদেশের সামনে একটা ভালো সুযোগ এসেছে। বাংলাদেশ আগামী ছয় মাস ওআইসিকে সঙ্গে নিয়ে রশিয়া ও চীনকে ইতিবাচক ভূমিকায় আনতে বিশেষভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে। জেনোসাইড থেকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের আদেশ মিয়ানমারকে পুরোপুরি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন মিয়ানমারে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ানের মিশনের রাষ্ট্রদূতরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০১৬-১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহির ওপর অব্যাহতভাবে গুরুত্বারোপ করে আসছে। ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতরা রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত অপরাধ তদন্তে মিয়ানমার গঠিত তদন্ত কমিশন সম্প্রতি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাও আমলে নিয়েছেন। ইউরোপীয় দূতরা বলেছেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিয়ানমাররে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সময় যুদ্ধাপরাধ, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অনুপাতহীন বল প্রয়োগ করা হয়েছে বলে ওই কমিশন নিশ্চিত করেছে।

অন্যদিকে আইসিজের রায়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আইসিজের বিচারিক এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আইসিজে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দিয়েছেন। বিষয়টি তুলে ধরে ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতরা বলেছেন, ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইসিজের আদেশ মিয়ানমার পুরোপুরি মেনে চলবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।’ কূটনৈতিক তৎপরতার কৌশল ও রূপরেখা বাংলাদেশকেই তৈরি করতে হবে এবং সফলতাও বাংলাদেশের ওপরই নির্ভর করছে। ফলে এখানে যথেষ্ট আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে।

লেখক - সৈয়দ ফারুক হোসেন : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।






ads