দুর্নীতিমুক্ত শাসন পরিচালনায় বঙ্গবন্ধু

 রায়হান আহমেদ তপাদার :
রায়হান আহমেদ তপাদার - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:৪০

বঙ্গবন্ধুর সারাটা জীবন কেটেছে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের নেতা। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পন্ন হয়। একজন ছাত্রনেতা, সফল রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। মানুষের ওপর আস্থা অর্জন করার মতো মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

তিনি সবসময় একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান একত্রে বসবাস করবে পারস্পরিক সম্প্রীতির মাধ্যমে। পাশাপাশি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র উপহার দেওয়ার চিন্তা-চেতনা তাঁর মধ্যে ছিল। একটি রাষ্ট্রের জনসাধারণ যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারো ওপর হস্তক্ষেপ করবে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করা বা রাজনৈতিক দল গঠন করায়ও তিনি ছিলেন বিরুদ্ধ।

এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেন, যা ছিল তাঁর দীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক দর্শনের পরিচায়ক। তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল বাঙালি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা। এ উপলব্ধি থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়নের জন্য যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন, কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়নের পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন, যেখানে সরকার ও জনসাধারণ যৌথ উদ্যোগে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। সমবায় ব্যবস্থার প্রচলন তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি অন্যতম দিক।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ-রাষ্ট্র গঠনে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে ত্রিশ লাখ শহীদান ও দুই লাখ জননী, জয়া, কন্যার সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন মাতৃভ‚মি। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী রাষ্ট্র-সমাজ চিন্তা-চেতনা বরাবরই জনগণের সুখ-সমৃদ্ধির লক্ষ্যেই স্থির, যার মূলে ছিল অসাম্প্রদায়িক, সমাজতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।

এই জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার টেকসই সমৃদ্ধি নিশ্চিতে দুর্নীতিকেই বঙ্গবন্ধু প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং তা প্রতিরোধকল্পে প্রায় প্রতিটি বক্তব্য-ভাষণে জনগণকে এই ব্যাপারে সচেতন করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতিমুক্ত শাসন পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর অঙ্গীকার ছিল নিখাদ এবং দুর্নীতি নিধনকল্পে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক, যুগোপযোগী এবং খোলামেলা।

অকপটেই তিনি এসব বিষয়কে জনগণের সম্মুখে প্রকাশ এবং এর প্রতিকারে সহযোগিতা আহ্বান করেছেন। ১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল আওয়ামী লীগের স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়া যেতে পারে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না হলে রাজনৈতিক স্বাধীনতাও ব্যর্থ হয়ে যায়। কেবল আওয়ামী লীগের সরকার হলে চলবে না। সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন জনগণেরও সরকার।

সাড়ে সাত কোটি মানুষ, মানুষের সরকার। এটা সম্বন্ধে পরিষ্কার থাকা দরকার। আপনাদের কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে সুশৃঙ্খল করতে হবে। বিরোধী দলে থাকা এক রকমের পন্থা, আর সরকারের পক্ষে রাজনীতি করা অন্য রকম পন্থা এবং সেখানে গঠনমূলক কাজের দিকে মানুষকে এগিয়ে যেতে হবে, অত্যাচার যেন না হয়। জুলুম যেন না হয়, লুটপাট যেন না হয়।

বঙ্গবন্ধু আরো বলেছেন, দেশের মানুষকে সেবা করে মন জয় করতে হবে। তোমাদের কাছে আমার নির্দেশ, তোমাদের কাছে আমার আবেদন, তোমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে, যে আমাদের কাছে রাতের আরাম, দিনের বিশ্রাম হারাম, আমাদের কাজ করতে হবে। দুঃখির মুখে হাসি ফোটাতে হবে। ক্ষমতার জন্য আওয়ামী লীগ জন্মগ্রহণ করে নাই। বাংলাদেশে শোষণহীন সমাজ গঠন করার জন্যই আওয়ামী লীগ জন্মগ্রহণ করেছে।

শোষণহীন সমাজ গড়ে তুলতে হবে। লোভের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। লোভ যেখানে ধ্বংস সেখানে। একবার যদি কেউ লোভী হয়ে যান, সে জীবনে আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন না। শুধু আপনার মুখে কালি দেবেন না, কালি দেবেন সেই সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুখে। যেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ সবে স্বাধীন হয়েছে।

আমাদের সকলের জানা যে, ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সম্মেলনে শুধু দলের প্রথম গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়নি, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কার্যকরী কমিটিও অনুমোদিত হয়। ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেওয়ার প্রাক্কালে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে পূর্ব বাংলায় সাধারণ নির্বাচন ঘোষণার অব্যবহিত পরে ১৯৫৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে জনাব এ. কে. ফজলুল হক ঢাকা হাইকোর্টে অ্যাডভোকেট জেনারেলের পদে ইস্তফা দিয়ে মুসলিম লীগে যোগদান করেন।

আদর্শহীন অনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কোনো দল সংগটিত হলে সেটি দেশের বা দেশের জনগণের মঙ্গলের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তি কল্যাণ বা স্বার্থ উদ্ধারে ব্যতিব্যস্ত থাকবে-বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে সেটিই বারবার প্রতীয়মান হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র-সমাজ দর্শনের যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ, তা হলো ধর্ম-বর্ণ-দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সামগ্রিক আপামর জনগণের কার্যকর মঙ্গল সাধন।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালোবাসে, কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করতে তারা দিবে না এ ধারণা অনেকেরই হয়েছিল। জনসাধারণ চায় শোষণহীন সমাজ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি। ১৯৭২ সালে মহান মে দিবসে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, গুটিকয়েক সুবিধাবাদী ব্যক্তিগোষ্ঠী জাতীয় সম্পদ ও শ্রমজীবী মানুষের উৎপাদন নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছিল। দেশ আজ স্বাধীন। সম্পদের মালিক জনগণ। তাই কোনো শ্রেণিবিশেষের ভোগ-লালসার জন্য এবং লোভ চরিতার্থ করার নিমিত্ত এই সম্পদকে অপচয় করতে দেয়া হবে না।”

১৯৭২ সালে ৯ মে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে বঙ্গবন্ধু বলেন, আপনারা জানেন, জীবনে আমি কোনোদিন মিথ্যা ওয়াদা করি না। আমি জীবনে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী হওয়ার জন্য রাজনীতি করিনি। একদিকে ছিল আমার প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসন আর একদিকে ছিল আমার ফাঁসির ঘর। আমি বাংলার জনগণকে মাথা নত করতে দিতে পারি না বলেই ফাঁসিকাষ্ঠ বেছে নিয়েছিলাম।

সমাজতন্ত্র ছাড়া বাংলার দুঃখি মানুষ বাঁচতে পারে না। সেইজন্য সমাজতন্ত্র কায়েম করার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছি। ঘুষ-সুদখোর, মজুতদার, চোরাকারবারি, চোরাচালানি, অন্যের জমি-বাড়ি দখলদারদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু কঠোর ভাষায় শুধু সাবধান করেননি, তাদের আইনের আওতায় আনার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বহুবার।

১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের প্রথম পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। এই কথা মনে রাখতে হবে। আমি আর আপনার মৃত্যুর পর সামান্য কয়েক গজ কাপড় ছাড়া সাথে আর কিছুই নিয়ে যাব না। তবে কেন আপনারা মানুষকে শোষণ করবেন, মানুষের ওপর অত্যাচার করবেন? গরিবের ওপর অত্যাচার করলে আল্লাহর কাছে তার জবাব দিতে হবে। তাই শুধু আপনারা নয়, সমস্ত সরকারি কর্মচারীকেই আমি অনুরোধ করি, যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে, তাদের সেবা করুন।

যাদের জন্য, যাদের অর্থে আজকে আমরা চলছি, তাদের যাতে কষ্ট না হয়, তার দিকে খেয়াল রাখুন। যারা অন্যায় করবে, আপনারা অবশ্যই তাদের কঠোর হস্তে দমন করবেন। কিন্তু সাবধান, একটা নিরপরাধ লোকের ওপর যেন অত্যাচার না হয়। তাতে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠবে। আপনারা সেই দিকে খেয়াল রাখবেন।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথ ও করণীয় সম্পর্কে অমীয় বাণীগুলো নির্ভীক সাহসিকতায় ধারণ করে বিশ্বপরিমণ্ডলে দেশ আজ সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন সমৃদ্ধির সূচকে অভ‚তপূর্ব মর্যাদায় আসীন হয়েছে। নতুন করে জাতির জনকের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সত্য সাহসী উচ্চারণগুলো পুরো জাতিকে উদ্দীপ্ত করছে।

বাঙালি জাতি-রাষ্ট্রের মহান স্থপতি বাঙালির বঙ্গবন্ধু বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিব। মহাকালের মহানায়ক ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। রাজনীতির সূচনালগ্ন থেকেই দেশপ্রেমের আদর্শিক চেতনায় পরিপুষ্ট স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় জীবনের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পরিহার করে নিরলস ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর হয়েছেন। দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের কঠিন কালপরিক্রমায় যে সত্যাগ্রহ, নির্লোভ-নির্মোহ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন; তার মূলে ছিল স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতিমুক্ত শোষণহীন মানবিকসমাজ প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত।

বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সাধনা ছিল শোষণহীন সমাজ গঠন, যেখানে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোনো ব্যবধান থাকবে না, যেখানে প্রতিটি মানুষ জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন আহার, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার সুযোগ পাবে। সারাবিশ্বে বাঙালি জাতির স্বাধীন সত্তাকে সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে তিনি চেয়েছিলেন।

আর সেই লক্ষ্যে সারাজীবন ত্যাগ, তিতিক্ষা করেছেন, আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করেছেন। ফাঁসির দড়ি তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি। তাঁর এই আপসহীন সংগ্রামী ভ‚মিকা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য আদর্শস্বরূপ। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুর স্বনির্ভর ও অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার এবং কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের বিশ্বের দরবারে পরিচিত করার সময়।

বঙ্গবন্ধু একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। দেখতেন এ দেশের প্রতিটি মানুষ খেয়ে-পরে থাকবে। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিক্রম করার পরও আমরা সেই স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হইনি সত্য; তবে বর্তমান সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আশা করব, সরকার তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনকে বাস্তবায়ন করতে পারবে। এতে বঙ্গবন্ধুর আত্মাও শান্তি পাবে।

- লেখক: রায়হান আহমেদ তপাদার ,শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ





ads






Loading...