সামাজিক অবক্ষয়ে নৃশংসতা বাড়ছেই

মানবকণ্ঠ
আব্দুল হাই রঞ্জু - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • আব্দুল হাই রঞ্জু
  • ২২ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:০২

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি অন্যতম। প্রতিটি মানুষের কাছে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। অনাকাক্সিক্ষত সন্ত্রাসী হামলায়, সড়ক, লঞ্চ দুর্ঘটনা কিম্বা কথিত বন্দুকযুদ্ধে কেউই মৃত্যুবরণ করতে চান না। আর না চাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশে এখন সবচেয়ে সস্তা হচ্ছে মানুষের জীবন। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়ে সম্ভাবনাময় কতজনকেই না মরতে হচ্ছে। আবার সড়ক পথে দুর্ঘটনাতো মহামারিতে রূপ নিয়েছে। সুস্থ অবস্থায় ঘর থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা তো এখন আর নেই! প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে নিরাপরাধ নিরীহ যাত্রীদের। প্রতিকারের শত চেষ্টাও যেন সফল হচ্ছে না।

আর সফল হবেই বা কি করে? চালক মাত্রই বেপরোয়া। যাত্রী হয়ে যখন বাসে উঠি, তখন অজানা আতঙ্ক অন্যের মতো আমারও থাকে। চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালালে কোনো যাত্রী প্রতিবাদ করলে চালক আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মনে হয়, চালকের কাছে জীবনের তেমন কোনো মূল্য নেই। এর বাইরে তো নানা অজুহাতে মানুষ খুন হচ্ছে যেনতেনভাবেই। ২/৩ বছর আগের ঘটনা- টেইলার্স বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। কেউই এগিয়ে এলেন না। সম্পতি বুয়েটে আবরার হত্যা। নুসরাত, তন্বি হত্যা। মায়ের হাতে সন্তান, আবার সন্তানের হাতে বাবা-মা খুন। মাদরাসা শিক্ষকরা আরো এগিয়ে। একের পর এক জঘণ্য কর্মকাণ্ড তারা ঘটিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের অপকর্ম লুকাতে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের হত্যা করছে। এরকম আরো অনেক মৃত্যু রয়েছে যা আমাদের বথিত করে। দুর্বৃত্তদের হামলার আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা সচরাচরই ঘটছে। তবে কোনো কোনো ঘটনা মানুষকে কঠিনভাবে পীড়া দেয়, যা সহজে মেনে নেয়া যায় না।

অতিসম্প্রতি এখন এক বীভৎস ঘটনা ঘটে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায়। ৫ বছরের শিশু তুহিনকে বাবা আব্দুল বাছির খুনের উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে কোলে তুলে নিয়ে যান। তারপর তুহিনকে খুন করেন চাচা নাছির উদ্দিন। নিজের আদরের সন্তানকে এভাবে খুন করার ঘটনা সচরাচর ঘটে না সত্য, কিন্তু প্রতিবেশি প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিজের সন্তানকে যারা খুন করতে পারে, তারা অমানুষ এবং পশুর চেয়েও অধম। আমরা দেখি পশু-পাখি নিজের সন্তানদের আগলে রাখতে কত চেষ্টায় না করে। আর মানুষ হয়ে কিভাবে নিজের সন্তানকে খুন করতে পারে? যা ভাবতেও অবাক লাগে।

দেশটি যেন অপরাধীদের স্বগরাজ্যে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিনই কতজনই না খুন হচ্ছেন! এমনকি আপনজনদের মধ্যে খুন খারাপির ঘটনা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় দেশের কোথাও না কোথাও মানুষ খুন হয়েছে। জাতির ভবিষ্যৎ শিশুরা আজ যেন কোথাও নিরাপদ নয়। সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র, প্রতারক, মুক্তিপণ আদায়ে শিশুদের জিম্মি করা হচ্ছে। শিশুদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। শিশুধর্ষণ মাত্রাতিরিক্তভাবেই বেড়েই চলছে। এরবাইরে জš§দাতা পিতা ও গর্ভধারিণী মায়ের কোলেও আজ নিষ্পাপ-নিরপরাধ শিশুদের নিরাপত্তা নেই।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসের ১৫ দিনে সারাদেশে ৪৭টি শিশুধর্ষণ, ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির মতে, গত বছর ধর্ষণের শিকার হওয়া মোট ৩৪৫টি সংবাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৩৫৬, যার মধ্যে মারা গেছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন। উক্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিশুরা,আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, প্রতিবেশিদের দ্বারাই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। সূত্র মতে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে এক হাজার ৩০১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে শিশু, প্রতিবন্ধী, গৃহকর্মী ও স্কুল, কলেজের ছাত্রী রয়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে সাড়ে ৯শ’রও বেশি শিশু বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এই হচ্ছে বাস্তবতা। বাস্তবেই আমাদের দেশটি দিনে দিনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। মায়া মমতার ন্যূনতম লেশমাত্র নেই। ফলে প্রতিদিনই খুন, খারাপি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মুক্তিপণ নিয়ে শেষে খুন করা হচ্ছে। এ ধরনের নৃশংস নির্মমতার শিকার হচ্ছে দেশের কমলমতি নিষ্পাপ শিশুরাই। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনা মহামারীতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আইন আদালতও হচ্ছে। শাস্তিও হচ্ছে, কিন্তু ধর্ষণের মাত্রা যেন কমছেই না। মূলত বিচারে ধীর গতি, উপযুক্ত সাক্ষীর অভাব, পুলিশের পক্ষপাতিত্বসহ নানা কারণে ন্যায়বিচারে বিলম্ব হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না।

যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অপরাধীরা আটকের পর কথিত বন্দুকযুদ্ধে চিহ্নিত অনেক সন্ত্রাসীকে মরতে হচ্ছে। তবুও যেন প্রতিকারে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। যদিও বিনা বিচারের মতো হত্যাকাণ্ড সমর্থনযোগ্য নয়, তবুও দেশের নৃশংস কিছু ঘটনায় তাৎক্ষণিক শাস্তি দেখে মনে হয়, উপযুক্ত শাস্তিই হয়েছে। যেহেতু বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডও এক ধরনের অপরাধ, ফলে এক অপরাধের শাস্তি অপরাধ করে প্রতিকার করার পন্থাও সঠিক কোনো পথ নয়; বরং অপরাধপ্রবণতা কমার বদলে শুধুই বাড়ে।

অবক্ষয়ের আর এক বড় কারণ মাদক। মাদকের ছড়াছড়ি এখন সর্বত্রই। মাদকের কবলে পড়ে কতজনই না ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর ছোবলে অসংখ্য পরিবার ধুঁকে ধুঁকে মরছে। আর মাদকের কারণে সমাজটা দিনে দিনে অচেনা হয়ে উঠেছে। মানুষের মধ্যে ভালোবাসার বদলে মনুষ্যত্ববিহীন নরপিশাচের আগ্রাসনই চোখে পড়ে। অথচ মানুষ মানেই মানবিক গুণাবলির অধিকারী। যাদের মধ্যে সহনশীলতা, প্রেম, ভালোবাসা, সমর্মিতা থাকবে। তা নাহলে মানুষ হয় কি করে? এখন কিন্তু সে সবে আর বালাই নেই। মানুষ দিনে দিনে নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ বলতে কিছুই নেই। ফলে নিষ্পাপ শিশুদের ধর্ষণের শিকার হয়ে বিকারগ স্ত হতে হচ্ছে। কোমল বয়সে কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে কত শিশুকেই বেড়ে উঠতে হচ্ছে। আমানবিক এ সমাজটা কি আর বদলাবে না? এমনি হাজার প্রশ্ন বিবেকবানদেরকে ক্লান্ত করে তুলছে।

শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন যে কোন মূল্যে বন্ধ করা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা অনেক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিংবা পেশি শক্তির জোরে ছাড় পেয়ে যায় এমন অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক সময় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। এসব ঘটনা দিনে দিনে এমন আকার ধারণ করছে, তা রোধ করতে না পারলে প্রকৃত অর্থে শিশু ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন বন্ধ করা কঠিন হবে।

অথচআইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ধরনের নির্যাতন বন্ধে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করা উচিৎ। অবশ্য সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এসব অপরাধ রোধ করা না হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পুরোপুরি শিশু ও নারী ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি। উল্লেখ্য চলতি বছরের ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাতকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো। মানুষ হয়ে কিভাবে একজনকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে মারতে পারে? অসম্ভব হলেও এটাই সত্য। এই ঘটনার রূপকার পিতৃতুল্য অধ্যক্ষের ইঙ্গিতেই নির্মম এই ঘটনাটি ঘটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদেই। এই ঘটনায় গোটা দেশেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর ন্যায়বিচারের দাবিতে নুসরাতের পরিবার মামলা করে। প্রায় ৭ মাস বিচারকার্য সম্পাদন করে ২৪ অক্টোবর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে সোনাগাজী মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজদ্দৌলাসহ ১৬ জনকে মৃৃত্যুদণ্ড ও প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়। দণ্ডের সমুদয় অর্থ পাবে নুসরাত জাহান রাফির পরিবার।

সোজা কথা, যা অসম্ভব, তাই এখন এ দেশে সম্ভব হয়ে উঠেছে। এ ধরনের পৈশাচিকতা থেকে দেশটাকে বাঁচাতে না পারলে শান্তির দেখা মেলা বড়ই ভার হবে বৈকি।

লেখক-আব্দুল হাই রঞ্জু: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...