চালক ও সহকারীর যাবজ্জীবন, এ রায় হোক উদাহরণ

সাহাদাৎ রানা :
সাহাদাৎ রানা : - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৭

সময়টা ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই। রাজধানীর শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া বাসচাপায় নিহত হন। সবাই ভেবেছিল অন্য আর সব সড়ক দুর্ঘটনার মতো এটাও স্বাভাবিক নিয়মে মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু রাজীব ও দিয়ার মৃত্যুর পর তেমনটি হয়নি। দুই সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাতে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে সড়কে নেমে আসে তাদের সহপাঠীরা।

তাদের সাথে পরে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে প্রতিবাদ। সেই অভিনব প্রতিবাদে রাজধানীসহ সারাদেশের ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় অবস্থান নেয়। এ সময় সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও তারা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল। সাধারণ মানুষ সে সময় তাদের পাশে দাঁড়ায়। সেই অভিনব প্রতিবাদ যা এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সেই দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন সাধারণ মানুষও। শিক্ষার্থীদের সেই আন্দোলনে উঠে আসে সড়কে নানা অনিয়মের কথা। কয়েকদিন এমন প্রতিবাদের পর সরকার ‘নিরাপদ সড়ক আইন’ পাস ও বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলে ঘরে ফিরে যায় শিক্ষার্থীরা।

রাজীব ও দিয়ার মৃত্যুর পর এমন প্রতিবাদের আরা একটি উদ্দেশ্য ছিল দ্রুততম সময়ে বিচার কাজ সম্পূর্ণ করা। অবশেষে শিক্ষার্থীদের সেই দাবি পূরণ হয়েছে। রাজীব ও দিয়া মৃত্যুর ঘটনার মামলায় গত ১ ডিসেম্বর জাবালে নূর পরিবহনের দুই চালক এবং এক সহকারীকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত এবং একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়।

আদালতের এমন রায়ের পর সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেন। কেননা দুর্ঘটনার মাত্র দেড় বছরের মাথায় এই রায় সবাইকে স্বস্তি দিয়েছে। এ রায় এমন সময়ে দেয়া হলো যখন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। ঠিক এই সময়ে এমন রায় সত্যিই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। আমাদের দেশে সড়কে নিরাপত্তা, সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। গত প্রায় দুই দশক ধরে বারবার আলোচিত হলেও এর সমাধান যেন আমাদের কাছে সবসময় সুদূর অতীত। অথচ আমাদের দেশে নিত্যদিনের যাত্রায় মানুষের নির্ভরতা সড়ক পথেই বেশি। দেশের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যমও সড়কপথ। কিন্তু সেই সড়ক পথ অনিরাপদ।

যাত্রী পরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন সবক্ষেত্রে সড়কপথের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। তাই সড়কপথে সবচেয়ে বেশি শৃঙ্খলা ও নিরাপদ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তব চিত্র যেন উল্টো। আমাদের সড়ক পথে নিরাপত্তা নেই, নেই শৃঙ্খলা। এর প্রভাবে সড়কে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু। তবে দীর্ঘদিনের দাবির পর অবশেষে কার্যকর হলো সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮।

এই আইনের বিষয়ে একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়- আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সময় উপযোগী সড়ক পরিবহন আইন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ সড়ক পরিবহন আইনের খসড়াটি নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। আর ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস করা হয় সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮।

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ তে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর শাস্তির বিধান রাখা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘দণ্ডবিধির ৩০৪-বি ধারায় যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে’।

একই সঙ্গে এটি জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। আইনে পেশাদার-অপেশাদার চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে অনধিক ছয় মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেয়ারও বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া আরও বেশকিছু জরিমানার নতুন বিধানও যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে মদপান করে বা নেশাজতীয় দ্রব্য খেয়ে গাড়ি চালালে, সহকারীকে দিয়ে গাড়ি চালালে, উল্টো দিকে গাড়ি চালালে, নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য স্থানে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, চালকছাড়া মোটরসাইকেল একজনের বেশি সহযাত্রী উঠালে, মোটরসাইকেলের চালক ও সহযাত্রীর হেলমেট না থাকলে, ছাদে যাত্রী বা পণ্য বহন, সড়ক বা ফুটপাতে গাড়ি সরানোর নামে যানবাহন রেখে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি, ফুটপাতের ওপর দিয়ে কোনো মোটরযান চলাচল করলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে।

সত্যি বলতে এই আইন যথাযথ কার্যকরের ফলে অনেকাংশে দুর্ঘটনা কমে আসবে। তবে বাস্তবতা হলো- এই আইনে সাধারণ জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়নি। কারণ এই আইনটি নিয়ে কথা হচ্ছে অনেক আগে থেকে। বিশেষ করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি। ইচ্ছাকৃত কোনো চালক কাউকে চাপা দিয়ে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান এখানে রাখা হয়নি। এত কিছুর পরও আইনটি বাস্তবায়ন করা সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

চ্যালেঞ্জটা এ কারণে যে, বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিন সড়কে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে এবং এর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের দেশে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন সারাদেশে প্রায় ১৮ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে সড়ক দুর্ঘটনায়। কারো কারো মতে অবশ্য সংখ্যাটা আরো বেশি।

তবে মৃতের সংখ্যা নিয়ে তারতম্য থাকলেও, এটা সত্যি সড়ক দুর্ঘটনায় কারণে দেশজ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই শিশু, তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। বিশেষ করে তরুণ ও কর্মক্ষম এই দুই শ্রেণিকে দেশের ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগের চেয়ে বেশি মানুষই কর্মক্ষম।

যাদের বয়স ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। নিহতের পরিবার এসব কর্মক্ষম মানুষকে হারিয়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের মৃত্যুর কারণে পুরো পরিবারে দেখা দেয় এক ধরনের অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি শুধু পরিবার নয়, তাদের হারিয়ে দেশও হয় ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ কর্মক্ষম জনগণ যেমন পরিবারের জন্য সম্পদ, তেমনি দেশের জন্যও। সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণের অঙ্কটাও নেহায়েত কম নয়।

তবে শুধু আইন কার্যকর করলেই হবে না। এর পাশাপাশি কিছু উদ্যোগও নিতে হবে। কারণ আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ সড়কে চলাচলের পরিবেশ, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের অসতর্কতা, সড়ক নির্মাণে প্রকৌশলগত ত্রুটি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনীহা, যানবাহন ও সড়ক ব্যবহারকারী তথা চালক, যাত্রী ও পথচারীসহ সকলের অসচতেনতা, সড়কের পাশে বসবাসরত জনগণের অসচতেনতার বিষয়গুলো প্রধান।

এছাড়া দেখা যায় দেশের সব মহানগরে যত পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, তার দ্বিগুণের বেশি মারা যান শুধু ঢাকা মহানগরে। এর পেছনেও রয়েছে অনেক কারণ। প্রধান কারণ ঢাকায় মানুষ ও যানবাহন দুটোর সংখ্যাই বেশি। পাশাপাশি রয়েছে সব স্থানে জেব্রা ক্রসিং না থাকা, ফুটপাত না থাকা কিংবা অবৈধ দখলে চলে যাওয়া, স্বয়ংক্রিয় সঙ্কেতব্যবস্থার অনুপস্থিতি, পথচারী পারাপারে অব্যবস্থাপনাও অন্যতম প্রকৌশলগত ত্রুটি সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে। এসব কারণে মূলত প্রতিদিন সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। এখন প্রশ্ন হলো এ থেকে উত্তরণের কি কোনো উপায় নেই? অবশ্যই এ থেকে উত্তরণ সম্ভব।

তবে সবার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক হতে হবে এক্ষেত্রে। তবে দীর্ঘদিন পর হলেও চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হলো সংশ্লিষ্টরা একটি আন্তরিক হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব মামলার রায় প্রদান অসম্ভব নয়। তাই এখন এমন মামলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরো আন্তরিক হতে হবে। তবে কমিয়ে আনা সম্ভব সড়কে দুর্ঘটনা।

পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আদালতের পর্যবেক্ষণগুলোও সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমলে নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এখানে জনসাধারণেরও অনেকটা দায় রয়েছে। আমরাও অনেক সময় ট্রাফিক আইন মানি না। তাই জনগণের মধ্যেও সচেতনতা আসতে হবে। সরকারের একার পক্ষে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ভ‚মিকা রাখতে হবে। সবার আন্তরিকতায় সম্ভব দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কপথ গড়ে ওঠা। তবে সবার মধ্যে আসবে স্বস্তি। নিরাপদ হবে সড়ক।

- লেখক : সাহাদাৎ রানা, সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads






Loading...