অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই

মানবকণ্ঠ
মীর আব্দুল আলীম - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • মীর আব্দুল আলীম
  • ১৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:৫১

নির্বাচন কেমন হবে? নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ হবে তো? নাকি কারচুপির নির্বাচনে জিতে যাবে সরকারি দলীয় প্রার্থী। ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন নিয়ে এমন ভয়ে, সংশয়ে রাজধানীর ভোটাররা। আগের মতো কারচুপি আর জোরজুলুমের নির্বাচনই হবে কি না তা নিয়ে দেশজুড়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।

এ অবস্থায় আসন্ন নির্বাচনে ইসি এবং সরকার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রমাণ করুন- এটা এখন কায়মনে দেশবাসী চায়। এদেশে সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনের শঙ্কা থেকেই যায় বরাবর। তাই এ নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও অবাধ করে বিগত নির্বাচনের কষ্ট জনগণকে ভুলিয়ে দিক ইসি এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ভোট পদ্ধতি ইভিএম নিয়ে এবারও বিতর্ক আছে। তা আদালতেও গড়িয়েছে। শেষমেশ ভোটের দিন কি হবে তা নিয়ে ঘুরপাকে জনগণ। এমন অবস্থায় নির্বাচনের তারিখ অপরিবর্তিত থাকলে চলতি জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন।

মাঠে এখন প্রার্থীরা ভোটযুদ্ধে। পুরোদমে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। ভোটারদের মধ্যেও ঐ একই সংশয়।

শঙ্কা যেন না থাকে এদিকে উৎসবমুখর নির্বাচনী মাঠকে কোনোক্রমেই ঘোলাটে করতে দেবে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এমন ঘোষণাই তারা দিয়েছেন। নির্বাচন যেন ‘উৎসব’ হতে পারে, সেই চেষ্টাই করবেন তারা। শুরুটা ভালোই হলো ইসির। শেষ ভালো হবে তো? নাকি সেনই পুরনো রূপেই হবে সিটির নির্বাচন।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নির্বাচনী আইনের বাধাকে সংসদ সদস্যরা (এমপি) প্রচারে অংশ নিয়েছেন। এটা ‘দুঃখজনক’। নির্বাচনী কাজে মন্ত্রী এমপিরা জড়িত হলে নির্বাচন প্রভাবিত হবে বৈকি! এ নির্বাচন কমিশনের আমলে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বা পরে যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব নির্বাচনের অধিকাংশ হয় সুষ্ঠু হয়নি অথবা নানা কারণে অংশগ্রহণমূলক ছিল না।

তাই তারা মনে করেন, আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হওয়ার সম্ভাবনা কম। এমন কারণেই হয়তো আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্ব›দ্বী বিএনপির শঙ্কা থাকা অযৌক্তিক নয়। আগের বদনাম কিছুটা দূর করতে সরকারকে যেমন আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, তেমনি নির্বাচন কমিশনকেও নিতে হবে শক্ত অবস্থান।

বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো- এ প্রবাদটি অনেক পুরনো। ইসি হুঙ্কার দিবেন আর ফাঁক-ফোকরে অধিক ক্ষমতাধর প্রার্থীরা তরি পার হবেন তা যেন না হয়। কোনো কিছু অর্জনের জন্য কোনো গোষ্ঠী নানা রকম কলকব্জা শক্ত করে আঁটতে থাকেন। ষড়যন্ত্রের মধ্যে এমন সব ফাঁক-ফোকর থাকে যা দিয়ে সহজেই পার পাওয়া যায়। ব্যবহারিকভাবে যখন কোনো কিছু বাঁধার জন্য গিঁট বা বাঁধন দেয়া হয় তখন স্থান-কাল-পাত্রভেদে এটা এমনভাবে করা হয় যা কিনা কারো জন্য খুলে ফেলা সহজ হয়। আর কারো জন্য কঠিন, কুটিল ও জটিল হয়ে পড়ে। এমনটা যেন আমাদের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে না করা হয়।

আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচনে যেসব রাজনৈতিক দল মেয়র পদে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে তারা হলো ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, মাঠে বিরোধী দল বিএনপি, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণফ্রন্ট ও বাংলাদেশ কংগ্রেস।

যেভাবেই হোক সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হচ্ছে। এটা যেমন পজেটিভ নির্বাচন অবাধ এবং সুষ্ঠু করাটাও ইসির চরম দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। চলতি ঢাকার সিটি নির্বাচনে সম্ভবত এই প্রথম সব থেকে বেশি সংগঠন অংশ নিচ্ছে। যার কারণে আশার মশাল জ্বলে উঠছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী আমেজ রাজধানী ঢাকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক। আমােেদর ভোটার তথা জনগণ শান্তিপ্রিয়। শান্তির পক্ষে আমরা সবাই। ভোট শান্তিপূর্ণ হলেই সর্বত্র শান্তি বিরাজ করবে। নইলে চাপা ক্ষেভ। তাই শান্তির ভোট চাই; শান্তির আহ্বান জানাই।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ এর নির্বাচনের কারণে ভোটারদের একটা আশঙ্কা আছে যে, তারা ভোট দিতে পারবেন কিনা। কারণ ভোটারদের ইচ্ছার ওপর ভোট দেয়া এখন আর নির্ভর করে না। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঠিক ভ‚মিকা এবং নির্বাচনে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার বিষয়টি নির্ভর করে।

এই বিষয়গুলো ঠিক না থাকলে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আরেকটি মহড়া হতে পারে সিটি নির্বাচন। এমনটি যেন না হয়। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ২০১৫ সালের সিটি নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি এবার প্রার্থী হননি এবং নির্বাচন বর্জন করেছেন। তার কথা-‘নির্বাচন করে কী হবে? পূর্বনির্ধারিত ফলের এই নির্বাচনে গিয়ে লাভ কী? ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের নামে যে প্রহসন হয়েছে, এরই পুনরাবৃত্তি হবে।’

এমন আশঙ্কা থাকতেই পারে এদেশে। এদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ারও কিন্তু নজির আছে। সব প্রতিক‚লতা, আশঙ্কা, ভয় ভীতি দূরে ঠেলে মুজিব শতবর্ষ সামনে রেখে ইসি একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের উপহার দেবেন এটাই জনগণ কায়মনে চায়। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আবহ সৃষ্টি করা সম্ভব। নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীগণ হেরে যাবেন এমনটাও নয়।

কমিশনার প্রার্থী যাই হোক গ্রহণযোগ্য মেয়র প্রার্থী কিন্তু দুই সিটিতেই দিয়েছে সরকারী দল। দেশে উন্নয়নও হচ্ছে ব্যাপক। মেট্রোরেল, স্বপ্নের পদ্মা সেতু হচ্ছে গাঁটের টাকায়। অগণতন্ত্র বলে আগের শোকতাপ কিন্তু উন্নয়নের ভুলিয়ে দিচ্ছে জনগণকে। এ অবস্থায় অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন তো সরকার করতেই পারে। আমরাও অবাধ এবং নিরপেক্ষ একটা নির্বাচন চাই।

আমরা রাজধানীবাসী চাই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন। কেউ চায় না নির্বাচন কেন্দ্রে কোনো সংঘাত হোক, কোনো রক্তপাত হোক এবং কোনো রকমের প্রাণহানি হোক, ভোট লুটপাট হোক। এ ছাড়া প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনও জনগণ কামনা করে না। ভোটের অধিকার প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি নাগরিকের। সবাই যেন আনন্দ চিত্তে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন সে নিশ্চয়তা নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকারীদের দিতে হবে। এবং নির্বাচনের পর রাজধানীতে যেন কোনোরূপ বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা সৃষ্টি না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। আপামর জনগণের প্রত্যাশাও তাই। নির্বাচনের আগে ও পরে আপনাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা ভালো ভূমিকা থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আচরণবিধি প্রয়োগ করতে গিয়ে এমন কিছু করবে না যেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

আসন্ন সিটি নির্বাচনে কেউ জিতবেন, কেউ হারবেন। যারাই জিতুক, শান্তিপূর্ণ ও অবিতর্কিত নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত না হলে দলের জয় গণতন্ত্রের জয় বলে প্রতিষ্ঠিত হবে না। আমরা প্রত্যাশা করি কোনো জাতীয় রাজনীতির চাপে এই নির্বাচনের বৈশিষ্ট্যকে যেন প্রভাবিত করা না হয়। তাই সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পারা এবং স্বচ্ছভাবে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

জয়-পরাজয় যারই হোক, নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনোভাবেই নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে পরাজিত হলে চলবে না। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে কি হবে? আবার সংঘাত, সংঘর্ষ হবে? এটা এখন হয় না র‌্যাব পুলিশের পিটুনি আর মামলার ভয়ে। চাপা ক্ষোভ তৈরি হবে। সরকার এবং ইসির প্রতি বাজে ধারণা তৈরি হবে। বিগত নির্বাচনগুলো একতরফা হলেও এবার ঢাকা সিটির নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ হলে কোনো সংশয় নেই। না হলেই যত বিপদ।

রাজনৈতিক যুদ্ধ হতে পারে। যদিও এর সম্ভাবনা কম। তবে এটাই বলতে চাই, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া চলতি সরকারে সময়টা খুব একটা খারাপ যায়নি। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ শুরু হয়েছে, দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। গণতন্ত্রেও ঘাটতি থাকলেও, হরতাল অবরোধ না থাকায় জনমনে স্বস্তি ছিল। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পেরেছে, শিল্প কারখানায় উৎপাদন হয়েছে। ভয় এখানেই; এ ধারা ঠিক থাকবে তো? সামনের দিনগুলো ভালো যাবে তো? নির্বাচন ঘিরে আবার জ্বালাও পোড়াও, ভাংচুর, হরতাল অবরোধ এসব হবে না তো? সাধারণ মানুষের মধ্যেও নির্বাচনকে ঘিরে বেশ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তবে তারা নির্বাচনকে ঘিরে আর কোনো অশান্তির পরিবেশ চায় না।

নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয় তাহলে আন্দোলনের ইস্যু তৈরি হবে, বাড়বে আশান্তি। অর্থনীতি ধ্বংস হবে। সম্পদ নষ্ট হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষয় হবে। দেশে বেকারত্ব বাড়বে, অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দেবে। দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হবে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হবে। এমনটা আমরা কেউই আর চাই না। তবে এটাও সত্য, বিরোধী দলের রাজনীতি করার পরিবেশ দিতে হবে বর্তমান সরকারকে। দেশের স্বার্থে তাদেরও ছাড় দিতে হবে।

ক’বছর আগে রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে আমরা প্রতিদিন যা দেখেছি সে কথা এখনো ভুলে যাইনি। প্রতিনিয়ত চোখের সামনেই এসব ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছি। কিছুই করতে পারিনি। এসব রোধে আইন যে নেই তাও নয়, আছে। নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দ্বিতীয় অপরিহার্য কাজ। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৬-৪৭ক অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নাগরিকের অধিকারগুলো বর্ণিত আছে।

সেখানে কাউকেই নির্বিচারে মানুষ হত্যার বৈধতা দেওয়া হয়নি। এ হত্যার দায় যেমন বিরোধী দলের ছিল, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে সরকারও এ দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না। যখন হরতাল-অবরোধের নামে জীবন্ত মানুষ পুড়ে ঝলসে যায়, যখন তাদের উপার্জনের একমাত্র সম্বল কেড়ে নেয়া হয়; অসহায় স্বজনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়, যখন কষ্টার্জিত লাখ লাখ টাকার সম্পদ চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়- তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনও প্রশ্নের মুখে পড়ে বৈকি!

আমরা আর অশান্তি চাই না। আমরা চাই উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হোক। যেকোনো মূল্যে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। জনপ্রত্যাশা ইসি সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে। বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের ভিত রচনা করেছিলেন। গণতন্ত্রের মূলভিত্তি নির্বাচন। আসন্ন সিটি নির্বাচনসহ সকল নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয় এই প্রত্যাশা সবার।

লেখক : মীর আব্দুল আলীম - সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/টিএইচডি






ads