• শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০
  • ই-পেপার
12 12 12 12
দিন ঘন্টা  মিনিট  সেকেন্ড 

ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান: একটি অজানা অধ্যায়

মানবকণ্ঠ
মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব

poisha bazar

  • ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৩৪

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগান বা শূন্যোদ্যান সম্পর্কে আমরা অনেকেই কম বেশি অবহিত। কেননা এটি প্রাচীন যুগে বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য্যরে একটি। কিন্তু এটা কিভাবে এবং কে তৈরি করেছিলেন, তা বোধ হয় আমরা অনেকেই ততটা জানি না।

এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, এ বিশ্বে সময়ের সিঁড়ি বেয়ে যতগুলো সভ্যতার (যেমন- মিসরীয়, সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, এসেরীয়, ক্যালাডীয় সিন্ধু, পারস্য, হিব্রু, ফিনিশীয়, চীন, গ্রিক, রোমান, ইত্যাদি) গোড়াপত্তন হয়েছে।

তারমধ্যে মেসোপটেমীয় তথা ব্যাবিলনীয় সভ্যতা মানুষের মনে তুলনামূলক যতখানি দাগ কেটেছে, অন্যগুলো অতখানি নয় বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও সভ্যতার ক্রমবিকাশের দিক দিয়ে কিছু কিছু সভ্যতা একই সময় বিভিন্ন অঞ্চল স্বকীয়তা নিয়ে গড়ে উঠেছে। আবার একই সঙ্গে কেবল একটি সভ্যতা ভিত্তি করে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন নামে ধীরে ধীরে পরিবর্ধনপূর্বক উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাবিলনীয় সভ্যতাও একই আঙ্গিকে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল।

এটি প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম একটি। এই ব্যাবিলনীয় সভ্যতা অতিপ্রাচীন হলেও শিল্পকলায় বেশ ছোঁয়া লেগেছিল। এর শিল্প শাখায় ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চিত্রকর্ম ও পূর্তকার্যে অভ‚তপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এর একটি বড় উদহারণ হলো এই শূন্যোদ্যান (Hanging Gardens of babylon)। অনেক গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন যে, এটি পিরামিডের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়?

এক্ষেত্রে বলতে দ্বিধা নেই যে, মেসোপটেমীয় সভ্যতার অন্যতম যে প্রধান সভ্যতা, সেটা হলো এই ব্যাবিলনীয় সভ্যতা। উল্লেখ্য যে, ফোরাত নদীর তীরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠে জাঁকজমকপূর্ণ একটি সুন্দর শহর। এই চার কোনা শহরটি যেনতেন ছিল না। এর চারদিকে ছিল প্রাচীরে ঘেরা। এর সামনে ছিল উঁচু ও মজবুত প্রবেশ পথ এবং মধ্যে মাথা উঁচু করে ছিল ব্যাবিলন টাওয়ার। এক্ষেত্রে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, ব্যাবিলন নামের সঙ্গে এর যথেষ্ট সংশ্লিষ্টতা আছে। বস্তুত ব্যাবিলন শব্দটির উৎপত্তি সেমিটিক শব্দ ‘ব্যবইল’ থেকে; যার অর্থ হলো দেবতার নগর।

আর পবিত্র বাইবেল ধর্মগ্রন্থেও ‘ব্যাবল’ শব্দের উল্লেখ আছে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ এর দিকে সুমেরীয় সভ্যতার যবনিকা টানার পর এই ব্যাবিলনীয় সভ্যতার নেপথ্যে যদি রাজা বা সম্রাটদের কথা বলি, তাহলে উঠে আসে প্রথম সম্রাট সারগনের কথা। তিনি মোটামুটি সফল। এদিকে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা সমৃদ্ধির পেছনে ছিল সুমেরীয় সংস্কৃতি ও জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারা। অবশ্য এক্ষেত্রে পরবর্তী সম্রাট হাম্মুরাবির কর্মকাণ্ডও প্রণিধানযোগ্য।

দুই.

সময়ের পরিক্রমায় কয়েকশ’ বছরব্যাপী এই সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হিট্টাইট, অ্যাসিরিয়ান, ক্যাসাইট ও ক্যালডিয়ান জাতিগোষ্ঠীর হাতে। ৬২৫ খ্রিস্টপূর্বে ন্যানোপোলাসের নেতৃত্ব তার সুদূরপ্রসারী বুদ্ধির সারথী ধরে ব্যাবিলন পুনরায় জেগে উঠে।

এর মধ্যে তার মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র নেবুচাদনেজার ক্ষমতায় আসেন। আর সুন্দরের পূজারি নেবুচাদনেজার ছিলেন বাবার চেয়েও এক কাঠি সরস। তিনি ব্যাবিলনকে জাঁকজমকপূর্ণসহ আরো সমৃদ্ধ করে তুলেন। তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ছিল- শিল্প, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যর প্রতি অনুরাগ। তিনি যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ-মন্দির ও স্থাপত্য পুনর্নির্মাণ করত মনের মাধুরী দিয়ে ব্যাবিলন শহরকে সুরম্য ও দৃষ্টিনন্দন করে তুলেন।

এতদ্ব্যতীত দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার [৬০৫-৫৬২ খ্রিস্টপূর্ব] এর বিস্ময়কর আকর্ষণীয় স্থাপনা হলো ব্যাবিলনের এই শূন্যোদ্যান বা ঝুলন্তবাগান। এক্ষেত্রে প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের প্রতি বাদশাহ শাহজাহানের ভালোবাসার প্রতীকী তাজমহলের কথা মনে করিয়ে দেয় বলে অনেক ঐতিহাসিক অভিমত ব্যক্ত করে থাকেন।

উল্লেখ্য যে, সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার ছিলেন বেশ আমুদে এবং ভীষণ রোমান্টিক। ‘নিনেডে’ নামক একটি অঞ্চল দখল করার প্রাক্কালে পার্শ্ববর্তী মিডিয়ান পাহাড়ি দেশের সম্রাট তাকে বেশ সহযোগিতা করেছিলেন। সেই সুবাদে দু’সম্রাটের মধ্যে সোহার্দপূর্ণ অবস্থা গড়ে উঠে। এদিকে মিডিয়ান রাজকন্যা ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী বিধার এক পর্যায়ে তার প্রেমে দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার জড়িয়ে পড়েন এবং কিছুতেই রাজকন্যাকে ভুলতে পারছিলেন না।

ওদিকে শৌর্য-বীর্য, সৌম্যকান্তি ও সফল পুরুষ হিসেবে রাজকন্যাও ভেতরে ভেতরে তাকে ভালোবেসে ফেলেন এবং নির্মল প্রেমের গভীরতার কারণে শেষ পর্যন্ত তাদের দুজনের বিয়ে হয়ে যায়। কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর সম্রাজ্ঞী কি রকম যেন উদাসী হয়ে পড়েন? এতে সম্রাটের বুঝতে বাকি রইল না যে প্রাকৃতিক পাহাড়ি আমেজে বেড়ে উঠার কারণে সমতল ভ‚মিসম্বলিত ব্যাবিলন তার ভালো লাগছে না।

সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার তার প্রতি এতটাই দুর্বল ছিলেন যে, তার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য পাহাড়িদৃশ্য সংবলিত কিছু একটা তৈরি করার মনস্থ করেন। এরই সূত্র ধরে প্রাসাদের ওপর বিশাল পাহাড় তৈরি করেন এবং এর সঙ্গেই স্থাপন করেন মনোরম বাগান। কারণ সম্রাট মনে করেন যে, এতে সম্রাজ্ঞী আনন্দিত ও খুশি হলেই তিনি তৃপ্ত হবেন। অবশ্য এটা তৈরিতে তার প্রেরণাও কম ছিল না।

সঙ্গতকারণেই তাজমহলের ন্যায় ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ঝুলন্ত বাগান সম্পর্কে বিশদ জানতে হয়তো সম্মানিত পাঠকদের মনে কৌত‚হল জাগতে পারে। কেননা এই বাগান যেনতেন নয়। এটি সপ্তাচার্যের একটি। যাহোক, এ বাগান তৈরি করতে প্রথমে নির্মাণ করা হয় বিশাল এক ভিত, যার আয়তন ছিল প্রায় আটশত বর্গফুট। এই সুদৃঢ় ভিতটিকে স্থাপন করা হয় তৎকালীন সম্রাটের উপাসনালয়ের সুবিস্তৃত ছাদে।

আর এর উচ্চতা ছিল মাটি থেকে উপরে আশি ফুট এবং এই ভিতের ওপরেই নির্মিত হয়েছিল বিশ্বের আকর্ষণীয় এবং বিস্ময়কর ফুলের বাগান। এটা তৈরিতে লাগে প্রায় চার হাজার শ্রমিক, যারা ক’বছর একটানা কাজ করেছিলেন। আর এই সুবৃহৎ বাগানের পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত ছিল সহস্রাধিক মালী।

এখানেই শেষ নয়, এই ঝুলন্ত বাগানের ধাপে ধাপে রোপণ করা হয়েছিল প্রায় ছয় হাজার বিভিন্ন জাতের ফুলের চারা এবং এই সুউচ্চ ধাপগুলোতে পানি উঠানো হতো পেঁচানো ও মোটা বিশেষ নলের সাহায্য। আর প্রাচীনকালের এই ঝুলন্ত বাগান সপ্তাচার্যের অন্যতম একটি হলেও পেছনে নিহিত আছে ভালোবাসার নিদর্শন, যা হয়তো আমরা অনেকেই সেভাবেই চিন্তা করি না।

তিন.

এই প্রাচীন মনোমুগ্ধকর বাগান নিয়ে যে এতক্ষণ কথা বললাম, তার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা শ্রেয় যে, এই বাগানটিকে ঝুলন্ত হিসেবে অত্যাশ্চর্য বলা হয় কেবল একটি কারণে, তাহলো দূর থেকে মনে হতো বাগানটি বাতাসে ভাসছে। কিন্তু অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদরা বলেন যে, এই বাগানের অস্তিত্ব বা অবস্থান নিয়ে এত সব গল্প ও অতিকথনের অংশ হিসেবেই যুগের পর যুগ মুখে মুখে চলে আসছে।

এটা শুধুই পৌরাণিক কাহিনী। বাস্তবে ব্যাবিলন শহরে এ ধরনের কোনো বাগান ছিল কিনা, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। মজার ব্যাপার হলো যে, বর্ণনায় এমন চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, সম্রাট দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার তার প্রেমিকা স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য হাওয়ায় ভাসমান শূনোদ্যানটি তৈরি করেছিলেন এবং এই বাগানের শীর্ষে ওঠা যেত সিঁড়ির আকা-বাঁকা ধাপ বেয়ে।

এখানে নানা জাতের ফুলের গাছ ছিল, যাতে হাজার হাজার প্রজাপতি উড়ে বেড়াতো বলে বর্ণনায় বলা হয়ে থাকে। এদিকে জানা যায় যে, ৫১৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্য সম্রাট সাইরাস জেরুজালেম দখল করার প্রাক্কালে এই শহরের উপাসনালয় এবং রাজপ্রাসাদসহ সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেন। কিন্তু পৌরাণিক কাহিনীতে যত কথাই বলা হোক না কেন, বস্তুনিষ্ঠ তথ্যাদি নির্ভর এমন কিছু পাওয়া যায়নি যে ব্যাবিলন শহরে একটি শূন্যোদ্যান ছিল। কিন্তু সেটা কোথায় এবং কিভাবে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে?

সে সব প্রশ্নের উত্তরে, ইতিহাস পুরোপুরি নীরব। পরিশেষে বলতে চাই যে, রহস্যে ঘেরা ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের বিষয়টি আমাদের মনে এমনভাবে শেকড় গেড়ে বসেছে যে এটার কোনো ভিত্তি নেই বা কোনো দিন যে ছিল না, তা বিশ্বাস হয় না। যদি কেউ এর অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলে, তখন ভেতরে ভেতরে তার প্রতি বিরক্তিজনক মনোভাব সৃষ্টি হয়। আমরা তো ছোটবেলায় দাদি-নানির কাছ থেকে আরব্য রজনীসহ কত কাহিনীই শুনেছি? তা এখনও মনে হলে সেই রাজকুমার অথবা রাজকন্যা বা পঙ্খীরাজ ঘোড়ার মজার মজার কথা মানসপটে ভেসে উঠে। তাই থাক না ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান সেইভাবেই এবং সেই বিশ্বাসে।

সূত্র: ১। কিশোর পাতা, মে/২০১৮ইং। ২। সভ্যতার ইতিহাস (প্রাচীন ও মধ্য যুগ)- ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন এবং ড. মো. আবদুল কুদ্দুস সিকদার। ৩। বিভিন্ন সুধীজনের সঙ্গে আলোচনা।

লেখক: মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব - বিশিষ্ট গবেষক, অর্থনীতিবিদ এবং লেখক হিসেবে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মাননা ও পদকপ্রাপ্ত।

মানবকণ্ঠ/টিএইচডি




Loading...
ads






Loading...