উদয়ের পথে শুনি কার বাণী

রায়হান আহমেদ তপাদার

মানবকণ্ঠ
রায়হান আহমেদ তপাদার - ফাইল ফটো

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২২

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে তাড়িত করেছে। সাংবাদিক, লেখকদের করেছে গভীরভাবে আলোড়িত। তাদেরই একজন ছিলেন মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন। প্রথিতযশা এই লেখক স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। গণহত্যার তরতাজা তথ্য সংগ্রহ করেছেন সমাজের নানা স্তরের মানুষ, পেশাজীবী, কূটনীতিক, সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে। আর সেই সব তথ্য জীবন্ত হয়ে উঠেছে তার লেখা ম্যাসাকার গ্রন্থে।

তিনি মূলত ইতিহাস ও জীবনী লেখক হলেও বাংলাদেশের জন্মের অবর্ণনীয় বেদনা তাকে আবেগতাড়িত করেছে। শত গ্রন্থের এই লেখক দৃশ্যত সবার আগে বিদেশি পাঠকদের সামনে একাত্তরের বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন ম্যাসাকার বইয়ের মাধ্যমে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশ পায় বইটি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন নানা দেশের অজস সহমর্মী মানুষ। যুদ্ধের মাঠে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, শরণার্থী শিবিরে, প্রতিবাদে বা জনমত গঠনে কঠিন সেই সময়ে তারা ভূমিকা রেখেছেন। অর্থনৈতিক অসাম্য, সার্বিক অধিকারহীনতা, নির্বিচার গণহত্যা, পরিকল্পিত ধর্ষণ, লোলুপ লুণ্ঠন, নির্দয় ধ্বংসযজ্ঞের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। সংগ্রামের সেই পথ পুরোটাই ছিল রক্তে ভেজা। এর মধ্যে একাত্তরের নয় মাসজুড়ে চলা গণহত্যা ছিল বিশ শতকের অন্যতম পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত গণহত্যা। গত শতকের ১৯৬০-এর দশক পুরোটাই আমাদের কেটেছে প্রবল আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত সব আন্দোলনেই আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের দাবিতে পরিচালিত সেই সব আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ যখন বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল, তখন তাদের প্রথম শিকার হয়েছিলেন আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তপর্বে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় যখন আসন্ন, তখনো তারা আরো এক দফা বুদ্ধিজীবী নিধনে মেতে উঠেছিল। এক অর্থে বলা চলে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও সমাপ্তি ঘটেছে বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে। আমাদের রাজনীতি ক্রমেই সঙ্কীর্ণ ও অদূরদর্শী পথে এগিয়েছে। অবশেষে তা আটকা পড়েছে সঙ্কীর্ণতার কানাগলিতে। সেখানে সে হয়ে উঠেছে হিংস ; নিজের অস্তিত্ব রক্ষার উপায় সে দেখে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার মধ্যে। এই পরিস্থিতির পেছনেও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতার ভূমিকা আছে বলেই ধারণা করি। চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনার অভাবে আমাদের রাজনীতি গণতান্ত্রিক স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছে। সবার সব ধরনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এই রাজনীতি স্বীকার করতে চায় না; অন্যের মতের প্রতি সে চরমভাবে অসহিষ্ণু। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সে ভিন্নমত ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে চায়। এ রকম অগণতান্ত্রিক ও অন্যায্য পরিবেশ যখন সৃষ্টি হয়, তখন এর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীর কণ্ঠস্বর বেজে ওঠার কথা। রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা যখন সর্বময় হয়ে ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ অনুভব করে বুদ্ধিজীবীর মন। সেই বিদ্রোহ হয়তো রাজপথে প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে না, কিন্তু অন্যদের মননে সঞ্চারিত হয় তার বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখায়, গানে, কবিতায়, নাটকে, চলচ্চিত্রে প্রকাশ ঘটে। কিন্তু আমাদের দেশে তা ঘটেনি। বুদ্ধিজীবীর স্বাধীন কণ্ঠস্বর। কিন্তু স্বাধীন বুদ্ধিজীবী কথাটা আমাদের দেশে আজ সোনার পাথরবাটির মতো। এ হয় না। এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের উল্লেখযোগ্য অংশ চিন্তা ও মনন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন কী, তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে ষাষ্টাঙ্গে বশীভূত হয়ে নানা রকমের বৈষয়িক সাধ পূরণের চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, আইনজীবী ইত্যাদি বুদ্ধিবৃত্তিক পেশার সমিতি-সংগঠনগুলো দলীয় রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত। তারা বস্তুত রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে। জনসাধারণের কাছে যে সাংবাদিক সমাজের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি কাম্য, তারাও দলীয় রাজনৈতিক লাইনে বিভক্ত। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বাংলাদেশে বিরল হয়ে উঠেছে। তাই যখন স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল আইন প্রণয়ন করা হয়, তখন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজের প্রতিবাদ এমন প্রবল হয় না, যা সে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া প্রতিহত করতে পারে। প্রতি বছর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করা হয় ভিন্নভাবে। থাকে কলঙ্কমোচনের স্বস্তি। অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে পরাজয় স্বীকার করে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর সারাদেশ থেকে সহস্রাধিক বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে তারা। অনেকের লাশই পাওয়া যায়নি। এভাবে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার হীনচক্রান্তে মেতে ওঠে নির্মম ঘাতক-দালালরা।

দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নিজ কর্মের মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগঠকদের প্রভূত প্রেরণা জুগিয়েছিলেন।

মুক্তিকামী জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিলেন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। হানাদাররা সেদিন কেবল ঢাকাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক,সংস্কৃতিসেবী, পদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ প্রায় দেড়শ’ বুদ্ধিজীবী-কৃতী সন্তানকে অপহরণ করে মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। সেই থেকে ১৪ ডিসেম্বর এক শোকাবহ দিন। এ শোকাবহ দিনটি চার দশকের বেশি সময় কেটেছে হত্যার বিচার না পাওয়ার আক্ষেপে। কিন্তু এখনকার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঘাতক-দালালদের বিচারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস হানাদাররা বাংলাদেশে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রাখে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই নিজেদের পরাজয় অনিবার্য জেনে দখলদাররা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার গোপন নীলনকশা গ্রহণ করে। ১৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতের পর সারাদেশে একযোগে সর্বাধিকসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তথ্যানুযায়ী এ পর্যন্ত সারাদেশে ৪৬৭টি বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে। কেবল ঢাকা ও এর আশপাশে ৪৭টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন- অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, ডা. মোহাম্মদ শফি, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, নিজামউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার আবু তালেব, আনম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, সৈয়দ নাজমুল হক, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, আলতাফ মাহমুদ, ড. আবদুল খায়ের, ড. সিরাজুল হক খান, ড. ফয়জল মহী, ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী, সেলিনা পারভীন, হবিবুর রহমান, মেহেরুন্নেসা, গিয়াস উদ্দীন আহমদ প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধকালে পুরো সময়জুড়েই পাকিস্তান হানাদার ও বদরবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা। দেশকে মেধাশূন্য করে দিতে পরিকল্পিতভাবে তালিকা করে চালানো হয়েছিল এই হত্যাযজ্ঞ।

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান, মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা এবং স্বাধীন সার্বভৌম দেশের কথা বলতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছিল এসব সূর্যসন্তানদের যাদের বাণী ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধের ৪৯ বছর পর কোথায় আজকের বুদ্ধিজীবী সমাজ? রাষ্ট্রের যেকোনো সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে কার বাণী কানে বাজবে তরুণদের? বর্তমান সময়ের বুদ্ধিজীবী ও তরুণদের প্রতিনিধিদের কেউ কেউ বলছেন, আমাদের দেশে দীর্ঘ সময় ধরে সুকৌশলে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেয়ার কারণে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা মানুষ অবশিষ্ট থাকেননি। তাদের মতে, দলীয় লেজুড়বৃত্তির প্রবণতা এবং কিছু সুবিধা পাওয়ার আশায় এমন এক প্রজন্ম দাঁড় হয়েছে যাদের কাছে আমরা সেই স্বাধীন চিন্তা পাই না।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসকে দেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে নামে। তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। স্বাধীনতাবিরোধীরা এই পরিকল্পিত নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়। বাংলাদেশ যাতে আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেটাই ছিল এ হত্যাযজ্ঞের মূল লক্ষ্য। আর তাই তো শহীদদের রক্তে ভিজে আছে বাংলাদেশের মাটি। যেমন তাদের জন্য ভিজে আছে স্বজনদের চোখ। দেশের জন্য যারা প্রাণ দিলেন, তারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা আমাদের অতি আপনজন। যাদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পেয়েছি, আমরা তাদের ভুলব না।

- লেখক: কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/আরবি





ads






Loading...