• বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২০
  • ই-পেপার

মহান স্বাধীনতা: ভোগ-উপভোগের চালচিত্র...

রিন্টু আনোয়ার :
রিন্টু আনোয়ার : - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:২০,  আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৩৭

একটি দেশ যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি করতে যাচ্ছে, তখন শোনা যাচ্ছে দেশটির মন্ত্রীরা তাদের জন্য সড়কে আলাদা লেন চান। মোটকথা এত এত বাস্তবায়নে মন ভরেনি, আরো স্বাধীনতা চান তারা। এটি কোনো দেশের স্বাধীনতা ভোগ এবং বঞ্চনার হাল চিত্র।

তৎকালীন পূর্ববাংলাকে একটি বিভাজিত সমাজে নেয়ার ক্ষোভ-প্রতিবাদেই আন্দোলন-সংগ্রাম, যুদ্ধ পর্বের মাধ্যমে একাত্তরের স্বাধীনতা। কিন্তু একাত্তরে নতুন দেশ প্রতিষ্ঠার পর সেই চেষ্টা ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেড়েছে। কেউ মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিষ্কণ্টক করছেন। কেউ হচ্ছেন এই চক্রের শিকার।

এ কারণেই প্রশ্ন জাগছে- আমাদের চলমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? যুদ্ধার্জিত স্বাধীনতাকে কি বুমেরাং করে ফেলা হচ্ছে? এর জন্য স্বাধীনতা দায়ী নয়। দায়ী স্বাধীনতার অপব্যবহার। এই উদ্দেশ্যে দেশকে স্বাধীন করা হয়নি। কেউ স্বাধীনতার শতভাগ সুফল ভোগ করবে, কেউ তা কল্পনাও করতে পারবে না- এটা স্বাধীনতা নয়। প্রকারান্তরে পরাধীনতা। এক গোষ্ঠীর একতরফা স্বাধীনতা ভোগের জের।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অস্তিত্বের বিষয়টি কোনো টেবিল আলোচনায় ফয়সালা হয়নি। প্রচুর রক্তদানের ভেতর দিয়ে তার জন্ম। একাত্তরে নিরস্ত্র, নিরন্ন, ক্ষুধার্ত বাঙালির জেদ ও মনের জোরের কাছে হেরেছে পাকিস্তানি প্রশিক্ষিত পেশাদার বাহিনী। তারা বাধ্য হয়েছে বীর বাঙালির কাছে তাদের অহঙ্কারী শির নত করতে। একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনে এত আত্মত্যাগের ঘটনা বিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। বাঙালি জাতি চরম ধৈর্য দেখিয়েছে। আবার দেখিয়েছে শৌর্যও।

বছর ঘুরলেই ডিসেম্বরকে বিজয়ের মাস হিসেবে উদযাপন। কিন্তু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য থেকে যাচ্ছে অবহেলিত। কেন আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে বিচ্ছেদ- সেটা আজকের প্রজš§কে পরিষ্কার করে জানানো হচ্ছে না। কোন স্বপ্ন সামনে রেখে এ দেশের দামাল ছেলেরা জানবাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই স্বপ্নের প্রকৃত বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে, আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ফারাক কতখানি-এসবও জানানো হচ্ছে না ঠিকভাবে।

ভারত-পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৪৭ সালে। যুদ্ধের মাধ্যমে নয়। এক ধরনের আপস রফার মাধ্যমে। এর মূল ভিত্তি ছিল দ্বিজাতিতত্ত¡। আপস রফাটির সারবস্তু ছিল- হিন্দুদের দেশ হবে ভারত আর মুসলমানদের পাকিস্তান। পাকিস্তানের অংশ দুটি। একটি পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা)। আরেকটি ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম পাকিস্তান। দুই ‘মুসলমানের’ মাঝখানে বিশালকায় ‘হিন্দু’।

পূর্ববাংলায় প্রথমেই সাংস্কৃতিক আঘাত হানা হয় ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের বড়লাট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় এসে সাফ জানিয়ে দিলেন- ‘উর্দু শ্যাল বি, উইল বি অ্যান্ড মাস্ট বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।’ যে দেশের ৫৬ শতাংশ নাগরিকের ভাষা বাংলা, সেদেশে মাত্র ৬ শতাংশ নাগরিকের উর্দু ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়? এটা তো মেনে নেয়া যায় না।

সেদিন বাঙালিরা তা মেনে নেয়নি। ‘নো’ ‘নো’ বলে দৃপ্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছিল। বাঙালি তখনও আলাদা হওয়ার কথা ভাবেনি। কেবল বাংলার মর্যাদাই চায়নি। চেয়েছিল উর্দুর সঙ্গে সমান মর্যাদায় বাংলাকেও যেন রাষ্ট্রভাষা করা হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিদের গোঁয়ার্তুমির মাত্রা বাড়তেই থাকে। ভাষার দাবিতে ’৫২ সালে হত্যা করা হয় সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতদের। দ্বিতীয় আঘাতটি রাজনৈতিক।

‘পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ নেতৃত্বের কার্যকলাপ ও পাকিস্তানি শাসকদের ছয় বছরের শোষণের বিরুদ্ধে এ নির্বাচন ছিল ‘ব্যালট বিপ্লব’।

মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পরিষ্কার মতামত ব্যক্ত করে এ দেশের মানুষ যুক্তফ্রন্টের পক্ষে রায় দেয়। ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৩ আসনে জয়লাভ করে যুক্তফ্রন্ট; আর মুসলিম লীগের বরাতে জোটে ১০টি আসন। শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কৃষি, সমবায়, পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে।

কিন্তু গণরায়কে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মানতে পারেনি। অগণতান্ত্রিকভাবে এবং মিথ্যা অভিযোগে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ১৯৫৪ সালের ৩০ মে মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হয়। দম ধরেনি পাকিস্তানিরা। থামেনি। একের পর এক আঘাত হানতেই থাকে। তৃতীয় আঘাত হানে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর ক্ষমতায় আসীন হন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান।

সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে তিনি দশ বছর গণতন্ত্রকে নির্বাসন দেন। অনেকে আইয়ুব খানের ১০ বছরকে ‘উন্নয়নের দশক’ বলতে ভালোবাসেন। এটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য সঠিক হতে পারে; কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্যে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বৈষম্য ছাড়া কিছুই জোটেনি। এক পর্যায়ে আইয়ুব খান পূর্ববাংলার মানুষের মন পাওয়ার চেষ্টা করেন নানা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। কিন্তু ততক্ষণে মন থেকে তাকে ছুড়ে ফেলেছে বাঙালি।

ঊনসত্তরে গণঅভ্যুত্থানে গদিচ্যুত হন আইয়ুব খান। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান মসনদে বসে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়লাভ করে।

প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলীর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পায় মাত্র ৮৮টি আসন। প্রাদেশিক পরিষদে মোট ৩১০ আসনের ২৯৮টিই জিতে নেয় আওয়ামী লীগ। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেয়াই ছিল ইয়াহিয়ার জন্য ফরজ কাজ। কিন্তু ইয়াহিয়া গড়িমসি করতে লাগলেন। নানা ছুতোয় তিনি সময়ক্ষেপণ করতে লাগলেন।

এদিকে ১৯৫৪ সালের কথা স্মরণে রেখে বাংলার জনগণ দিনকে দিন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিলেন। তারা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন, পশ্চিমাদের সঙ্গে আর থাকা চলবে না। এর একটা চ‚ড়ান্ত বিহিত হওয়া দরকার। মানুষের এ স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জনগণকে উপহার দিলেন ঐতিহাসিক সেই ভাষণ- যাকে আমি বলি মুক্তিকামী মানুষের মহাকাব্য।

বস্তুত বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য গীতাঞ্জলি নয়, বলাকা নয়, সোনার তরী নয়, সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য ছিল-‘আমাদের আর দাবায়া রাখবার পারবা না’ সহস াধিক বছরের পরাধীন জীবনের অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়ে এ উচ্চারণের মাধ্যমে গোটা জাতির চিত্তলোকে তিনি এমন একটা অনমনীয় আকাক্সক্ষার সৃষ্টি করেছিলেন যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরাট এক প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

পূবর্বাংলার মানুষ ততক্ষণে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছে- হয় মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে, নইলে মরবে। ইয়াহিয়াও কম সেয়ানা ছিলেন না। তিনি এবং ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনার নাম করে পূর্ব পাকিস্তানে সমর শক্তি বাড়াতে লাগলেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বর্বর পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। যেখানে শান্তিপ্রিয় বাঙালিকে হত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার মতো হীন পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল।

সেখানে স্বাধীনতাকামীদের অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে। নয় মাস যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বমানচিত্রে আরেকটি স্বাধীন দেশের জন্ম। দ্রুত সময়ের মধ্যে তৈরি হয় দেশটির সংবিধান। মূলনীতি চারটি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। রাষ্ট্র দেশটির মানুষকে কথা দিয়েছিল এ চার মূলনীতির আদলে এ দেশে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাজ গড়ে তোলা হবে।

রাষ্ট্র কিংবা সরকার এর কতখানি করতে পেরেছে? মন-মননে ’৭১-এ যতখানি জাতীয়তাবোধ ছিল, তা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ‘আমার’ বলতে কোনো শব্দ ছিল না, ছিল ‘আমাদের’, সমগ্র জাতির। সে জায়গায় এখন ‘আমি আর আমার’ তেজ। এতে জের সইছে মানুষ।

এটা কি স্বাধীনতার কুফল? না, মোটেই না। এটা আমাদের বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রক মহলের কারসাজি। সঙ্গে আমাদের মানসিকতাও। আমাদের বোধের ঘাটতি আর দলবাজি। মর্যাদাকে কবর দিয়ে দালানকোঠা, রাস্তা-ঘাটসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনের আকাশচুম্বী ব্যবহার, সীমাহীন ভোগ-উপভোগকেই আমরা স্বাধীনতার প্রতীক ও প্রমাণ ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।

ঠুনকা করে ফেলছি স্বাধিকার, অধিকার, চেতনাবোধকে। প্রতিবছর ডিসেম্বর আসে। স্বাধীনতা দিবস আসে। সবই একঘেঁয়ে আনুষ্ঠানিকতায় ঘুরপাক। পুরনো ও একঘেয়ে কাহিনীতেই নতুন করে হাবুডুবু ছাড়া যেন গতিও নেই। একাত্তরের নামাবলিতে একাত্তরের বোধ-বুদ্ধি বিকল করে ফেলা হয়েছে এরই মধ্যে।

কারো ব্যক্তিগত চেষ্টায় এই ব্যবস্থা বদলানোর আশা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। সমষ্টিগত, ধারাবাহিক এবং সুস্পষ্ট লক্ষ্যাভিসারী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথ ক্রমেই সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে। মুক্তির জন্য সমাজব্যবস্থার অত্যাবশ্যক পরিবর্তনের কথা ভাবতে মানুষ ভয় পায়। এর চেয়ে দম ধরে পড়ে থাকাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করার মানুষের সংখ্যা দেশে এখন দিন দিন বাড়ছে এবং সংখ্যার দিক থেকে প্রচুর।

লেখক : রিন্টু আনোয়ার- সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads






Loading...