ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু

রুকসানা রহমান
রুকসানা রহমান - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২৩,  আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩:৪২

আমি বাঙালি। বাংলা আমার ভাষা। আমরা বাঙালিরা এখনো বাংলায় কথা বলি। এই ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে হয়েছে রক্তের বিনিময়ে, বিশ্বে যা একটি বিরল ঘটনা। নিজের মুখের ভাষার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে। সংগ্রাম করেই তা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। এই অধিকারের জন্য যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, সেই ইতিহাসও ভাষা শহীদদের পবিত্র টকটকে লাল রক্তে লেখা।

আমার মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় পুরুষের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক নারী বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদেরই একজন ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু। মৃত্যুভয়কে জয় করে বুকের তাজা রক্ত দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েই তিনি রাজপথে নেমেছিলেন। পাকিস্তানি জান্তাদের ছোড়া তপ্ত বুলেটও তার গতিরোধ করতে পারেনি। তিনি এগিয়ে গেছেন বীরদর্পে। ব্যারিকেট ভেঙেছেন। লাঠিচার্জে আহত হয়েছেন। তবুও পশ্চাৎপদ হননি। সফল হয়েছিলেন রওশনারা বাচ্চুরা, জয় হয়েছে বাঙালির। বাংলা ভাষার মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সেই ১৯৫২ সালের কথা। ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু রেখেছিলেন অসীম সাহসী ভূমিকা ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এক বিপুল সংখ্যক নারী সংগ্রামীদের নিয়ে নেমেছিলেন রাজপথে। জান্তাদের বুলেটের আঘাতে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মিছিলে শামিল হয়ে ভেঙেছিলেন পুলিশি ব্যারিকেড। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আহত হয়েছিলেন পুলিশের লাঠিচার্জে এই বীরসেনানী।

অকুতভয় নারী বীরসেনানীকে আমার হারিয়ে ফেললাম সম্প্রতি, গত ৩ ডিসেম্বর ২০১৯, এই বিজয়ের মাসে। শেষ হলো অসীম সাহসী এই সংগ্রামী নারীর জীবন পরিভ্রমণ। ৮৭ বছর বয়সে তার প্রিয় দেশ ও ভাষার মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমালেন ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু। সবার অহংকার ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু।

তিনি অন্যতম নারী জাগরণের প্রতীক। অন্ধকারাচ্ছন্ন নারীদের অনুপ্রেরণা। রক্ষণশীলতার জিঞ্জির ভেঙেছিলেন তিনি। ধর্মান্ধতার রক্তচক্ষু উপেক্ষো করেছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, বুকের তাজা রক্ত দেয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই। এই সংগ্রামী নারীই অনেকের অনুপ্রেরণা। নারীর অন্যতম গর্বের এই প্রতীক ভাষাসৈনিক চিরশায়িত হলেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার নিজ গ্রাম উছলাপাড়ার মাটিতে। মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে রওশন আরা বাচ্চুর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

ভাষাসংগ্রামী নারীর গর্ব সবার শ্রদ্ধাভাজন রওশন আরা বাচ্চু। রক্তের দামে কেনা আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তার ছিল অকৃত্রিম দরদ। বাঙালির এই দেশে বিভিন্ন জায়গায় ইংরেজিতে সাইনবোর্ড দেখলে তিনি খুবই কষ্ট পেতেন। তিনি সবসময় বাংলা ভাষার অবমাননা ও উপেক্ষার বিরুদ্ধে কথা বলতেন। বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাকে ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। অভিষ্যতে এটি সম্ভব হলে এই ভাষাসংগ্রামীর আত্মা শান্তি পাবে।

’৫২ সালে ভাষাসংগ্রামী হিসেবে রওশন আরা বাচ্চু নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন বাংলা ভাষার প্রতি তার দরদের অকৃত্রিমতা। তিনি জীবনের থেকেও ভালোবাসতেন বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাকে। বাংলাভাষার প্রতি তীব্র মমতাবোধের কারণে দীর্ঘকাল ধরে তিনি সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। রওশন আরা বাচ্চু অত্যন্ত সাহসী নারী ছিলেন।

ভাষা আন্দোলন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলা ভাষার প্রশ্নে তিনি সর্বদাই সোচ্চার ছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, শুধু পুরুষই নয়, আন্দোলন-সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণও অত্যাবশ্যক। ’৫২ সালে নারীরা প্রকাশ্যে সভা-সমিতি করতে যেখানে বিব্রতবোধ করতেন। এমনকি বাইরে বেরোতেও ছিল ধর্মীয় নানা বিধিনিষেধ। ছিল ধর্মের অদৃশ্য বেড়াজাল। সেই বেড়াজাল ছিন্ন করে ওই সময়ে তিনি আন্দোলন করেছেন। ভাষা সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে তার নেতৃত্বে ইডেন মহিলা কলেজ এবং বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা সংগঠিত হয়েছিলেন। ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ব্যারিকেড টপকে যারা সামনে অগ্রসর হয়েছিলেন তাদের অগ্রভাগে ছিলেন রওশন আরা বাচ্চু। সেদিন পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জে তিনি আহত হয়েছিলেন। বাংলাভাষা ও বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চুও ততদিন এদেশের মানুষের মাঝে চিরস্মরণীয় হয়েই থাকবেন।

বাঙালী নারীদের গর্ব ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার উছলাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিরোজপুর গার্লস স্কুল থেকে ’৪৭ সালে ম্যাট্রিক ও ’৪৯ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ’৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে অনার্স পাস করেন। ১৯৬৫ সালে বিএড ও ’৭৪ সালে ইতিহাসে এমএ করেন।

‘গণতান্ত্রিক প্রোগ্রেসিভ ফ্রন্টে’ যোগদানের মাধ্যমে রওশন আরা বাচ্চুর ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সেসময় তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও উইমেন স্টুডেন্টস রেসিডেন্সের সদস্য নির্বাচিত হন। রওশন আরা বাচ্চু সর্বশেষ বিএড কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। অবসরে যান ২০০২ সালে।

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় রওশন আরা বাচ্চু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়র ছাত্রী। একুশে ফেব্রুয়ারি যেসব ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে ছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। এই সংগামী নারী ইডেন মহিলা কলেজ ও বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সংগঠিত করে আমতলার সমাবেশস্থলে নিয়ে আসেন।

এখান থেকেই ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভাঙার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তারা ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল নিয়ে এগোনোর চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। ব্যারিকেড টপকানো বেশ কঠিন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে রওশন আরা বাচ্চু তার দলের সবাইকে নিয়ে সেই পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন। পুলিশ নির্বিচার লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ শুরু করলে অনেকে নিহত ও আহত হন। রওশন আরা বাচ্চুও ছিলেন আহতদের একজন।

বাংলা একাডেমি প্রকাশিত মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির রচিত ‘ভাষা আন্দোলন ও নারী’ গ্রন্থে রওশন আরা বাচ্চু একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ‘তখন বেলা ১০/১১টা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী আমতলায় জমায়েত হয়েছে। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্রসভা শুরু হয়েছে। তুমুল বিক্ষোভের মধ্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের তর্কবিতর্ক চলছে। শেষ পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়া হলো।

সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতো ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই স্লোগানে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সাফিয়া আপা, হালিমা আপা ও আমি প্রথম দলে গেটের কাছে আসি এবং প্রত্যেকটি ছাত্রী যাতে মিছিলে যোগ দিতে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টিতে সাহায্য করি এবং তৃতীয় দলের সঙ্গে কর্ডন ভেদ করে মিছিলে যোগ দেই। আপসহীন বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের ধাক্কায় পুলিশের কর্ডন ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ। কাঁদুনে গ্যাস ও লাঠিচার্জের মধ্যেই অ্যাসেম্বলি হলের দিকে ছুটে যাচ্ছিলাম।’

যখন নারীরা বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এই নিগ্রহ মহামারী আকার ধারণ করেছে। ঠিক সেই ক্রান্তিকালে সবাইকে কাঁদিয়ে আমার প্রিয় রওশন আরা বাচ্চু ইহধাম ত্যাগ করলেন। আমি তার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান।

লেখক: রুকসানা রহমান, ব্লগার ও ফ্যামিনিস্ট

মানবকণ্ঠ/আরবি





ads






Loading...