ব্যারিস্টার সুমনদের কাজে আসলেই দেশের কোনো উপকার হয়?

আবদুল্লাহ তাহের

মানবকণ্ঠ
আবদুল্লাহ তাহের - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১১:০৪

লেখাটির বিষয়বস্তু দেখে অনেকেরই চোখ আতকে উঠবে আমি জানি। যেই ব্যারিস্টার দিনের পর দিন ফেসবুক লাইভে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি বা সমস্যা তুলে ধরছেন, দুর্ঘন্ধময় ডাস্টবিনে দাঁড়িয়েও লাইভ করেন তার কাজের উপকারিতে নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলছি? প্রথম দর্শনে হয়তো কেউ ভাববেন চোখের ভুল আবার কেউ বলবেন এটা সুমন সাহেবের প্রতি ইর্ষা থেকে লিখা। তাই একটি বিষয় আগে পরিষ্কার করে নিতে চাই। ব্যারিস্টার সুমনের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা ঈর্ষা নেই।

আমি এখানে একজন ব্যক্তি সুমনকে নিয়ে কথা বলছি না বরং সুমন সাহেবসহ যারাই বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার চটজলদি সমাধান নিয়ে কাজ করছেন আমি তাদের কাজটির পদ্ধতিগত ভুলের কথা বলছি। অনেক পরিশ্রম করে অনেকেই দেশের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত। কিন্তু সেই চেষ্টাগুলো মিউপিয়াক হওয়ার কারণে সমাজ তথা রাষ্ট্রের কোনো কাজে তো আসেই না বরং সেগুলো নেতিবাচক ফল দেয় কিংবা সমস্যার মূলে আঘাত করার পথ রুদ্ধ করে দেয়।

একটি চা বাগানের মালিক শ্রমিকদের জন্য একটি ক্লাব বানিয়ে দিয়েছে যেখানে সন্ধ্যায় জুয়া আর তারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং এটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন তারই নিযুক্ত এক ব্যবস্থাপক। সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর শ্রমিকরা সেখানে জুয়া খেলে আর তারি খেয়ে বিনোদিত হয়। মালিকের এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখবে। তাকে শ্রমিক অন্তঃপ্রাণ এক মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করবে। আপাতদৃষ্টিতে মালিকের এই কাজটি অনেকের কাছেই মহৎ মনে হতেই পারে। কিন্তু জুয়া আর তারি কেন্দ্রিক ক্লাবসেবা কি শ্রমিকদের জন্য আসলেই কল্যাণের? একটু গভীরে গেলে উত্তরটি সহজে পাওয়া যাবে।

চা শ্রমিকরা বরাবরই মালিক পক্ষের শোষণ-নির্যাতনের শিকার হয়। কঠিন পরিশ্রমের বিনিময়ে মাস শেষে যে বেতন তারা পায় তা দিয়ে সংসার চালানো বড় দায়। কিন্তু দিনের পর দিন এমন হতাশা, লাঞ্ছনা, আর বঞ্চনার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা নিয়েও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা নীরবেই সয়ে যায়। কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করার চেষ্টা তারা করে না। এর মূল কারণ দুটি। প্রথমত জুয়া আর তারির নেশা শ্রমিকদের ভেতরে প্রতিবাদী চেতনার অকাল মৃত্যু ঘটায়। দ্বিতীয়ত মালিকেরই নিযুক্ত কিছু সুবিধাভোগী কর্মচারী শ্রমিক কল্যাণের নামে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জাতীয় লোক দেখানো কিছু কাজ করে যা শ্রমিকদের মূল সমস্যা থেকে মনোযোগ অন্যত্র সরিয়ে রাখে।

অনেকের কাছেই ক্লাব কিংবা শ্রমিক কল্যাণের কাজ দুটিকে ভালো উদ্যোগ বলেই মনে হবে। কিন্তু এই দুটি কাজই শ্রমিকদের বড় কিছু পাওয়ার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। শ্রমিকদের মূল সমস্যাগুলোর কথা তারা নিজেরাই ভুলে যায়। সাধারণ শ্রমিকরা তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য, কর্মঘণ্টা কিংবা কর্মপরিবেশ উন্নত করার কোনো দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রাম করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে মালিক লাভবান হচ্ছে ঠিকই কিন্তু সাধারণ শ্রমিকের জীবনমানে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে না।

ব্যারিস্টার সুমনদের কাজের সঙ্গে বাগান মালিকের নিয়োজিত কর্মচারীর করা সে সেবামূলক কাজের অনেকটা মিল আছে। তাদের কাজগুলোর বেশিরভাগই সমস্যার মূলে কুঠারাঘাত না করে ডাল-পালা ছাঁটাই করার মতোই। আমরা জানি মাথাব্যথা কোনো রোগ নয়, একটা উপসর্গ মাত্র যা অনেক কারণেই হতে পারে। তাই মাথাব্যথা সারানোর জন্য পেইনকিলার খাওয়াও রোগের আসল চিকিৎসা নয়। পেইনকিলার খেয়ে ব্যথা সারানোর ফলে রোগী বেশিরভাগ সময়েই মূল রোগের চিকিৎসা করার বিষয়টি ভুলে যায় যা দীর্ঘমেয়াদে তার সমস্যাকে প্রকট করে তোলে। এ কারণেই মাথাব্যথা হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আসল কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা করাতে হয়। আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলোও অনেকটা এরকম।

যে সমস্যাগুলো রাষ্টীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ছাড়া যেগুলোর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় সেই সমস্যার সমাধান করতে হলে নীতির জায়গাতে আঘাত করতে হবে অর্থাৎ রাজনৈতিক সরকারকে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে। সেটা করতে না পারলে জনগণের দৃষ্টিকে বৃত্তের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে পরিধি ধরেই ঘোরানো হবে। ব্যারিস্টার সুমনদের কাজ বেশিরভাগ সময়েই জনগণের দৃষ্টিকে পরিধির মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। এর ফলে তারা যে সমস্যাটি নিয়ে কাজ করেন বা যেটার চটজলদি সমাধান এনে জনগণের বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করেন খোঁজ নিয়ে দেখা যায় সেই সমস্যাটি সাময়িকভাবে সমাধান হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ব্যারিস্টার সাহেব একবার মূলরাস্তায় যত্রতত্রভাবে রাখা একটা ডাস্টবিনের ওপর দাঁড়িয়ে ফেসবুকে লাইভ করেছিলেন। ডাস্টবিনের কারণে জনসাধারণের চলাচলে কষ্ট হচ্ছিল। আসলে ডাস্টবিনটি ওই মূল রাস্তার উপরে থাকারই কথা না। সুমন সাহেবের ওই লাইভ ভিডিও রাতারাতি ভাইরাল হয় এবং কর্তা ব্যক্তিদের টনক নড়ে যার ফলে দ্রুত বিনটি অন্যত্র অপসারিত হয়। কাজটি খুবই চমৎকার সন্দেহ নেই। কিন্তু পুরো শহরটাই যেখানে দুর্গন্ধময় সেখানে ১/২টা ডাস্টবিন সরিয়ে আসলেই কোনো উপকারে আসবে? তা আসেওনি।

সর্বশেষ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাস্টবিনটি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছে। এখানে কর্তারা পেইনকিলার দিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যথা সারিয়েছিল। জনগণও ভেবে নিয়েছে যে সমস্যাটি মিটে গেছে কিংবা তারা ভাবা শুরু করবে যে যথাযথ জায়গায় ডাস্টবিন স্থাপনই বর্জ ব্যবস্থাপনার উপায়। কিন্তু এটা ভুল। দেখুন সুমন সাহেবের আপাতঃ নিষ্পাপ একটি কাজ একদিকে কর্তাব্যক্তিদের রোগ নির্ণয় ও তার প্রতিকার করার ভার থেকে মুক্তি দিল অন্যদিকে জনগণকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান পাওয়া থেকে বঞ্চিত করল। এখানে একটা ডাস্টবিন না সরিয়ে বরং শহরের ময়লা ব্যবস্থাপনার একটা টেকসই পরিকল্পনা তুলে দিয়ে যদি শহর নিগম (সিটি কর্পোরেশন) কর্তৃপক্ষকে যদি বাধ্য করা যেত তবেই সমস্যাটির একটা সমাধান বের হতো।

কখনো ডাস্টবিন, কখনো ভাঙা ব্রিজ, কখনো বা রাস্তায় ঝুলতে থাকা তার নিয়ে লাইভ করে জনগণের বাহবা পাওয়া যায় সত্য। কিন্তু এই বাহবাই কিছুদিনের মাঝে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়। কারণ তারা কখনো সমস্যার মূলে যেতে চান না। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে দুর্বিষহ অব্যবস্থাপনা তার মূল কারণ যে কর্তাদের জবাবদিহিতার অভাব এই সত্যটি নিয়ে তারা কখনো কথা বলেন না পাছে বাগান মালিক বিরাগভাজন হবেন সেই ভয়ে। এভাবে সমাজে সুশীল বা ভালো মানুষ হওয়ার তকমা পাওয়া যায় ঠিক কিন্তু এসব ভালো মানুষরা বরাবরই ক্ষমতাসীনদের (যখন যারাই ক্ষমতায় থাকে) সঙ্গে সামঞ্জস্যের নীতি বজায় রেখেই চলে বলে মোটা দাগে দেশ ও জনগণের স্বার্থে তেমন কিছুই করতে পারে না।

এক্ষেত্রে ভারতবর্ষে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশবিরোধী সেনা অভ্যুত্থানের পর ব্রিটিশরা কিছুটা ভড়কে গিয়েছিল। তারা ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানসে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা না জাগানোর একটা উপায় হিসেবেই ব্রিটিশ আইএস অফিসার হোমেকে দিয়ে জাতীয় কংগ্রেস গঠন করেছিল। কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার। মহান উদ্দেশের আবরণে ঢাকা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার কূটকৌশল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ব্রিটিশদের ওই কৌশল অনেকটা কাজেও দিয়েছিল।

কংগ্রেসেরই অনেক নেতা এমনকি মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী নিজেও ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলেছিলেন বড্ড দেরিতে। এমনকি ১৯১৯ সালের ১০ এপ্রিল সংঘটিত জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার পরেও গান্ধীজি স্বাধীনতার আন্দোলনের বদলে খিলাফত আন্দোলন আর স্বরাজ কর্মসূচি নিয়েই কাজ করেছিলেন। এই আন্দোলনগুলো ছিল অনেকটা ব্রিটিশদের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার নীতি। এমনটিই দাবি করেছেন ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি : ১৯০৫-১৯৪৭’ বইতে।

ব্যারিস্টার সুমনরা যে কাজগুলো করছেন আমি বিশ্বাস করি তারা দেশের জনগণের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই তা করছেন। কিন্তু কোন পথে কাজ করলে সেই মঙ্গল আসবে সেই পথটিও ঠিক করতে হবে। ভুল চিকিৎসা যেমন রোগীকে আরো বেশি বিপদগ্রস্ত করে তোলে তেমনি আমাদের ভালো উদ্দেশে করা কোনো ভুল কাজের মাশুলও জনগণকে দিতে হয় অনেক বেশি। কিন্তু দিন শেষে জনগণের কথাই আমাদের ভাবতে হবে। আমরা কারো ইশারায় জনগণের দৃষ্টিকে কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে টেনে নিয়ে না যাই।

লেখক - আবদুল্লাহ তাহের : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ গণশক্তি আন্দোলন-বিপিএম।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads





Loading...