• মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০
  • ই-পেপার
12 12 12 12
দিন ঘন্টা  মিনিট  সেকেন্ড 

বহুত্ববাদের বিদায় আসন্ন

মানবকণ্ঠ
মযহারুল ইসলাম বাবলা

poisha bazar

  • ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৩৪

মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩০ খ্রি.) ছিলেন ফেরগানার অধিপতি। সাইবেরিয়া থেকে আসা উজবেকরা তাকে মধ্য এশিয়া থেকে বিতাড়িত করে। বিতাড়িত বাবরকে নিরুপায়ে আশ্রয় নিতে হয় তৈমুর বংশীয় নিকটাত্মীয় হিরাটের শাসনকর্তার কাছে এবং তারই সাহায্য-সহযোগিতায় আফগান ভূখণ্ডে প্রবেশ করে আফগানের কাবুলের শাসনকর্তা রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

বাবরের স্বপ্নজুড়ে ছিল ভারত জয়। সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী রাজ্যের অধিপতি হওয়ার প্রবল আকাক্সক্ষায়, ভারত জয়ই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। সেই অভিপ্রায়ে ১৫১৮ থেকে ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একাধিকবার পাঞ্জাব আক্রমণ করেও তার পক্ষে ভারত ভ‚খণ্ডে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে মধ্য-এশিয়া, আফগান ও গাক্কার থেকে বিপুল সৈন্য সংগ্রহ করে এবং সৈন্যবাহিনীকে মোঙ্গলদের যুদ্ধ-কৌশলে পারদর্শী করে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধে দিল্লির শাসনকর্তা ইব্রাহীম লোদীকে পরাজিত করে দিল্লি দখল করেন। পরে আগ্রার ফতেহপুর সিক্রির যুদ্ধে চিতোরের রাজাকে পরাজিত করে সমগ্র রাজপুতানা এবং গঙ্গা উপত্যকার পুরো অঞ্চল দখল করে উত্তর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন।

মোগল সম্রাট বাবর মাত্র তিন বছর ভারত শাসন করেছিলেন। তিনি প্রজ্ঞাবান, শিক্ষিত, পর্যবেক্ষণশীল মানুষ ছিলেন। পাশাপাশি ছিল শিল্পকলা সম্বন্ধে তার সূ² ও গভীর জ্ঞান। বিচারবোধসম্পন্ন কবিও ছিলেন। তার অমর কীর্তি নিজের স্মৃতিকথা রচনা। চাঘতাই তুর্কী ভাষায় লিখিত বাবরের স্মৃতিকথার পাণ্ডুলিপি পরে ফার্সিতে অনূদিত হয়। ভারতে ইংরেজ রাজকর্মচারী ও সাহিত্যানুরাগী জন লেডন এবং উইলিয়াম এরসকিন ফার্সি থেকে ইংরেজি ভাষায় বাবরের স্মৃতিকথা অনুবাদ করেন। আমাদের বাংলা একাডেমি ওই ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা ভাষায় দুই খণ্ডে বাবুরনামা স্মৃতিকথার অনুবাদ প্রকাশ করেছে। প্রিন্সিপ্যাল ইবরাহীম খাঁ অনূদিত বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ দু’টি মূল্যবান এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

ভারতের শাসনভার গ্রহণের পর ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের বাবর বিধর্মী বিবেচনা করলেও তার রাজকার্যে যোগ্যতার ভিত্তিতে হিন্দুদের অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার শাসনামলে জায়গীরপ্রাপ্তরা বেশিরভাগই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। পরমতসহিষ্ণু বাবর হিন্দুদের ধর্মান্তরিত তো করেনইনি। করেননি তাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নও। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, মোগল সম্রাটরা ধর্মবিবাদ-বৈষম্য এড়িয়ে সাম্রাজ্য বিস্তারকেই বরাবর গুরুত্ব দিয়েছেন। সাম্রাজ্যের বিস্তারই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য, নিজ ধর্মেমতের প্রচার-প্রসার নয়। নিজেরা ধর্ম পালন করলেও নিজ ধর্ম অপর ধর্মাবলম্বীদের ওপর চাপানোর কোনো প্রচেষ্টাই গ্রহণ করেননি। সাম্রাজ্যের বিস্তার ও সুরক্ষাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।

মোগল দরবারে, রাজকার্যে, সৈন্যবাহিনীতে সর্বক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাধিক্যই প্রমাণ করে হিন্দুদের প্রতি তারা সদয় পরিচয় দিয়েছিল। বিচ্ছিন্নভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষ মোগল শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেও তারা কেউ জয়ী হওয়া তো পরের কথা, মোগল আক্রমণে হয় পরাজিত হয়েছিল কিংবা পালিয়ে আত্মরক্ষায় বাধ্য হয়েছিল। ভারতের সমষ্টিগত হিন্দু সম্প্রদায় মোগল শাসনকে বিনা বাধায় মেনে নিয়েছিল। কেননা মুসলিম শাসনাধীনে তাদের ধর্মমত-ধর্মাচারের ওপর কোনোরূপ অন্যায় হস্তক্ষেপ মোগলরা করেনি বরং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যুক্ত করেই সাম্রাজ্য পরিচালনা ও বিস্তার করেছিল।

ভারতের উত্তর প্রদেশের ফৌজাবাদ জেলায় অযোধ্যা শহরের রামকেট হিলের ওপর অবস্থিত ছিল প্রাচীন বাবরি মসজিদটি। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অনুমানে বিশ্বাস করত ওই বাবরি মসজিদের স্থলে হিন্দু ধর্মের অবতার রামচন্দ্রের জš§স্থান। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে আঠারো শতকে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। যেটি অযোধ্যা বিতর্ক নামে পরিচিত। মসজিদের অভিলিখন থেকে জানা যায়, মোগল সম্রাট বাবরের আদেশে তারই সেনাপতি মীর বাকি ১৫২৮-২৯ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।

উনিশ শতকের শুরুতে দুই সম্প্রদায়ের বিতর্কের জেরে পরস্পরের একাধিক কলহের ঘটনা ঘটে। পাল্টাপাল্টি মামলাও দায়ের করে উভয় সম্প্রদায়। ২৩ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সালে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো হিন্দু-মহাসভার সঙ্গে জোট বেঁধে সঙ্গোপনে মসজিদের অভ্যন্তরে রাম ও সীতার মূর্তি রেখে আসে। মসজিদের অভ্যন্তরে রাম-সীতার মূর্তি রাখাকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে। দাঙ্গা ঠেকাতে সরকার বাবরি মসজিদটি সিলগালা করে মসজিদে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। দুই সম্প্রদায়ই মসজিদ স্থলে প্রবেশের জন্য আদালতে মামলা দায়ের করে। ইতিপূর্বে ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বিরোধ নিরসনে দেয়াল নির্মাণ করে দুই সম্প্রদায়ের প্রার্থনা স্থল পৃথক করে দিয়েছিল।

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ সালে বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি ভারতের দক্ষিণ প্রাপ্ত থেকে দশ হাজার কিলোমিটার দূরত্বের ‘রাম রথযাত্রা’ শুরু করে। ওই রথ-যাত্রায় অংশ নেন অগণিত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থকরা। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মোহন যোশি, বিনয় কাটিয়াসহ বিজেপির শীর্ষ নেতারা বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে পৌঁছে মসজিদ ধ্বংসে নেতৃত্ব দেন। মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার সংবাদে ভারতব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গায় প্রাণ হারায় দুই হাজারেরও অধিক মানুষ। নিহতদের সিংহভাগই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ইস্যুটি ভারতজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাসীন বিজেপির শাসনামলে সুপ্রিম কোর্ট গত ৯ নভেম্বর ২০১৯ চ‚ড়ান্ত রায়ও প্রদান করেছে। রায়টিকে বহু-বিতর্কের অবসান মনে করা হলেও ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কথাও শোনা যাচ্ছে। বাবরি মসজিদ ভাঙা এবং ওই স্থলে রামমন্দির প্রতিষ্ঠা বিজেপির রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। তারা সংসদে-সরকারে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে বহুত্ববাদী ভারতকে হিন্দু-রাষ্ট্রে পরিণত করার নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

১৯৯২ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় ছিল জাতীয় কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসীমা রাও। ধর্মনিরপেক্ষ দাবিদার কংগ্রেসের শাসনামলেই বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছিল বিজেপিসহ হিন্দু উগ্রবাদীরা। ওই মসজিদ ভাঙা ঠেকাতে বা বাধা প্রদানে কংগ্রেস সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিশ্চুপ-নির্বিকার ছিল। কৌশলগতভাবে কংগ্রেস ভেবেছিল মসজিদ ভাঙা হলে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে হিন্দু-মৌলবাদীরা কোণঠাসা হয়ে যাবে। আর এর সুফল লাভ করবে ধর্মনিরপেক্ষ তকমাধারী কংগ্রেস। প্রতিপক্ষ বিজেপি রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে যাবে। জনসমর্থন হারাবে আর সে সুযোগের মওকায় কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হবে কিন্তু কংগ্রেসের সে কৌশল মাঠে মারা যায়, বুমেরাং হয়ে পড়ে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্রুত এবং প্রবল উত্থানই সেটা প্রমাণ করে। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরই হিন্দুত্ববাদী জাগরণ ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বিজয়ী বেশে হিন্দুত্ববাদীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্রমাগত সমর্থন লাভ করে চলে। হিন্দু মহাসভা, শিবসেনা, আর.এস.এস. এবং বিজেপির সমন্বয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিকাশ ঘটে অতি দ্রুততায়। মসজিদ ভাঙার সফলতায় হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক বিজয়ই জাতীয় নির্বাচনে প্রবল প্রভাব ফেলে এবং তারা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে তৃতীয় মেয়াদে এখন ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। রাজ্যগুলোতেও তারা একের পর এক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হয়ে পড়েছে। বহুত্ববাদকে বিদায় করে হিন্দু-ভারত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একের পর এক কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। এনআরসি এবং সিএএ বাস্তবায়ন ওই প্রচেষ্টারই অংশ। সম্প্রতি সরকারি হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার জন্য বিজেপি সরকার ঘোষণাও দিয়েছে। শুধু ধর্মের বৃত্তে সব জাতিসত্তার ভারতীয়দের একত্রিত রাখা সম্ভব হবে না। এই ভেবে ভারতের অসংখ্য ভাষাভাষীকে সাংস্কৃতিকভাবে একাট্টা করতেই ওই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সব ভারতীয় মাত্রই একজাতি এই তত্ত্বকে স্থায়ীকরণেই হিন্দিভাষাকে অসংখ্য ভাষাভাষীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার মতলব এঁটেছে।

গত ৯ নভেম্বর সদ্য অবসরে যাওয়া ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ রায় দিয়েছে। রায়ে বাবরি মসজিদের ২.৭৭ একর জমি সরকারকে ট্রাস্ট গঠনের সাপেক্ষে মন্দির নির্মাণ করার অনুমতি দিয়েছে। পাশাপাশি অযোধ্যারই পৃথক স্থানে ৫.০০ একর জমি মসজিদ নির্মাণের জন্য সুন্নি ওয়াক্ফ বোর্ডকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মন্দির নির্মাণের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারকে ট্রাস্ট গঠনের অনুমতি প্রদান সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকারের পক্ষে ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কোনো ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ করা সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সরকারের পক্ষে অসম্ভব। তাহলে মন্দির নির্মাণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট কীভাবে সরকারকে ট্রাস্ট গঠনের অনুমতি প্রদান করল!

সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারকের একজন মুসলিম ধর্মাবলম্বী বিচারকও ছিলেন। বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ ব্যতীত এ ধরনের বিতর্কিত রায় প্রদানের অবকাশ নিশ্চয় ছিল না। শোনা যাচ্ছে সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতি রঞ্জন গগৈ নাকি বিজেপি সরকারের আশীর্বাদে রাজ্যপাল হতে যাচ্ছেন।

ভারতীয় পৌরাণিকে রামের জন্মস্থান অযোধ্যায় উল্লেখ থাকলেও কোন স্থানে রামের জš§স্থান তার ঐতিহাসিক প্রমাণও উল্লেখ নেই। বহুপূর্ব হতেই ভারতের বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এ ধরনের মন্তব্য করে এসেছেন। তারপরও বাবরি মসজিদ বিতর্ক থেমে থাকেনি। বিষয়টি নিয়ে উভয় সম্প্রদায় আদালতে হাজির হলেও কংগ্রেস সরকারের নির্লিপ্ততার সুযোগে হিন্দুত্ববাদীরা ১৯৯২ সালে পরিকল্পিতভাবে মসজিদটি ধ্বংস করে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের দেয়া রায়েও বলা হয়েছে ১৯৯২ সালে মসজিদ ভাঙা সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল।

সুপ্রিম কোর্টের দেয়া রায়ের পেছনে ২০০৩ সালে ভারতের ভ‚মি জরিপ বিভাগের প্রতিবেদনটি রায় প্রদানের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট সর্বাধিক বিবেচনায় নিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল বাবরি মসজিদের ভিতের গভীরে পুরনো স্থাপনার অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। ওই খণ্ড-বিখণ্ড স্থাপনার নিদর্শন সুলতানী কিংবা মোগল আমলের স্থাপনার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সেগুলো রামমন্দিরের স্থাপনার খণ্ডাংশ বলেও ভ‚মি জরিপ বিভাগ উল্লেখ করেনি। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, কোনো খালি স্থানে মসজিদ স্থাপিত হয়নি। বাবরি মসজিদের ন্যায় বিশালাকার স্থাপনা নির্মাণে মাটি খনন করে নিশ্চয় কোনো পতিত স্থাপনার খণ্ডাংশের ওপর নির্মাণ করা হয়নি। আবাসিক বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রেও দেখা যায় আট-দশ ফুট গভীর খননে নানা ধরনের সাবেকি আমলের চিহ্ন পাওয়া যায়। সাবেকি স্থাপনার খণ্ডাংশের ওপর ভিত নির্মাণও নিশ্চয় কেউ করে না। ওগুলো অপসারণ করেই ভিত্তিপ্রস্তরের কাজ করা হয়। সাধারণ মানের আবাসিক গৃহনির্মাণের ক্ষেত্রে যদি এ ধরনের কাজ করা হয় তবে বাবরি মসজিদের ন্যায় বৃহৎ স্থাপনার ক্ষেত্রে পুরনো স্থাপনার খণ্ডাংশের ওপর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা নিশ্চয় অবাস্তব এবং হাস্যকর। শত-সহস্র বছর পূর্বেকার কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে, ভ‚মিকম্পে এক স্থানের স্থাপনা ছিটকে দূরবর্তী স্থানে চলে আসাটাও অস্বাভাবিক নয়। কাজেই ভারতের ভূমি জরিপ বিভাগের প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়, নির্ভুল মনে করাও সমীচীন নয়। এখনকার স্থাপনা নির্মাণে আরসিসি স্ট্রাকচার অনুসরণ করে কলমের নির্দিষ্ট স্থানসমূহে মাটি খনন করে সিটু পাইল প্রবেশ করিয়ে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্থাপনা নির্মিত হয় কিন্তু বাবরি মসজিদ স্থাপনার সময় এলাকাজুড়ে গভীর খনন করে মাটির নিচে প্রশস্ত ইট-পাথরের চাঁই বসিয়ে গাঁথুনি দেয়া হয়েছিল। মাটির উপরে এসে দেয়ালের প্রস্থ কিছুটা কম হলেও মাটির নিচে কিন্তু অনেক প্রশস্ত গাঁধুনি দেয়া হয়েছিল, ওই ভিতে।

মসজিদের পুরো কাঠামোর ভিত্তিই ছিল ওই প্রশস্ত শক্তপোক্ত দেয়াল। মসজিদ নির্মাণে তাই অনেক গভীর স্তর অবধি খনন করতে হয়েছিল। বাবরি মসজিদের কাঠামোকে বিবেচনায় নিলেই বোঝা যায় ভারতীয় ভ‚মি জরিপ বিভাগের প্রতিবেদনটি অনুমাননির্ভর, বাস্তবানুগ নয় অথচ ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ভ‚মি জরিপ বিভাগের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই রায় প্রদান করেছে। ১৫২৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দৃশ্যমান মসজিদটিকে মোটেই বিবেচনায় নেয়া হয়নি। বিশাল ওই স্থাপনা নাকি খালি স্থানে নির্মাণ করা হয়নি। মসজিদের গভীর তলদেশ থেকে পাওয়া প্রাচীন স্থাপনার ক্ষুদ্র খণ্ডাংশের বিষয়টি আমলে নিয়েই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তবে ভারতীয় ভ‚মি জরিপ বিভাগ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি যে, মসজিদের গভীর তলদেশ থেকে পাওয়া প্রাচীন স্থাপনার খণ্ডাংশগুলো রামমন্দিরের খণ্ডাংশ। তারা লিখেছে, সুলতানী কিংবা মোগলদের স্থাপনার সঙ্গে ওই খণ্ডাংশের মিল নেই। ধারণা করা যায়, সেগুলো প্রাচীন ভারতীয় স্থাপনারই খণ্ডাংশ। ভারতীয় ঐতিহাসিকরাও কখনো বলেনি বাবরি মসজিদ রামমন্দির ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছিল কিংবা ওই স্থানে রামমন্দির ছিল তারও কোনো তথ্য-প্রমাণ কেউ আজ অবধি দিতে পারেনি। কেবল ধারণার বশবর্তী হয়ে রাজনৈতিক অভিপ্রায়ে বাবরি মসজিদ ভাঙা এবং এ নিয়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়টি বর্তমান একক সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেছে মাত্র।

বহুত্ববাদী ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের রাষ্ট্র ক্ষমতার একক আধিপত্যে বহুত্ববাদ চরম হুমকির কবলে। অতীতের ঘৃণিত দ্বিজাতিতত্ত্বে পুনরায় অধিক শক্তিমত্তায় ভারতে ফিরে এসেছে। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভাজিত করার হীন অপকীর্তি চলছে বর্তমান বিজেপি সরকারের শাসনামলে। ভারতের বহুত্ববাদ অপসারিত হলে অনিবার্য হয়ে পড়বে ভারতবিভক্তি। ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব হবে না। বিজেপির শাসনামলে দেশটির অর্থনৈতিক সঙ্কট ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে জনগণকে দুর্বিষহ অবস্থায় ফেলেছে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার ন্যায় বিজেপি অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে জনগণের দৃষ্টি ফেরাতে একের পর এক ঘৃণ্য  বিতর্ক সৃষ্টি করে চলেছে। রায়কে পক্ষে নেয়া, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ইত্যকার পদক্ষেপগুলোতে কাশ্মীর বিভক্তি, কাশ্মীরীদের সাংবিধানিক অধিকার হরণ, বাবরি মসজিদ মামলায় লেজে-গোবরে জড়িয়ে পড়েছে মোদি সরকার।

এনআরসি এবং সিএএ নিয়ে ভারতজুড়ে তীব্র আন্দোলনে দেশটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিটি প্রদেশে, শহরে সাধারণ মানুষ মিছিল, সমাবেশ করে সরকারের হীন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। প্রাণ হারানোসহ অসংখ্য সহিংস ঘটনাও ঘটছে। আসামের পর সারাদেশে এনআরসি, সিএএ বাস্তবায়ন মোদি সরকারকে বেহাল করে তুলেছে। বিজেপির সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারংবার বলেছেন হিন্দুদের নয়, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিমদের কেবল ভারত থেকে বিতাড়িত করা হবে।

ভোটব্যাংক অক্ষণ্ন রাখার অভিপ্রায়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করার নানা বক্তব্য-বিবৃতি প্রদানের পরও দেখা যাচ্ছে ওই আইন বাস্তবায়ন হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদেরই দেশছাড়া হতে হবে। এমতাবস্থায় সব সম্প্রদায়ের মানুষ একাট্টা হয়ে পথে নেমেছে। বিপদ আঁচ করতে পেরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি বলেছেন, ‘এ আইন করা হয়েছে কোনো মুসলমানকে তাড়ানোর জন্য নয়।’ ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে ঐক্যেরও ডাক দিয়েছেন মোদি। তিনি বলেছেন, ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই হচ্ছে ভারতের অনন্য বিশেষত্ব।’ অথচ তার সরকারের আমলেই ওই বৈচিত্র্য ভাঙার একের পর এক তৎপরতায় দেশটির অখণ্ডতা এখন হুমকির মুখে। বিজেপি সরকার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন প্রণয়ন ও পাস করে দেশকে নির্মম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। স্বৈরতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিবাদী কায়দায় দেশ-শাসন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে লেলিয়েও কুলাচ্ছে না। অখণ্ড ভারতের শেষ পরিণতি কী হয় সেটা নিকট ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

লেখক: মযহারুল ইসলাম বাবলা - নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।

মানবকণ্ঠ/টিএইচডি




Loading...
ads






Loading...