ফ্রিল্যান্সিং ও আউট সোর্সিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম: একটি সমীক্ষা

দৈনিক মানবকণ্ঠ
দৈনিক মানবকণ্ঠ - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৫

কর্মব্যস্ত ব্যাংকের চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের আগে একদণ্ড অবসর, এক দিনের ছুটি- যেন দুর্লভ এক প্রাপ্তি ছিল কিন্তু অবসর গ্রহণের পর বুঝতে শুরু করলাম কর্মহীন জীবন যেন অভিশপ্ত জীবন। তাই অখণ্ড অবসরের এক ঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে লেখালেখি শুরু করলাম। লিখতে গিয়ে দেখি এক্ষেত্রে কম্পিউটার জ্ঞান অপরিহার্য কিন্তু এ বিদ্যা এই বয়সে কোথায়, কীভাবে শেখা যায় এমন ভাবনায় পেয়ে বসল আমাকে।

কেননা আজ থেকে বছর দশেক আগে অফিস যখন অটোমেশনের আওতায় চলে আসে- কম্পিউটার জানা না থাকায় তখন নিজেকে খুব অপাঙ্ক্তেয় মনে হতো। তাই কম্পিউটার শেখার জন্য এলাকার এক ইনস্টিটিউশনে যাতায়াত শুরু করলে সেখানে আমার শিং ভেঙে বাছুরের দলে ভেড়ার মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। তাই শেখায় ক্ষান্ত দিলাম কিন্তু ভেতরের ইচ্ছেটা রয়েই গেল।

একদিন নিজ জেলার ডিসি অফিসের সামনে বিশেষ এক কারণে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাকালীন যে কোনো লেখা/ বিজ্ঞাপন/ বিলবোর্ড/ লিফলেট ইত্যাদি দেখার পুরনো বদভ্যাসবশত বিলবোর্ডে দেখানো এক প্রচারণায় চোখ আটকে গেল। লেখা ছিল ‘জেলা পর্যায়ে আউট সোর্সিং প্রশিক্ষণের সুযোগ। বিলবোর্ডের উপরে এক কোনায় লোগো’ ‘সম্মানজনক আয়ের মাধ্যম ফ্রিল্যান্সিং’।

২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশ সরকারের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কোর্সের কার্যক্রম চলমান আছে। শিখতে চাইলে যোগাযোগ করুন- তথ্য ও প্রযুুক্তি বিভাগ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। দেরি না করে খুঁজে বের করলাম তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের কার্যালয়টি।

সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বেশ অবাক হয়ে যান আমার শেখার আগ্রহ দেখে। আমাকে বসতে দিয়ে বলেন, আমরা তো শেখাতেই চাই কিন্তু উৎসাহী শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। যাই হোক, নামসহ কন্ট্যাক্ট নম্বর রেখে সেদিনের মতো চলে আসি। এর মাস দুয়েক পর প্রাগুক্ত কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে জানালেন আগামীকাল বেলা ৩টায় অফিসে এলে আমার একটা ইন্টারভিউ নেয়া হবে।

তারপর প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হতে পারে। রাজি থাকলে চলে আসুন যথাসময়ে। উল্লিখিত সময়ে যথারীতি হাজির হয়ে দেখি বেশ ভিড়। বুঝতে পারছিলাম না কিসের এত ভিড়। পরে যখন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করি, দেখি তিনি সাক্ষাৎকার নেয়ায় ব্যস্ত। এতদিন পর এবং এত ভিড়ের মধ্যেও তিনি আমাকে ঠিকই মনে রেখেছেন, ঘণ্টাদুয়েক পর তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে বেসিক কম্পিউটার লিটারেসি সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন করলেন।

পরবর্তীতে জানতে পারি আগামীকাল থেকে ১৫ দিনব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং ও আউট সোর্সিংয়ের উপর একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। আমি ইচ্ছে করলে অংশগ্রহণ করতে পারি, না করলে অন্য কাউকে এ সুযোগ দেয়া হবে কিন্তু আমি তাৎক্ষণিক আমার সম্মতি জানালে আমাকে পরদিন সকাল ৯টায় প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য আসতে বলা হলো।

আউট সোর্সিং/ফ্রিল্যান্সিং শব্দদ্বয় শুনেছি ইতোপূর্বে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত কোন ধারণা প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার আগে পর্যন্ত আমার একেবারেই ছিল না। তাই বেশ নার্ভাস বোধ করছিলাম। কম্পিউটার সম্পর্কেই তো তেমন কিছু জানি না তার ওপর প্রশিক্ষণ, তাও আবার ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওপর।

এদিকে যে মাসের ২৭ তারিখে আমার এ প্রশিক্ষণ শুরু হতে যাচ্ছে তার পরের মাসের ৪ তারিখে ১০ বন্ধু ও তাদের পরিবারের সঙ্গে আমি ও আমার পরিবারেরও বুড়িমারী বর্ডার হয়ে জীবনে প্রথম দার্জিলিং, সিকিম ও ভুটান সফরের জন্য দিনক্ষণ ৩-৪ মাস আগে থেকেই পূর্বনির্ধারিত হয়ে আছে, এমনকি আমাদের ট্রাভেল ট্যাক্সও জমা হয়ে গেছে।

ভেবেছিলাম যে বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ, তা তো আমার জন্য খুবই উচ্চতর ধাপের, তাই ভারত যাত্রার আগে ৭-৮ দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে গোপনে রণে ভঙ্গ দিয়ে বিদেশ সফরের মোক্ষম এই সুযোগটা হাতছাড়া করব না কিন্তু প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার পর শেষ মুহূর্তে বন্ধুদের জানিয়ে দিলাম যে, পারিবারিক বিশেষ অসুবিধার কারণে আমার পক্ষে ওদের সঙ্গে যাওয়া সম্ভবপর হচ্ছে না। যা তারা কিছুতেই মেনে নিচ্ছিল না, তবুও আমি প্রশিক্ষণেই রয়ে গেলাম। মান্না দের সেই গানের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় ‘আমার একদিকে শুধু তুমি, পৃথিবী অন্যদিকে, এদিকে একটি প্রদীপ, সূর্যটা ওদিকে-আমি তোমারি দিকটা নিলাম।’

জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রশিক্ষণ পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে দেখি উপস্থিত ২০ প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে আমি ব্যতীত সবাই সর্বোচ্চ পঁচিশের কোঠায়, আরো কুঁকড়ে গেলাম। উদ্বোধনী বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মহোদয় ঘড় মানে না নয় New opportunity Ges End মানে সমাপ্তি নয় Effort never dies উল্লেখ করে শব্দ দুটির ভীষণ প্রাণবন্ত/ আশাব্যঞ্জক বিকল্প অর্থের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন যা আমিসহ সব প্রশিক্ষণার্থীকে উজ্জীবিত করে।

একপর্যায়ে প্রশিক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আমাকে দেখিয়ে বলেন, একজন সিনিয়র সিটিজেন দেখছি? কর্মকর্তা তাকে বলেন, তার আগ্রহের কারণে তাকে মনোনীত করেছি- তখন জেলা প্রশাসক মহোদয় আমার পরিচয় এবং আমার পেশা সম্পর্কে শুনতে চান। আমি তাকে এগুলো জানালে উনি খুব ইম্প্রেস্ড হন এবং অপরাপর প্রশিক্ষণার্থীকে আমাকে মডেল মনে করে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রশিক্ষণের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

প্রথম ২-৩ দিন প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু বুঝতে অসুবিধে হলেও পরে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে। সর্বোপরি প্রশিক্ষকরা যখন আমার আগ্রহ ‘ÔArticle writingÕ ’ জানতে পারেন, তখন তারা আমাকে জানান যে, ফ্রিল্যান্সিং/আউট সোর্সিং মার্কেটে আমার পছন্দের বিষয়ের দর সবচেয়ে বেশি।

তাই আমি এখন প্রচুর পড়াশোনা করছি। আরো সময় লাগবে Article writer হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে। তবে প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া অনেকেই ইতোমধ্যে গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রভৃতির মাধ্যমে উপার্জন শুরু করে দিয়েছেন যা তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে জানতে পারছি।

প্রশিক্ষণে লব্ধ জ্ঞানের আলোকে আমি অনুধাবন করতে পেরেছি যে, ফ্রিল্যান্সিং/ আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে আমাদের দেশে লাখ লাখ তরুণদের জন্য অপার সম্ভাবনাময় মার্কেট রয়েছে। যেখানে কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের শিক্ষার্থীরা ইচ্ছে করলে, একটু তৎপর হলে, লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রতিমাসে সহস্রাধিক ডলার রোজগার করে ফেলতে পারে। এর জন্য যে তাদের যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। বেসিক কম্পিউটার লিটারেসি, একটি পার্সোনাল কম্পিউটার নিদেনপক্ষে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন দিয়েও শুরু করা যেতে পারে এই বিস্তৃত মার্কেটে নিজের উৎকর্ষের বিপণন।

কেননা উন্নত বিশ্বের অধিবাসীদের সময়ের বড় অভাব। বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিস পেপার/গবেষণাপত্রের প্রুফ রিডিং/এডিটিং, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিজনেস কার্ড (আমরা যাকে ভিজিটিং কার্ড বলি), লোগো, ফ্লায়ার, ব্রোশিউর- (কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য-বিধেয়, কর্মপদ্ধতি, ঠিকানা ইত্যাদি সংবলিত একপার্ট/ একাধিক পার্ট বিশিষ্ট হাতে হাতে ছড়িয়ে দেয়া বিজ্ঞাপন), ব্যানার, স্ট্রেট ব্যানার (দোকান বা প্রতিষ্ঠানে একপার্শ্বে দাঁড় করানো যে বিজ্ঞাপন), প্রদত্ত ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভ, সাম্প্রতিক কালের মিউজিক প্রমোশন- (একজন শিল্পীর গান অধিকতর শ্রোতার নিকট পৌঁছানো) ইত্যাদি ফ্রিল্যান্সিং/আউট সোর্সিং জগতের প্রধান কর্ম বিষয়।

বিষয়গুলো সম্পন্ন করতে অনেকের আশঙ্কা হতে পারে নিশ্চয়ই কম্পিউটারে উচ্চতর প্রশিক্ষণ, ইংরেজিতে অগাধ জ্ঞান থাকা জরুরি কিন্তু মোটেই তা নয়। কেবল Article writing ব্যতীত উপরোক্ত কোনো বিষয়ের জন্য ইংরেজিতে পারদর্শী হওয়া জরুরি নয়। যা দরকার, তা হলো, লেগে থাকার মতো নিষ্ঠা। একটু নিষ্ঠা, একটু পরিশ্রম অর্থাৎ কম্পিউটার দিয়ে একনাগাড়ে ২/৩ ঘণ্টা কাজ করার মতো পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকলে ফ্রিল্যান্সিং জগতে নিজেকে ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠিত করা বেশ সহজতর।

প্রকৃতপক্ষে ফ্রিল্যান্সিং/আউট সোর্সিং সম্পর্কিত অনাকাক্সিক্ষত জড়তা ঝেড়ে ফেলা জরুরি। আর তাই মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত উদ্ধৃতিটুকু উল্লেখ না করে পারলাম না ‘If you can’t fly, then run. If you can’t run, then walk. If you can’t walk, then crawl. But whatever you do you have to keep moving forward.’

অতএব, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি অভিভাবকদের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে ফ্রিল্যান্সিং/ আউট সোর্সিং বিষয়ে তরুণদের নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে। সৎ পথে উপার্জনের খুব সহজ একটা মাধ্যম যাতে সর্বোচ্চ ৩ মাসের প্রচেষ্টায় সফলতা অনিবার্য।

- লেখক: এক্স ব্যাংকার, প্রফেসর কলোনি, গাইবান্ধা

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...