খেলা যখন জাতীয় পরিচয় তখন সাবধানতা জরুরি

মানবকণ্ঠ
অজয় দাশগুপ্ত - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • অজয় দাশগুপ্ত
  • ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৩৫

ভারতের কাছে ইনিংসে হেরে যাওয়া আমাদের কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে টেস্ট ক্রিকেটে? এদিকে দেখুন সাকিবের মতো ওয়ানডে টেস্ট আর টি টোয়েন্টিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড় এখন শাস্তিতে। আজ খবরে দেখলাম শাহদাতকেও পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা করেনি, করেছে দেশের ক্রিকেট বোর্ড। কেন? জুনিয়র খেলোয়াড়কে পিটিয়েছেন বলে। এর নাম ভদ্র খেলা ক্রিকেট? কী হচ্ছে এসব? এ কি আমাদের জাতীয় অস্থিরতা আর চারিত্র্যের প্রভাব? না এর ভেতরে আছে কোনো ইন্ধন? অথচ দেশের নাম সুনাম বদনাম সব এখন এই খেলার সাথে জড়িয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেও তাকে আর আলাদা করা যাবে না। অথচ আমাদের নামিদামি ক্রিকেটাররা এখন না দিচ্ছেন দায়িত্বশীলতার পরিচয়, না তারা করছেন খেলোয়াড়সুলভ আচরণ।

এখনকার বাংলাদেশ কেমন সেটা জানার জন্য আমাদের ক্রিকেটারদের দেখাই যথেষ্ট। একসময় আমাদের দুধভাত মনে করলেও এখন আমরা সাবালক। এ পর্যন্ত যা ঘটেছে তাতে বড় ছোট সবার মনে ভয় ঢুকিয়ে এবং ভালোবাসা জাগিয়ে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ আর আমাদের যৌবনের বা তারুণ্যের বাংলাদেশ এক কিছু না। আমরাও ক্রিকেট ভালোবাসতাম। খেলতামও। আমাদের উইকেট বা স্টাম্প ছিল না। কাঠ কেটে বানাতাম। আমাদের ভালো কোনো ব্যাট ছিল না। বলও না। আমাদের ছিল শুধু উৎসাহ আর প্রেরণা। তখন সবেমাত্র ডানা মেলছে আমাদের স্বদেশ। কিন্তু তার শাসনে ছিল মিলিটারি জেনারেল। যাদের আরেক নাম একনায়ক।

এরা কিভাবে খেলাধুলা বা জাতির যত্ন নেবে? এদের তো পায়ের তলার মাটিই টলমলে। তাদের না ছিল জনসমর্থন, না কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। খারাপ ভালো যাই বলেন না কেন, রাজনীতি ছাড়া দেশ চলে? না কেউ চালাতে পারে? এসব জেনারেল নিজেদের দেবদূত ফেরেশতা বা মহানায়ক ভাবলেও মূলত এরা ছিল ধূর্ত আর সেনানির্ভর। মানে অস্ত্রনির্ভর। এসব শাসকের আমলে আমাদের দেশে ক্রিকেট খেলতে আসত বিদেশের ক্লাব। তিনদিন দু’দিন এমন সব খেলাকেই আমরা ভাবতাম বিরাট কিছু।

সে সব সময় এখন ইতিহাস। এখন বাংলাদেশ তার নিজস্বতায় উজ্জ্বল। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুলসহ যেসব নেতা এদেশের জন্মলগ্নে কাজ করেছেন, যাঁরা এ দেশের স্বপ্ন দেখেছেন, দেশ স্বাধীন করেছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও জনমনে এমন সংশয় ছিল যে আমরা কি পারব? এমন কথাও শুনতাম বাংলাদেশ কি আসলেই দেশ হিসেবে মাথা তুলে বাঁচতে পারবে? দরিদ্র পিছিয়ে পড়া অভাবী জাতির অপবাদ আজ মুছে গেছে। আর্থিকভাবে সামাজিক উন্নতিতে পাশের দেশকে টেক্কা দিয়ে চলা বাংলাদেশে এখন খেলাধুলাও চলে গেছে আরেক পর্যায়ে।

এ লেখা যখন লিখছি আমাদের দেশের আমাদের সাকিব আল হাসান এখন বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। মনে পড়ে নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঢাকায় এসে তাঁর ভাষণে সাকিবের কথা বলেছিলেন। সাকিব শুধু কি একজন খেলোয়াড়? সে এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দূত। এই যে সম্ভাবনা আর উদ্ভাস এসব কি পাকিস্তানের সাথে থাকলে সম্ভব হতো? তারা তো আমাদের মাঠে পানির বোতল নিয়ে দৌড়ানোতেই রেখে দিত। বড়জোর একজন কাউকে দ্বাদশ ব্যক্তি করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। বুঝতে দিত না আমরা কি পারি আর কি পারি না।

এর নাম সেলফ স্টিম ডাউন করে দেয়া। উঠতে বসতে আপনাকে কেউ দমিয়ে রাখলে আপনি একসময় নিজ থেকেই অকর্মণ্য আর অপদার্থে পরিণত হবেন। বাঙালিকে তাই করতে চেয়েছিল পাকিস্তান। কথায় কথায় ফকির ভিখারি ডাকা আর শারীরিক শক্তির দোহাই দিয়ে ছোট করে রাখার ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। যে কারণে আজ আমরা মাথা তুলতে পারছি। আরো একটা ব্যাপার মনে রাখা দরকার। পাকিস্তান বা শক্তিনির্ভর যে কোনো দলের দিন শেষ। জোশ আর খেলা এক বিষয় নয়। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যে কোনো খেলাই উভয় দেশের জন্য যুদ্ধ। এই স্নায়ুযুদ্ধে পাকিস্তান চলত জোশের ওপর ভর করে। ধীরে ধীরে ভারত সে চাপ মুক্ত হতে পেরেছে বলে গত আটাশ বছর ক্রিকেট বিশ্বকাপে কোনো খেলায় পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে জিততে পারেনি।

পাকিস্তান কি আসলে তেমন কোনো দল যে একবারও জিততে পারে না? পারে। কিন্তু ঐ যে জোশ আর খেলা মানে ধর্মযুদ্ধ, এই মানসিকতা পরিহার করতেই হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে যারা মাতম করেন আমি তাদের দলে নই। আবার যারা বলেন খেলার সাথে রাজনীতি মেশানো ঠিক নয়, আমি তাদের দলেও নই। রাজনীতি কারা মেশায়? আমরা না যারা খেলার নামে পাকিস্তানকে অন্ধ সমর্থন দেয় বা ভারতের জন্য কাঁদে তারা? বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ যে দেশের খেলায় সমর্থকের কেউ কেউ পাকিস্তান বা ভারতের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করে। এই দুর্বলতা পাপ। আমি বাঙালি মুসলমানকে একতরফা দোষ দেব না। তাদের ভেতর যেমন মুষ্টিমেয় মানুষ পাকিস্তান বলতেই দুর্বল তেমনি আমি বাঙালি হিন্দুদেরও দেখেছি ভারতের জার্সি পরে মাঠে খেলা দেখতে যেতে। দুটোই অপরাধ।

এমন কড়া আর অন্ধ সমথর্কের দরকার নাই আমাদের। আমাদের এখন সামনে যাবার সময়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ছাড়া বাকি সব কিছু এখন ভালো। বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম আর মর্যাদা নানা কারণে বাড়ছে। পোশাক, খাবার থেকে নানা বিষয়ে বিদেশের বাজারে সাড়া ফেলেছে আমাদের দেশ। ক্রিকেট সে মর্যাদাকে দিচ্ছে নতুন অভিধা। কিভাবে? বিশ্বের যেসব দেশে ক্রিকেট জনপ্রিয় সেসব দেশেই আমাদের অভিবাসন আর যাতায়াত বেশি। আমাদের সিডনিতে এই সেদিনও বাংলাদেশ কোথায় এটা জানার জন্য এরা বলত, নেক্সট টু ইন্ডিয়া? আমি সবসময় বলতাম নো। ইন্ডিয়া ইজ নেক্সট টু বাংলাদেশ। আজ তাও বলতে হয় না। ওরাই বলে দেবে সাকিবের কান্ট্রি? এভাবেই বড় হয়ে উঠছি আমরা।

অকারণ জোশ আর ক্রিকেট না বুঝে সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানোদের বিষয়ে সাবধান হতে হবে। ভারতের সাথে খেলা শুরুর আগেই এরা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়। আর পাকিস্তানের সাথে খেলা মানেই এরা বলে ঘৃণা করতে হবে। আমি কোনোটাই নিতে পারি না। ভারত পাকিস্তানের সাথে আমাদের বৈরিতা আমরা সমর্থনের বেলায় মনে রাখব। কখনো তাদের সমর্থন না করতেও পারি। কিন্তু প্রমিজিং বাংলাদেশের ক্রিকেটের গায়ে কেন নোংরা আঁচড় লাগতে দেব? খেলোয়াড়দের দেখুন তাদের ভেতর কিন্তু এখন তেমন আক্রোশ নাই। সেদিন দেখলাম ভারতের সঞ্জয় মাঞ্জরেকার আর পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরামের গলায় গলায় ভাব। একজন আরেকজনের সানগ্লাস চোখে লাগিয়ে মশকরা করছে। নানা ধরনের টুর্নামেন্টের কারণে খেলোয়াড়েরাও এখন বন্ধু। আমরাই শুধু ঝগড়া করে মরি।

খেলায় বাদ প্রতিবাদ সমর্থন বিরোধিতা থাকবে। না থাকলে খেলার মজা কোথায়? কিন্তু সেটা যেন রাজনীতি না হয়। না হয় কোনো দেশের প্রতি বিদ্বেষ। এ ধরনের আক্রোশ আর যাই করুক কোনো জাতিকে সবল হতে সাহায্য করে না। আর একটা কথা বলা প্রয়োজন। কেন আউট হলে বা হেরে গেলেই আমরা ধরে নেব ষড়যন্ত্র হচ্ছে? বলছি না তা হয় না। হলে এর যথাযথ জবাব দিতে হবে। অকারণে ঝগড়া করে আর বিদ্বেষ ছড়িয়ে কি সমাধান মিলবে? এ ধরনের প্রক্রিয়া বন্ধুত্ব ভাবমূর্তি আর দেশের সম্মান নষ্ট করে। যে কথাটা বলতে চাই খেলার শক্তি বা আমাদের খেলোয়াড়দের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আগেই বলেছি, জোশ আর উন্মাদনার ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পাকিস্তান আজ চরম সঙ্কটে। আর শুধু শক্তিনির্ভর হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইলের সাথে সাকিব কোনোকালেও পারত না। যে কারণে শক্তির ক্রিকেট নয়, আমরা চাই ক্রিকেটের শক্তি।

ক্রিকেট এখন আমাদের পরিচয়, আমাদের জাতীয় ভাবমূর্তি, আমাদের আন্তর্জাতিক ইমেজ।


লেখক-অজয় দাশগুপ্ত : সিডনি প্রবাসী।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads





Loading...