মাননীয় প্রধানমন্ত্রী: কঠিন হস্তে দুর্নীতি দমন করুন

শহীদুল হক খান :
শহীদুল হক খান : - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:১৩

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মায়ের কাছে মাসির গল্প বলা নিষ্প্রয়োজন । তারপরেও বলি আপনি বঙ্গবন্ধুকন্যা। বঙ্গবন্ধু যখন বলতে পেরেছেন আমি চারিদিক থেকে অর্থের জোগান দেই আর চাটার দল সব চেটে খেয়ে ফেলে। সেই তখন থেকে এদেশে যেই দুর্নীতির জোয়ার চলছে এবং চলে আসছে তা আপনি এক ঝটকায় থামিয়ে দিয়েছেন। আপনি নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের ছাড় দেননি। দুর্নীতি বিষয়ে আপনার এই যে উদ্যোগ তা সর্ব মহলে প্রশংসা পেয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন সব শ্রেণির দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়ে চলেছে কিন্তু এখানেই তো শেষ নয়। যারা দুর্নীতিবাজ তারা মোটেও ভয় পায় না। নানা কৌশলে তারা দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছে। আপনার কঠোর হুঁশিয়ারি, আইনের কঠোর শাস্তি, দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ দুর্নীতিবাজদের এখনো দমাতে পারেনি।

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই, ৮ ডিসেম্বরের মাত্র কয়েকটা দৈনিক তখন আমার হাতে। প্রথমে ইত্তেফাক, ইত্তেফাকের প্রথম পাতার হেডিং ‘ভোক্তাদের জিম্মি করে সিন্ডিকেট লুটে নিল কয়েক হাজার কোটি টাকা’। ‘আমাদানিকৃত প্রতি কেজি পেঁয়াজের গড় দাম ৪৫ টাকা। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ২৫০ টাকা’। জনকণ্ঠের শেষ পৃষ্ঠা ‘সৌরবিদ্যুতে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে ব্যর্থ উদ্যোক্তা।

প্রতি ইউনিটে সরকারের ক্ষতি ৫ টাকা ৯৫ পয়সা’। প্রথম আলোর শেষ পাতা ‘গরুর মাংস নাগালে আসছে না। সীমিত আয়ের মানুষের গরুর মাংস কেনার সাধ্য নেই বললেই চলে’। মানবজমিন প্রথম পাতা ‘দীর্ঘ হচ্ছে দুদকের অনুসন্ধান তালিকা। বেশিরভাগই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই শিরোনামে মারুফ কিবরিয়া লিখেছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে শুরু আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর শুদ্ধি অভিযানের পর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ প্রভাবশালী অনেকের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের নামে দুর্নীতি কমিশন দুদক।

অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে জোরেশোরেই। ক্রমশই সংস্থাটির অনুসন্ধান টেবিলে যোগ হচ্ছে একের পর এক নাম। যাদের মধ্যে রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেকেই রয়েছেন। শুরুর দিকে ৪৯ জন নিয়ে শুরু হওয়া এই তালিকা এখন ১৮৭ জনে ঠেকেছে’। মানবজমিনের ১৬ পাতায় লেখা হয়েছে ‘হতদরিদ্রের চাল কালো বাজারে বিক্রির অভিযোগ।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্রের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত ১০ টাকা কেজি দরের চাল কার্ডধারীদের না দিয়ে রাতের আঁধারে কালো বাজারে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে চালের ডিলার উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে’। বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রথম পাতা ‘বাজার জুড়ে ভেজাল ওষুধ। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ’। আলোকিত বাংলাদেশ প্রথম পাতা ‘নিয়ন্ত্রণহীন বাজার নাভিশ্বাসে ক্রেতা।

সরকারের পক্ষ থেকে নানা কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রতিফলন নেই’। পাতা ৯ ‘রূপগঞ্জে ছাড়পত্র নেই ৯৫ শতাংশ ইট ভাটার’। সময়ের আলো প্রথম পাতা ‘সরকারি কর্মকর্তাদের অবাক কাণ্ড। সুদমুক্ত ঋণের টাকার গাড়ি চলে উবারে। শাহনেওয়াজ এর প্রতিবেদন, মতিঝিলে নামকরা স্কুলের সামনে দাঁড়ানো একটি সরকারি গাড়ি। ড্রাইভার অপেক্ষা করছে কখন তার বসের ছেলে স্কুল থেকে বের হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ড্রাইভার জানালেন গাড়িটি একটি প্রকল্পের।


আরো একজন ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গাড়িটি তার বসের অধীনস্থ একটি সংস্থার। অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল সুদমুক্ত ঋণের টাকার গাড়ি এখন উবারে চলে। সচিবালয়ের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিজের গাড়ি থাকা সত্তে¡ও অন্যদের সঙ্গে মাইক্রোবাসে যান তার বাড়িতে। কোথায় তার নিজের অফিসের গাড়ি আর কোথায় তার ঋণের টাকার গাড়ি? এসব প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, তার সরকারি গাড়ি বাসার ছেলেমেয়েদের কাজে ব্যবহার হচ্ছে।

আর ঋণের টাকার গাড়ির ব্যাপারে কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। এই মন্ত্রণালয়ের ২৮ জন কর্মকর্তা সুদমুক্ত ৩০ লাখ টাকা পেয়েছেন গাড়ি কেনার জন্য। আর প্রতি মাসে বেতনের সঙ্গে পাচ্ছেন গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৫০ হাজার টাকা। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এদের অধিকাংশ কর্মকর্তার গাড়ি অফিসে আর আনেন না, কোথায় থাকে এই গাড়ি’? দৈনিক কালের কণ্ঠ শেষ পাতা ‘সোর্স লাগিয়ে ছিনতাইয়ে ভুয়া ডিবির দল।

চাকরিচ্যুত পুলিশসহ একডজন অফিসার সক্রিয়। লুট হলেও প্রতিকার পায় না ভুক্তভোগী’। আমাদের সময় প্রথম পাতা ‘গাড়ির ফিটনেস দিতে দুর্নীতি। ৬০ মিনিটের পরীক্ষা ১ মিনিটেই। ঢালো টাকা ঘোরাও চাকা। কারিগরি যাচাইয়ের অভাবে দুর্ঘটনাঝুঁকি। শুল্ক-করই সনদপ্রাপ্তির বৈধতা’। দৈনিক মানবকণ্ঠ প্রথম পাতা ‘সংসদের আবাসিক কমপ্লেক্স। মিলেমিশে ভাড়া বাণিজ্য। সবুজায়নের জায়গা দখল গণপূর্ত কর্মচারীদের।

অবৈধ সাবলেটে ফ্ল্যাট ভর্তি’। আমাদের নতুন সময় পাতা ৩ ‘কুড়িগ্রামে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ইটভাটা। ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসসহ আটক ২। চকরিয়া উত্তর বন বিভাগের অভিযান, চোরাই কাঠভর্তি গাড়ি জব্দ। দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজ কাউকে নির্বাচিত না করার আহ্বান ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের’।

দৈনিক যুগান্তর শেষ পাতা ‘ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি দখল। জালিয়াতি করে হোল্ডিং পরিবর্তন। জমি উদ্ধারের কথা বলে ১০ লাখ টাকা নেন কাউন্সিলর রাজীব। ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন ওসি। জমি হারিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মুক্তিযোদ্ধা। বেনাপোল কাস্টমস সহকারী প্রোগ্রামারের বিরুদ্ধে ঘুষবাণিজ্যের অভিযোগ’।

পৃষ্ঠা ৩ ‘যশোরে কোটি টাকা নিয়ে ভুয়া এনজিও উধাও। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিপদে। নাজিরাবাজার মাতৃসদনে রোগী ভর্তি বন্ধ। ডিএসসিসির আড়াই কোটি টাকাই জলে যাচ্ছে’। সমকাল শেষ পৃষ্ঠা ‘নোয়াখালী ও বিশ্বনাথে দুই কিশোরীকে ১০ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ। নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁ প্রতিনিধি থানায় গিয়ে পাঁচ দিনেও ওসির দেখা পাননি ষাটোর্ধ্ব আসিয়া। এমপি মানিক ও মিলনের সম্পদের খোঁজে দুদক’।

এই হলো একদিনের কয়েকটা জাতীয় দৈনিকের সামান্য কয়েকটি সংবাদ। যার মধ্যে দুর্নীতি আছে, দুর্নীতির ছায়া আছে, দুর্নীতির কায়া আছে। বঙ্গবন্ধু যেদিন চাটার দলকে সতর্ক করেছিলেন সেদিন আজ থেকে প্রায় ৪৪ বছর আগে। আর দলীয় নেতাকর্মীদের যেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দুর্নীতিবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন সেদিন এই তো মাত্র দুই-তিন মাসের ব্যাপার।

মাঝখানে অনেক সরকার এসেছে গিয়েছে। দুর্নীতির অনেক ঘটনা ঘটেছে। অনেকে শাস্তি পেয়েছে। অনেকে পাচ্ছে কিন্তু প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা উল্টালে দেখে বোঝা যায় না, কেউ ভয় পান কিংবা দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে চান। দুর্নীতি মানে হাজার হাজার লাখ লাখ কোটি কোটি টাকার লোভ। টাকা মানে বিলাসিতা। টাকা মানে গাড়ি-বাড়ি, বিত্ত-বৈভব। বাচ্চা শিশুকে যেমন বলা হয় বাবা সোনা চকোলেট খেয়ো না, আইসক্রিম খেয়ো না।

খেলে দাঁতে পোকা হবে। বাচ্চা একদিন দু’দিন বাবা-মায়ের কথা শোনে। তারপর আবার খাওয়া শুরু করে কিন্তু যারা দুর্নীতি করে তারা তো বাচ্চা নন। বাচ্চার বাবা মা, চাচা-চাচি, দাদা-দাদি। তারা তো ভালো করেই জানেন দুর্নীতি করলে এবং ধরা পড়লে খবর আছে। শাস্তি অবধারিত। তারপরেও কেন দুর্নীতি থামে না। তাহলে কি শর্ষের ভেতরে ভ‚ত আছে? হয়তো আছে।

কারণ এখনো সন্ধ্যার পর থানায় গেলে দেখা যায় ভিড়ভাট্টা। জানতে চাইলে জানানো হয় অপরাধীদের আত্মীয়স্বজনরা দরবার করছে। কোনোভাবে আসামি ছুটিয়ে নেয়া যায় কিনা। দুদক চেয়ারম্যান একাধিকবার বলেছেন, দুদকের ভেতরেও দুর্নীতিবাজ রয়েছে। বিমান, গণপূর্ত, সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমন প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানে কম-বেশি দুর্নীতির খবর আমরা পাই। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়। অনেকে অনেক সময় বলেন, যেখানে আইন সেখানেই আইনের ফাঁক।

আমরা বিশ্বাস করি ঘর থেকে দফতর, দফতর থেকে আরো বড় জায়গায় সবখানেই কম-বেশি দুর্নীতি আছে। এই দুর্নীতি নির্মূল করার জন্য একজন শেখ হাসিনাই যথেষ্ট। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি চান, যা তিনি চেয়েছেন, আজকের এই কঠোর ভ‚মিকা যদি তিনি পালন করেন এবং পালন করতেই থাকেন তাহলে আমাদের দেশ দুর্নীতি মুক্ত হবেই। দেশ দুর্নীতি মুক্ত হলে উন্নত হবেই। বাংলাদেশ সোনার বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, শেখ হাসিনার স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে। এই বাংলাদেশকে আমরা দুর্নীতি মুক্ত দেখব, আজ ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতি মুক্ত দিবস উপলক্ষে এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

- লেখক: শহীদুল হক খান- সাংবাদিক, চলচ্চিত্র পরিচালক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব




Loading...
ads






Loading...