দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অদৃশ্য সিন্ডিকেট

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • সাহাদাৎ রানা
  • ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৩২,  আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৩৯

বর্তমানে পেঁয়াজ আমাদের কাছে সর্বাধিক আলোচিত বস্তু। আলোচিত হওয়ার কারণ এর সীমাহীন মূল্য বৃদ্ধি। মূল্য এতটাই বেড়েছে যা ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় প্রথমে হয় সেঞ্চুরি। পরে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডাবল সেঞ্চুরিও হয়ে যায়। এখন যেভাবে মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কয়েকদিনের মধ্যে ত্রিপল সেঞ্চুরি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অবশ্য কয়েক জায়গায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ তিনশ’ টাকায় বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। তাই পেঁয়াজ ট্রিপল সেঞ্চুরির উল্লাস করতেই পারে! পেঁয়াজ ট্রিপল সেঞ্চুরির উল্লাস করলেও মানুষের মধ্যে কাজ করছে অস্বস্তি। অস্বস্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা কেউ ভাবেনি। পেঁয়াজের এই মূল্য বৃদ্ধি তাই সবার কাছে কল্পনা মাত্র।

কিন্তু সেই কল্পনাই যেন সত্যি হয়ে ধরা দিয়েছে। আর যারা ক্রেতা তাদের কাছে যেন দুঃসহ স্বপ্ন। এমনিতেই সবসময় সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সমস্যায় থাকেন। এর মধ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পেঁয়াজের এমন ঊর্ধ্বমূল্য সাধারণ মানুষকে ফেলেছে চরম ভোগান্তিতে। যার শেষ কোথায় আসলে এখনও কেউ বলতে পারছে না। অবশ্য আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে চাহিদার বিপরীতে জোগান একদম কম। আর দেশি পেঁয়াজ এখনো বাজারে আসেনি। বিপরীতে ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানিও নেই। তাই এমন অস্থির বাজার। মূলত বাজারে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাদের খেয়াল খুশিমতো দাম বাড়াচ্ছেন।

তবে সবাই পেঁয়াজ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই নিত্য পণ্যের অনেক কিছুর দাম বাড়ছে। যা পেঁয়াজের সীমাহীন মূল্য বৃদ্ধির খবরের মাঝে আড়ালে থেকে যাচ্ছে। অথচ যেসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে নেই যোক্তিক কোনো কারণ। কোনো কারণ ছাড়াই তরতর করে শুধুই বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। আজ এক দামে কোনো একটি পণ্য কিনে নিয়ে গেলে পরদিন দেখা যায় সেই পণ্যের দাম কেজিতে বেড়ে গেছে কয়েক টাকা। এ বিষয়ে দোকানির সহজ ও সেই কমন যুক্তি, চাহিদার চেয়ে পণ্যের জোগান কম। আবহাওয়া খারাপ, এমন যুক্তিও মাঝে মাঝে দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, পাইকারি বাজারের সঙ্গে নেই খুচরা মূল্যের সামঞ্জস্যও।

অথচ দুঃখের বিষয় বাজার থকে সাধারণ ক্রেতা যে দামে পণ্য কিনছেন, উৎপাদক সেই দাম কল্পনাও করতে পারেন না। এর সুফল নিচ্ছেন এক শ্রেণির প্রতারক মধ্যস্বত্বভোগীরা। যারা সাধারণ ক্রেতাদের জিম্মি করছেন, জিম্মি করছে কৃষকদেরও। কিন্তু যারা নিজেদের সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে পণ্য উৎপাদন করছেন, সেই কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্যমূল্য থেকে। এক্ষেত্রে শুধু লাভবান হচ্ছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা। আর ঠকছেন কৃষক ও সাধারণ ক্রেতা। এমন ঘটনা আমাদের জন্য অবশ্য নতুন নয়। সম্প্রতি পেঁয়াজের ইস্যু আমাদের একটু বেশি করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। শুধু তফাৎ এটাই। কয়েকদিন পর দাম কমলে আমরা সবাই নিশ্চুপ হয়ে যাব। যেন কিছুই ঘটেনি।

এখন শুধু পেঁয়াজ নয়, মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার প্রায় সব পণ্যের দামই বাড়ছে। কখনো কখনো তা হয়ে যাচ্ছে লাগামছাড়া। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে সব ধরনের সবজি কেজিতে গড়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। এক্ষেত্রে অবশ্য বিক্রেতারা অজুহাত দেখাচ্ছেন ঘূর্ণিঝড় বুলবুলকে। তবে ক্রেতা মাত্রই জানেন এটা শুধু দাম বৃদ্ধির অজুহাত। সবজির বাইরে আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। সেই ভাতের চালের দামও বাড়ছে কোনো কারণ ছাড়াই। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি চালের দাম তিন থেকে চার টাকা বেড়েছে। এছাড়া নাভিশ্বাস উঠেছে ভোজ্য তেল, মসলা, ডালসহ নিত্যপণ্যের সবকিছুরই দাম বৃদ্ধিতে। পেঁয়াজের ঝাঁজের কাছে তা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহের নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি যেন সবার কাছে সাধারণ ঘটনা। মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ ঘটনা হলেও বিপরীতে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি।

বর্তমান সরকারের উন্নয়নমুখী নানা উদ্যোগের ফলে আমাদের জীবনযাত্রার মান যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে ব্যয় ক্ষমতাও। এটা হয়েছে সময়ের চাহিদার কারণে। কিন্তু সেই চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় হয়নি সেভাবে। এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। প্রধান কারণ হলো, একশ্রেণির আমদানিকারক ও পাইকারী পর্যায়ের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যারা মূলত তাদের স্বার্থের জন্য বাজার কারসাজি করছে। জিম্মি করছে ক্রেতাকে। তবে এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায় এড়াতে পারে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এসব সিন্ডিকেট বন্ধ করা। কিন্তু মন্ত্রণালয় কতটুকু করতে পারছে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

বাস্তবতা হলো সরকারের ইতিবাচক কাজে মানুষের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস রয়েছে তেমনি নিত্যপণ্যের বাজারের নিয়ন্ত্রণহীনতা মানুষকে ফেলেছে চরম অস্বস্তিতে। এখন এই অস্বস্তি সরকারকে দূর করতে হবে। আর সেই স্বস্তি আসতে পারে শুধু বাজারে সরকারের ইতিবাচক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই। অবশ্য এর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যারা বাজার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বগতি রোধে এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বিশেষ করে সবার আগে প্রয়োজন সরকারের স্বদিচ্ছার বাস্তবায়ন। এরপর যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হলো, পণ্য সামগ্রির চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ পণ্যের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে কখনো বাস্তবিক লক্ষ্য পূরণ হবে না।

এর জন্য দেশের সর্বত্র কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আমদানি ও রফতানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদন ব্যবস্থার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া পণ্যবাজারের ওপর সরকারের সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন। যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছেমতো কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধি করতে না পারে। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। বিভিন্ন এলাকা থেকে পণ্যদ্রব্য ঢাকা বা অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার সময় চাঁদাবাজির ঘটনা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব অনিয়মের মধ্যে আঘাত আনতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। উৎপাদন উপকরণগুলোর সরবরাহ, যতটা সম্ভব প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন। কারণ এক্ষেত্রে সর্বত্রই প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা ছাড়া বাজার ব্যবস্থার সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন উৎপাদক কৃষক শ্রেণী। যাদের কেন্দ্র করে কৃষি পণ্য উৎপাদিত হয়। দুঃখের বিষয় এসব ক্ষেত্রে সেই উৎপাদক শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে যে, ব্যবসায়ী ও উৎপাদক শ্রেণি হচ্ছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এদের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে উৎপাদক শ্রেণির মধ্যে আস্তা ফিরিয়ে আনা সবার আগে জরুরি। বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, তারা যে পণ্য উৎপাদন করবেন তার সঠিক ও ন্যায্যমূল্য পাবেন। কোনো সিন্ডিকেটের কাছে তাদের প্রাপ্য মূল্য চলে যাবে না। থাকবেন না জিম্মি হয়ে। আরো একটি বিষয় খুবই জরুরি। সেটা হলো ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। যা আমরা শুধু রমজান মাসেই বেশি দেখি। বাস্তবতা হলো ভেজাল খাদ্যের বিষয়ে যেমন অভিযান প্রয়োজন তেমনি অতিরিক্ত মজুদ ও ইচ্ছেমতো মূল্যবৃদ্ধি রোধেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এখন সরকারকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে। আমদানির ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট একটি কমন বিষয়। অধিকাংশ সময়ে আমাদের দেশে মূলত রাজনৈতিক কারণে আমদানির অনুমতি মেলে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতার কারণে সিন্ডিকেটগুলো বেশি মুনাফালোভী মানসিকতা সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয় এক্ষেত্রে। এখন ওই সিন্ডিকেটগুলো ভাঙার ব্যবস্থা করাই হচ্ছে সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ। কারণ এটা পরিষ্কার আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেট ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাই এসব অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থান গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো একটি নিদিষ্ট সময়ে অভিযান পরিচালনা না করে সারা বছরই অভিযান পরিচালনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তবেই আমরা হয়তো অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্তি পাব। পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এখন সবাই তাকিয়ে আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে। কারণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অন্যায় আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেভাবে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন সবার প্রত্যাশা বাজার সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী সেই একই ভূমিকা গ্রহণ করবেন। সবার মধ্যে এখন একটা বিশ্বাস জন্মেছে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করলেই বাজারে ফিরে আসবে শৃঙ্খলা। যাতে করে বন্ধ হবে বাজারের অদৃশ্য সিন্ডিকেট।

লেখক - সাহাদাৎ রানা : সাংবাদিক।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads





Loading...