বিপিএল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান: বঙ্গবন্ধু থেকেও যেন নেই

মানবকণ্ঠ
স্বপ্না রেজা - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৩৬,  আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৪৫

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানতে জানতে, তাঁর কথা শুনতে শুনতে বেড়ে উঠেছি। শৈশব থেকে তাঁকেই একমাত্র নেতা জেনে বড় হয়েছি। নেতা ভাবি। তিনিই আমার রাজনৈতিক দর্শন, আমার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই বোধের পেছনে যাঁর সক্রিয় অবদান ছিল, তিনি হলেন আমার বাবা সাংবাদিক আসফ উদ্ দৌলা রেজা। দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক কার্যনির্বাহী ও বার্তা সম্পাদক। বঙ্গবন্ধুর সাথে যার সম্পর্ক সম্বোধন ছিল ‘তুই’তে। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষাজীবন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন (বাবার প্রাণপ্রিয় সহকর্মী ও বন্ধু) ও বাবা আসফ উদ্ দৌলা রেজার ঘনিষ্ঠতা ছিল অকৃত্রিম ও পরম শ্রদ্ধার।

শৈশবকালের স্মৃতি আছে ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বরের বাসার। বাবার হাত ধরে গেছি সেখানে। বাবার চোখেমুখে দেখেছি, দেশের জন্য ভাবনা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। পঁচাত্তর সালের পনেরো আগস্ট পাথরের মতো শক্ত মানুষ আমার বাবাকে শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছি। বলতে পারি বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ প্রাথমিকভাবে পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই সৃষ্টি। বীজ বপন বলা যেতে পারে। আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ হলো আমার কাছে দেশকে ভালোবাসার অমূল্য গ্রন্থ। আমি পাঠ করি, ধারণ করি প্রতিটি শব্দ আমার ভেতর এবং তা নিয়মিত। আমার মতো সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অবিভাজিত, অখণ্ডিত চেতনা হয়ে আছেন, থাকেন। তাঁকে অবমূল্যায়ন করা হলে কিংবা অবমাননা করে কেউ কথা বললে, আমি প্রতিবাদ করি।

প্রতিবাদী হয়ে উঠি যে অবস্থায় থাকি না কেন। বাংলাদেশের স্থপতি তিনি। তাঁর নেতৃত্ব দেশের স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আত্মপ্রকাশে উদ্বুদ্ধ করেছে। নিরস্ত্র বাঙালি যে যা পেরেছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করেছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমি হতে পেরেছি স্বাধীন একটি দেশের নাগরিক। দেশজুড়ে চলছে বঙ্গবন্ধুর জš§শতবাষির্কী উপলক্ষে নানান অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি। হয়ে গেল তাঁকে উৎসর্গ করে বিপিএল-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। নামকরণ করা হলো বঙ্গবন্ধু বিপিএল।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবাষির্কীতে বিপিএলই সম্ভবত তাঁর নাম জড়িয়ে, তাঁকে উৎসর্গ করে প্রথম অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। ছিল তৎপরতা। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৮ ডিসেম্বর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পুরো অনুষ্ঠান একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের সৌজন্যে দেখার সৌভাগ্য হয় আমাদের। লেখার শুরুতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এত কথা বলার কারণ ছিল, যে মহান ব্যক্তিত্ব বাঙালির চেতনা জুড়ে, তাঁকে উৎসর্গ করা কোনো কিছু হবে সেই অনুসারে, অনুপাতে, তেমনই আশায় উদগ্রীব থাকা। অপেক্ষায় থাকা আমাদের।

কিন্তু যখন প্রত্যাশা পূরণ হতে দেখি না, তখন কষ্ট হয়। কষ্ট পাই বৈকি। যাক, ব্যক্তিগতভাবে মনে করেছি বঙ্গবন্ধু বিপিএল-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মহান নেতাকে উৎসর্গ করা হয়েছে তাঁর জন্মশতবাষির্কীতে এবং মহান বিজয় মাসে, সুতরাং সেই-ই আয়োজনে মহান নেতার ঐতিহাসিক নেতৃত্ব, বাংলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্বকীয়তাই থাকবে, তেমনই ধারণা ছিল আমার মতো সাধারণ মানুষের। ঠিক বললাম তো পাঠক? বঙ্গবন্ধু নামটা উচ্চারিত হওয়া মানেই তো হলো, লাল আর সবুজের দৃশ্যমান হয়ে ওঠা। বাংলাদেশের পুরো ভূ-খণ্ডে লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন হওয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠা বাঙালির। প্রকৃত সত্য নিয়ে নব নব ধারায় দেশপ্রেম জাগ্রত হওয়া। ঘুমিয়ে পড়তে যাওয়া বাঙালির জেগে ওঠা। কৃষকের মুখে হাসি। নদীর বুকে উচ্ছ্বসিত ঢেউ। পাখির ডানা মেলে উড়ে যাওয়া। আর কত কী।

কিন্তু কী দেখলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে? সত্যি বলছি, দুঃখ পেয়েছি। দুঃখটা একেবারেই ভেতরের। ক্যাটরিনা কাইফ, সালমান খান, সনু নিগোম, কৈলাসদের নিয়ে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করল বিসিবি। যারা পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ায় বেশ জনপ্রিয়। নিঃসন্দেহে তারা গুণী শিল্পী। বাংলাদেশে তাঁদের অনেক ভক্ত আছেন। বিসিবির সুবাদে তাঁদের পরিবেশনা সরাসরি দেখল মিরপুর স্টেডিয়ামে বসে বাংলাদেশি ভক্তগণ এবং টিভি চ্যানেলের সামনে বসে বাংলাদেশের অনেকেই দেখলেন আমার মতন, যা ঘরে বসে রিমোর্ট টিপে বাংলাদেশের নাগরিকেরা বহুদিন ধরে দেখে আসছেন। ইচ্ছে হলে রিমোর্ট টিপে এখনো দেখতে পারেন।

আমি বিনয়ের সঙ্গে বিসিবি সভাপতির কাছে জানতে চাইছি, বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা অনুষ্ঠানে ক্যাটরিনা কাইফ ও সালমান খানকে এনে তাদের নাচ দেখানোর ভেতর মূলত কি যৌক্তিকতা ছিল? বিশ্বাস করুন বিসিবি সভাপতি, ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি। যদি ইন্ডিয়া থেকে এমন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে আনা হতো, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, কিংবা যিনি এই মহান নেতা সম্পর্কে জানেন, বাঙালি সংস্কৃতিতে যাঁর অবদান ছিল বা আছে ইত্যাদি ইত্যাদি, তাহলে সম্ভবত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটির ভাবগাম্ভীর্য ফুটে উঠত। নাকি বিসিবি চেয়েছে, শুধু বিনোদন থাকুক, চেতনা নয়? কিন্তু বঙ্গবন্ধু নামটা যেখানে সম্পৃক্ত, সেখানে তো চেতনাই থাকার কথা। তাই নয় কি?

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা বাংলাদেশকে ধারণ করেন। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রেখেছেন এবং এখন স্বাধীনতা রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। বাঙালি জাতির কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে কোনো কিছুর বিনিময়ে যাদেরকে বিরত রাখা যায় না, যায়নি। এই অনুষ্ঠানে যদি দেখতাম সন্জীদা খাতুন, সাবিনা ইয়াসমিন, ফরিদা পারভীন, রুনা লায়লা, আব্দুল হাদী, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সাদী মুহম্মদ, শাহিন সামাদ, ফেরদৌসী রহমান, ইন্দ মোহন রাজবংশী, কিরণ চন্দ রায়, ফেরদৌস আরা কিংবা তাদের পরের প্রজন্ম শিল্পী সামিনা চৌধুরী, বাপ্পা মজুমদার প্রমুখকে, নিঃসন্দেহে ভালো লাগত। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে নৃত্য পরিবেশন করতে পারতেন শিবলী মুহম্মদ, নিপার মতো শিল্পীরা। বলতে পারব না বিসিবি, কেমন খুশি মতো পরিকল্পনা করেছে।

অনেক দুঃখ পেতাম এবং এখনো পাই যখন দেখি রাজনৈতিক পরিচয়ে স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে কোনো দুর্নীতিবাজ, মাদকব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, বাটপাড় নিজের ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপিয়েছেন এবং যেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করেছেন। অলি-গলি, প্রধান সড়ক বিভিন্ন স্থানে এমন পোস্টার, ব্যানার ঝুলে থাকতে দেখেছি, দেখি। বঙ্গবন্ধুর ছবির চরম অবমাননা তো এটাও, তাই নয় কি? আওয়ামী লীগের বিজ্ঞ কোনো নেতার কোনোদিন এ নিয়ে কষ্ট হয় বা হয়েছিল কিনা জানি না, তবে আমার মতো নগণ্য একজন মানুষের ভীষণ কষ্ট হয়। কষ্ট পাই। এটা বলতে আমার দ্বিধা নেই। দ্বিধা নেই বলতে, মহান এই নেতার আদর্শের রাজনৈতিক দলে থেকে যারা ক্যাসিনো সম্রাট বনে যান, তাদের ধৃষ্টতা দেখে কতটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি।

কিছুদিন আগে একজন প্রবীণ পথচারী বলছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপনের সংস্কৃতি পাল্টে যাচ্ছে। কেমন জানতে চাইলে বললেন, ঘরে-বাইরে, পথেঘাটে এখন ছেলেমেয়েরা বড়দেরকে শ্রদ্ধা করে না। সালাম দেয় না। পাশ কেটে চলে যায়। পারলে ধাক্কা মেরে চলে যায়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে যাওয়া এই কথাগুলো নিছক একজন প্রবীণ পথচারীর নয়। এটা বর্তমান সামাজিক মূল্যবোধের একখণ্ড চিত্র মাত্র। যার জন্য হয়তো কমবেশি আমরা সকলেই দায়ী রয়েছি। অথচ দায়টা বুঝবার সদিচ্ছা নেই কারোরই। প্রবীণ পথচারীর বিষয়টা প্রাসঙ্গিক করতে ইচ্ছে হলো এই লেখাতে।

পাঠক, শেষ প্রশ্নটা আপনাদের কাছে। ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে উৎসর্গ করা কোনো অনুষ্ঠানে সমগ্র বিশ্ব কী দেখতে পেত বলে আপনাদের ধারণা? ভারত স্বদেশ প্রেমে বিশ্বে সম্ভবত শীর্ষে। বিষয়ভিত্তিক গুরুত্ব অনুধাবনে তারা বেশ সজাগ। রাজনৈতিক আদর্শে ভিন্নতা থাকলেও জাতিগত স্বার্থে তারা সব এক কেন্দ বিন্দুতে মিলিত হয়ে যায়।

পরিশেষে বলি, সাকিব আল হাসান ছাড়া বঙ্গবন্ধু বিপিএল দেখা কষ্টের একটা কারণ ছিল। আরো অধিক কষ্টের কারণ দাঁড়িয়ে গেল, বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, স্বকীয়তার অনুপস্থিতি দেখে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সস্তা বিনোদন না দেখাতে চেষ্টা করি। বরং মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাই চিন্তা-চেতনায় আর কাজে। উত্তরসূরি আর আগামী প্রজন্ম বুঝুক, কী অসীম অবদান বাঙালি আর বাংলাদেশের জন্য এই মহান নেতার। পারি তো, তাই না?

লেখক-স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।





ads






Loading...