দুর্নীতির অভিযোগ বনাম উপাচার্যের অপসারণ

নীলাঞ্জন কুমার সাহা
নীলাঞ্জন কুমার সাহা - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ১০ নভেম্বর ২০১৯, ১১:২২,  আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৩২

১৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অধিকতর উন্নয়নের বিশেষ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে বর্তমানে সোচ্চার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাংশ থেকে শুরু করে প্রায় সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার লোকজন।

তাদের একটাই দাবি- ‘ফারজানা ইসলাম তুই কবে যাবি’? এর আগেও কয়েকবার উপাচার্য ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এবং অভিযোগ যাই হোক না কেন, আন্দোলনকারীদের একটাই চাওয়া- ফারজানা ইসলামের উপাচার্য পদ থেকে চলে যাওয়া।

উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গত আড়াই মাস যাবৎ বিক্ষোভ মিছিল, সর্বাত্মক ধর্মঘট, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন অবরোধ এবং পরিশেষে গত ৪ নভেম্বর উপাচার্যের আবাসিক ভবনে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে থাকে। এই অবরোধ কর্মসূচির আগে আন্দোলনকারীরা গত ৩ নভেম্বর মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসেন।

বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি তা হলো- মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনকারীদেরকে উপযুক্ত প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ দাখিলের অনুরোধ করেন এবং অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলেও আন্দোলনকারীদেরকে আশ্বস্ত করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি নিয়ে গত ৬ নভেম্বর সাংবাদিকদের সাথে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মাননীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। তারও আগে আন্দোলনকারীরা খোলা চিঠিতে বিষয়টি মাননীয় আচার্যকে অবহিত করেছেন যা আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার বদৌলতে জানতে পেরেছি। সর্বশেষ গত ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও জাহাঙ্গীরনগরের বিষয়টি নিয়ে উৎকণ্ঠিত এবং আন্দোলনকারীদেরকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করতে বলেন।

তিনি এও বলেন যে, যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয় তবে অবশ্যই দোষীকে শাস্তি দেয়া হবে আর প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীও শাস্তির আওতায় আসবে যদিও আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, যা খুবই অনাকাক্সিক্ষত। আন্দোলনকারীরা বলছেন অভিযোগ প্রমাণের দায় তাদের না কেননা তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে শিক্ষা ও গবেষণা।

গত আড়াই মাস যাবৎ কোনো প্রমাণ না দিয়ে তারা যে জোর জবরদস্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে তখন এই সমস্ত আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গত আড়াই মাসে ক্লাসে, গবেষণায় বা নির্ধারিত প্রশাসনিক কার্যক্রমে কখন অংশগ্রহণ করছে? কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে কোনো ধরনের কার্যকর সেবা নিশ্চিতকরণ ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতি মাস শেষে বিরাট অঙ্কের আর্থিক খরচ বহন করতে হচ্ছে ঠিকই। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আর্থিক খরচ এর অর্থেও কিন্তু জনগণের ট্যাক্সে থেকেই সংগৃহীত তাই, আন্দোলনকারীদের নৈতিকতা নিয়েও এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, আন্দোলনকারীরা যদি বিশ্বাসই করেন যে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতিতে উপাচার্যের সহযোগিতা রয়েছে তাহলে তারা তা সুনির্দিষ্ট আকারে উপযুক্ত প্রমাণসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ উপস্থাপন করছেন না কেন? সুনির্দিষ্ট কোনো ধরনের লিখিত অভিযোগ ছাড়াই আন্দোলনকারীরা গত আড়াই মাস যাবৎ উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে আসছেন যা থেকে বুঝা যায় যে, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণের চেয়ে উপচার্যের অপসারণের দিকেই আন্দোলনকারীরা বেশি মনোযোগী।

প্রশাসনিক ভবন দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। কেননা না, প্রায় সকল শিক্ষার্থীরাই স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে এমনকি একাডেমিক বিল্ডিংগুলোর তালা ভেঙে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় বসছে, যদিও প্রচার মাধ্যমগুলো কোনো অজানা কারণে এ বিষয়গুলো খুব কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে বলেই আমার মনে হয়।

দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে তেমন কোনো সাড়া না পেয়ে এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আলোচনায় উপাচার্য অপসারণের তেমন কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় হয়তো আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবন লাগাতার অবরোধের মাধ্যমে উপাচার্যকে অন্য সকলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পদত্যাগে বাধ্য করাতে চেয়েছিল। বাস্তবে, এই অবরোধের আন্দোলন সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেমন কখনো মেনে নেয়নি আবার অন্যদিকে এই পেশাদার আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে তাদের কিছু করারও ছিল না।

গত ৫ নভেম্বর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও উন্নয়নের পক্ষে ব্যানারে সাধারণ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন আন্দোলনকারীদেরকে অবরোধ কর্মসূচি তুলে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধানের অনুরোধ করেন তখন তারা ওই অনুরোধে কোনো কর্ণপাত করেননি, এমনকি এর আগে শিক্ষক সমিতির অনুরোধও তারা প্রত্যাখ্যান করেন। ঠিক ঐদিন দুপুরে ছাত্রলীগ সমর্থিত কিছু শিক্ষার্থী একটি মিছিল বের করে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি স্লোগানে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনকারীদেরকে তাদের অবরোধ সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ করে।

তখন অনুরোধের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সাথে শিক্ষার্থীরা অবাঞ্ছিত বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে যা কখনোই কাম্য নয় এবং এর জন্য একজন শিক্ষক হিসেবে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত ও মর্মাহত। তবে, এর বেশি দায়ভার ছাত্রলীগ সমর্থিত শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তালেও আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কিছু দায়ভার একেবারেই এড়িয়ে যেতে পারেন না। কেননা, ছাত্র লীগ সমর্থিত হলেও শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অনুরোধে আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে হলেও অবরোধ তুলে নিয়ে পাশে সরে গেলে তেমন কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু তা তারা না করে একটি খারাপ পরিবেশ সৃৃষ্টির আশায় একগুঁয়েমিভাবে জোর জবরদস্তি করে উপাচার্যের বাসভবন অবরুদ্ধ করে রাখে যা কোনোভাবেই নৈতিক বা যৌক্তিক ছিল না।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন শুরু করেছেন এবং আমরা তার সুফল পেতে শুরু করেছি মাত্র। আমরা অনুন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি সত্যি তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রধান বাধা হচ্ছে দুর্নীতি। কাজেই আমাদের সকলের সহযোগিতার মাধ্যমে তা অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে সত্যি যদি কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকে তাহলে আমরা কেউ এর ভাগীদার হতে চাই না, তবে তা অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে।

সত্যিকার অর্থেই উপাচার্য ফারজানা ইসলাম যদি কোনো দুর্নীতি করে থাকেন তাহলে দুর্নীতির ভয়াবহতার বিচার্যে অবশ্যই তার শাস্তি হবে, কিন্তু তা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর। অন্যথায়, আন্দোলন কর্মসূচির নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবন বন্ধ রেখে সাধারণ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক বেতন প্রদান বন্ধ করে আর্থিক কষ্টের দিকে ঠেলে দেয়া, শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষা ব্যাহত করে সেশনজট তীব্র করে তাদেরকে অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করা, কিংবা শিক্ষকদের উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে যাওয়া বিঘ্নিত করে উচ্চ শিক্ষার শেষ সুযোগটি নষ্ট করানো, বিশেষ করে প্রথম বর্ষে নতুন ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা বিঘিœত করে প্রায় ২০ হাজার প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের শঙ্কায় ফেলানো আমাদের কারও কাম্য হতে পারে না।

যৌক্তিক মনে করলে কোনো একটা বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতেই পারেন এবং এটা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই বলে অবরোধ কর্মসূচির নামে জোর জবরদস্তি করে প্রশাসনিক ও শিক্ষা ভবনগুলো বন্ধ করে দিয়ে অন্য সকলের অধিকার বা স্বার্থ বিঘিœত করা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমরা আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থে আন্দোলনকারীরা প্রশাসনের সাথে আলোচনার মাধ্যমে চলমান আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাজকর্ম পরিচালনায় সহায়তা করবেন।

অন্যদিকে আলোচনায় আন্দোলনকারীদের যাতে আস্থা তৈরি হয় সে জন্য প্রশাসনকে অতি শীঘ্র তাদের প্রথম দুটি দাবি বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং একই সাথে শিক্ষার্থীদের অনেক দিনের দাবি জাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। তাছাড়া, উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি ভবিষ্যতে যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য প্রশাসনকে সব সময় আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তবেই, সকলের সহযোগিতায় আমাদের এই প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: ডিন, স্কুল অব বিজনেস, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...