পার্বত্য শান্তিচুক্তি : সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির মাইলফলক

ফনিন্দ্র সরকার 

মানবকণ্ঠ
ফনিন্দ্র সরকার - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:২৯

নিজ নিজ মতে ও সাধনায় নিষ্ঠা বজায় রেখেও পারস্পরিকভাবে মেলবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যায়, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে পার্বত্য শান্তিচুক্তি। রাষ্ট্র পরিকল্পনায় কর্তব্যনিষ্ঠ হতে পারলে সমাজে স্বাভাবিকভাবেই শান্তি বিরাজ করে। তবে শান্তি চুক্তি নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে যা অন্তঃসারশূন্য। পাঠক আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিটা ছিল ভয়ঙ্কর অস্থিরতায় ভরা। নানা ঘটনা পরম্পরায় জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতাসীন হন তখন তিনি রাজনীতিকে রাজনীতিকদের জন্যে জটিল করে দিয়েছিলেন। রাজনীতিতে সম্পদের আধিক্য পেশিশক্তির আবহের ভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, গণতন্ত্রের নির্বাসিত অবস্থানে। বাংলার মানুষ হয়ে উঠেছিল দিশেহারা। স্বৈরশাসক জিয়া নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে যা করা দরকার সেটিই করেছেন। পার্বত্যাঞ্চলকে তিনি সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলেন।

পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে বৈরিতাকে উসকে দিয়েছিলেন পাশাপাশি ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকেও মদত জুগিয়ে যাচ্ছিলেন। পার্বত্যাঞ্চল পরিণত হয়েছিল অস্ত্র ঝনঝনানির এলাকা হিসেবে। জিয়ার শাসনের অবসান ঘটলেও আরেক সেনাশাসক এরশাদ পার্বত্যাঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রাখেননি কিংবা রাখতে চাননি। গণ-আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদের পতন ঘটে। নির্বাচনে জিয়ার দল বিএনপি গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রথমবার ক্ষমতাসীন হয়। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। দেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে এলেও পাহাড়িদের সমস্যা পাহাড়সম হয়ে ওঠে। পাহাড়ি অঞ্চলের উপজাতিরা তাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা বাস্তবায়নে বিপথগামী পথ অনুসরণ করতে থাকে। একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সমস্যাকে কীভাবে সমাধান করতে হয় তা বিএনপির জানা যেমন ছিল না, তেমন এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহও ছিল না অথচ পার্বত্যাঞ্চলের বিশেষ একটি জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান প্রত্যাশা করেছিল গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে। ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ অনুভবের ভেতর দিয়ে তাদের নিজস্ব জীবন ধারার পথ ছিল বন্ধুর।

১৯৭৫-পরবর্তী ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয় ১৯৯৬ সালের জুনের শেষ ভাগে। সব দুয়ার খুলে যায়। দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্যাঞ্চলে যে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করে আসছিল তা সমাধান কল্পে শেখ হাসিনার যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণের অংশ হিসেবে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতপূর্ণ অবস্থানের ইতি ঘটে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। শেখ হাসিনা পার্বত্য শান্তিচুক্তির মতো একটি পদক্ষেপ নিয়ে যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য একটি বিস্ময়কর ঘটনা। চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর পরই পার্বত্যাঞ্চলে যেন শান্তির বন্যা বয়ে যেতে শুরু করে। আজ ২ ডিসেম্বর; ঐতিহাসিক এ শান্তিচুক্তির বয়স ২২ বছর হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকিগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতির মধ্যে কয়েক দফা আলোচনার পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তিটি চার খণ্ডে বিভক্ত। ক, খ, গ, ঘ, এই চার খণ্ডের চুক্তিপত্রে প্রথমটিতে চারটি দ্বিতীয়টিতে পঁয়ত্রিশটি, তৃতীয়টিতে চৌদ্দটি এবং শেষ ‘ঘ, খণ্ডে উনিশটিসহ মোট বাহাত্তরটি ধারা রয়েছে। এসব ধারার ৪৮টি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। ৯টি ধারা বাস্তবায়নাধীন, তবে যা কিছু হয়েছে শেখ হাসিনার শাসনামলে হয়েছে। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণেই শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত হয়েছে। স্থায়ীভাবে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। ৩টি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং নিয়ন্ত্রণাধীন ৩৩টি দফতর বা সংস্থার মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ৩০টি, খাগড়াছড়িতে ৩০টি, বান্দরবানে ২৮টি হস্তান্তর হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর কাছে। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে ভূমি কমিশন।

কথিত শান্তিবাহিনীর সদস্য যারা পার্বত্যাঞ্চলে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে ৭১৫ জনকে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে চাকরি দেয়া হয়। শান্তিচুক্তির পর ২৫২৪ জনের বিরুদ্ধে ৯৯৯টি মামলার তালিকার মধ্যে ৮৪৪টি মামলা যাচাই-বাছাই করে ৭২০টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়। একটি পদাতিক ব্রিগেডসহ ২৩৮ নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংসদে উপনেতার নেতৃত্বে গঠিত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটিও কাজ করে যাচ্ছে।

পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মসৃণ করার লক্ষ্যেই সরকার নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে চুক্তির আলোকে কাজ করে যাচ্ছে। অশান্ত পাহাড়ে দিন পাল্টে গেছে বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ডের জনগণের মূল স্রোতের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে একটা সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, জাতিসত্তাসমূহের ভাষা সংস্কৃতির বিকাশে যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে সেদিকে সরকার নজর রাখছে। ভিশন ২০২১ এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পার্বত্যাঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনার রূপরেখা দেয়া হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলের মানুষের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে সুস্থ চিন্তাধারায় টিকে থাকার দিকনির্দেশনামূলক শান্তিচুক্তিটি ইতিহাসের মাইলফলক।

একটা সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতোই ছিল। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মূল ভূ-খণ্ডের তথা সমতল ভূমির মানুষের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাদের নিজস্ব প্রথা ছিল। রাজা-বাদশারা নানা বাহিনী গড়ে তুলে আলাদা প্রশাসনিক অবকাঠামো তৈরি করে অদ্ভুত এক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। পাহাড়ি উপজাতির অনেক সম্প্রদায়, তাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ছিল চরমে। যা বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার জন্যও ছিল চরম হুমকি। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অশান্ত পাহাড়কে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে একটি শান্তিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক সোনারবাংলা থাকবে না পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে ভেদাভেদ কিন্তু তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। বাংলাদেশ

সেনাবাহিনীর ব্যাপক সমাবেশ ও তদারকিতেও পাহাড় শান্ত হচ্ছিল না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে পাহাড়ি সেনাদের যুদ্ধ ছিল নিয়মিত ঘটনা। সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পরিকল্পনা হাতে নেয়। এর কোনো বিকল্পও ছিল না। পাহাড়ি সশস্ত্র বাহিনীকে তিনি শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মূলস্রোতে নিয়ে আসতেই চুক্তি করেন। যা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন হচ্ছে। অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে পাহাড়ের মানুষ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পূর্বে ছিল ৪১ কি. মি. সড়ক চুক্তির পর তা বেড়ে এখন হয়েছে ১ হাজার ৫৩৫ কি. মিটার সড়ক। তিনটি স্থলবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। তার পরও পাহাড়িদের কতগুলো আঞ্চলিক গ্রুপ রয়েছে এদের পারস্পরিক সংঘর্ষ হয়। এগুলো নিরসনে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছে।

আমরা জানি কোনো বিপ্লব, তা ধর্মীয় সামাজিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে সংঘটিত হয় এক বা একাধিক নেতার নেতৃত্বে এবং তা তৎকালীন অবস্থার প্রেক্ষাপটে। শেখ হাসিনার পার্বত্য শান্তিচুক্তিও একটি বিপ্লব। তিনি ঐক্যবোধের সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ভাবের দ্বারোদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে।

লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads





Loading...