প্রসঙ্গ: প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কাঠামো

সাহাদাৎ রানা :
সাহাদাৎ রানা : - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • সাহাদাৎ রানা
  • ১২ নভেম্বর ২০১৯, ১০:০২

ইংরেজি Teacher বাংলা অর্থ শিক্ষক। এই শিক্ষকের ব্যাপ্তি বা বিশালতা অবশ্য আরো অনেক ব্যাপক। Teacher মানে -T-Truthful (সত্যবাদী), E-Educated (শিক্ষিত), A-Active (সক্রিয়), C-Character (চরিত্রবান), H-Honest (mr), E-Energetic (উদ্যোগী), R-Responsible (দায়িত্ববান)। শিক্ষক হচ্ছেন এমন একজন মানুষ যিনি হচ্ছেন সবার থেকে কিছুটা আলাদা।

যিনি সুবিচারক, সুপরীক্ষক, যুক্তিবাদী, গবেষক, উদ্ভাবক, পথ পরিদর্শক, সৎ, সহজ-সরল, নির্মল, অকুতোভয়, সত্যবাদী, সপ্রতিভ ব্যক্তিত্ববান, সমাজ হিতৈষী, পরোপকারী, সমাজ সংস্কারক, চারিত্রিক দৃঢ়তাসম্পন্ন, পরিশ্রমী, নিরপেক্ষ, হাস্যোজ্জ্বল, সুপরামর্শক ও প্রাণবন্ত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী মূলত তিনিই শিক্ষক।

শিক্ষকের সাথে এতসব বিশেষণ যুক্ত হওয়ার কারণ পৃথিবীতে যত পেশা রয়েছে তার মধ্যে শিক্ষকতাকে সবচেয়ে মহৎ ও শ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেননা শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। একজন আদর্শ শিক্ষক ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-নির্বিশেষে সবার কাছেই সবসময় শ্রদ্ধেয়। এ কারণে সব দেশে, সব সমাজেই শিক্ষকরা বিশেষ মর্যাদার আসনে থাকেন।

শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সবার কাছ থেকে পেয়ে থাকেন প্রভ‚ত শ্রদ্ধা ও সম্মান। প্রভ‚ত শ্রদ্ধা ও সম্মান বেশি পাওয়ার মূল কারণ শিক্ষকতাই একমাত্র পেশা, যেখানে পেশাদারি মনোভাবের চেয়ে সেবার দিকটাই বেশি পরিস্ফুটিত হয়। তাই সবাই শিক্ষকতাকে মহৎ পেশা বলেন। যা অন্য কোনো পেশার ক্ষেত্রে বলা হয় না।

এ জন্যই পৃথিবীতে মাতা-পিতার পরেই শিক্ষকদের স্থান দেয়া হয়েছে। সত্যিকার অর্থে শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর, রাষ্ট্রের অভিভাবক। একজন ভালো শিক্ষক একটি ভালো জাতি গঠনে রাখেন অগ্রণী ভ‚মিকা। শিক্ষকরা যদি আলোকিত হন তবে সেই আলোয় আলোকিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। তাই শিক্ষকের কাছে সমাজের প্রত্যাশাও অনেক। তবে শিক্ষকরা সব ক্ষেত্রে সমান মর্যাদা পান না। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকরা অবহেলিত। বিশেষ করে বেতন বৈষম্যের ক্ষেত্রে।

প্রাথমিক শিক্ষার নিজস্ব একটা শক্তি রয়েছে যা শিশুদের সুশিক্ষার ভিত গড়ে দেয়। সেই শক্তির মূল উৎস প্রাথমিক শিক্ষকরা। সেই শিক্ষকদের ছোঁয়ায় সময়ের সঙ্গে শিশুরা যোগ্য নাগরিক হয়ে দেশ গঠনে কার্যকর ভ‚মিকা রাখেন। পৃথিবীর সব দেশে তাই হচ্ছে। আমরাও এর বাইরে নই। বরং বলতে পারি, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর জীবনকে সঠিক লক্ষ্যে চালিত করার প্রথম ও প্রধান ধাপ।

এটাই পরবর্তী শিক্ষার প্রস্তুতি পর্ব। বস্তুত আধুনিক ব্যাখ্যায় এটাই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কেন্দ । আর এই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের কাজটি সুচারুভাবে করে থাকেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। অথচ এসব শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে মর্যাদা ও বেতনের ক্ষেত্রে। শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য সবময়ই একটি আলোচিত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। এবার সেই বেতন বৈষম্য দূরীকণের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাদের মূল দাবি ছিল প্রধান শিক্ষক ১০ম ও সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড-এ বেতন ঘোষণা করার।

শিক্ষকদের বেতন বিষয়ে ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়- ১৯৭৭ সালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককের বেতন ছিল ১৫তম গ্রেড-এ। আর তখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা পেতেন ১৬তম গ্রেড-এ। ১৯৭৭ সালে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের মধ্যে গ্রেড-এর ব্যবধান ছিল এক ধাপ। ২০০৬ সালে বেতন আপগ্রেডের নামে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড-এ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের ১৫তম গ্রেড-এ বেতন নির্ধারণ করা হয়।

এ সময় দুই ধাপ পিছিয়ে দেয়া হয় সহকারী শিক্ষকদের। ফলশ্রুতিতে বেতন-বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। আর ২০১৪ সালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদাসহ ১১তম গ্রেড-এ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয় ১৪তম গ্রেড-এ। বেতন গ্রেড-এর পার্থক্য হয় তিন ধাপ।

তৃতীয় শ্রেণি থেকে প্রধান শিক্ষকরা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হলেও সহকারী শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণির পদেই থেকে যান। পাশাপাশি বেতন আপগ্রেডের সময় মূল বেতনের ব্যবধান হয় এক হাজার ২০০ টাকা এবং ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলে সে ব্যবধান দাঁড়ায় দুই হাজার ৩০০ টাকা। শিক্ষকদের এই দাবি অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সাল থেকে তারা দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি অনুযায়ী সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের জন্য দশম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের জন্য ১১তম গ্রেড। বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এই দাবিতে গত ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক ঐক্য পরিষদ মহাসমাবেশ করে। কিন্তু কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সেই সমাবেশে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষক আহতও হন। শিক্ষকদের ওপর পুলিশের এমন লাঠিচার্জ কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। পরবর্তীতে শিক্ষক নেতারা একটি আল্টিমেটাম দেন। যেখানে বলা হয়েছিল ১৩ নভেম্বর এর পূর্বে প্রধান শিক্ষক ১০ম ও সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড-এ বেতন ঘোষণা না করা হলে, আসন্ন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বর্জন করা হবে।

আশার খবর হলো শিক্ষকরা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। নির্দিষ্ট সময়েই অনুষ্ঠিত হবে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে শিক্ষকরা এই সিদ্ধান্ত নেন। তবে তাদের প্রধান শিক্ষক ১০ম ও সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড-এর দাবির বিষয়ে সরে আসেননি তারা। কেননা শিক্ষকদের দাবি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি।

শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে সমাধান করতে ইতোমধ্যে ৭ নভেম্বর আন্দোলনরত শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের ডিজি। সেই বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেডের প্রস্তাবনা অর্থ মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়েছিল।

কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব ফেরত পাঠিয়ে প্রধান শিক্ষক ১১তম গ্রেড, সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড এবং নতুন সৃষ্ট সহকারী প্রধান শিক্ষক পদের জন্য ১২তম গ্রেড-এর প্রস্তাব দেয়া হয়। যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে জানানো হয়। তবে শিক্ষক নেতৃবৃন্দ অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

পাশাপাশি শর্ত জুড়ে দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে এবং শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বলেন- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি যে গ্রেড-এ বেতন নির্ধারণ করবেন তা শিক্ষকরা মেনে নেবেন। এখন মন্ত্রণালয়ের উচিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষকদের কথা বলার সুযোগ করে দেয়ার।

যেহেতু শিক্ষকরা বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দেবেন তাই তারা মেনে নেবেন। শিক্ষকদের এই বিষয়টির দ্রুত সমাধান হোক এটা সবার প্রত্যাশা। কারণ শিক্ষকদের বঞ্চিত করে কোনো ভাবেই একটি জাতি তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। শিক্ষকরা হচ্ছেন জ্ঞান ও বিদ্যাদাতা। ঘরে ঘরে জ্ঞান-প্রদীপ প্রজ্বলনে তাদের রয়েছে বিশাল ভ‚মিকা। মানুষ গড়ার কারিগররা যদি বেতন বৈষম্যের মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যান তবে কখনো শিক্ষকদের কাছ থেকে সেরাটা পাওয়া সম্ভব নয়। তাই শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর গ্রহণযোগ্য সমাধান জরুরি।
- লেখক : সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...