সমবায়ে উন্নয়ন, বঙ্গবন্ধুর দর্শন

মিল্টন বিশ্বাস
মিল্টন বিশ্বাস - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৫

২ নভেম্বর ছিল ৪৮তম জাতীয় সমবায় দিবস। ‘সমবায়’ প্রসঙ্গে বারবার কথা বলে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সংবিধানের ১৩নং অনুচ্ছেদে মালিকানার ২য় খাত হিসেবে সমবায়কে স্থান দেন। বঙ্গবন্ধু কৃষি সমবায় সমিতি এবং মৎস্যজীবী সমবায় গঠন করেন। এছাড়া তাঁতি সমবায় সমিতি, শিল্প সমবায় সমিতি, মিল্ক ভিটা গড়ে তোলেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তার সত্যিকারের অর্থ খুঁজে পাবে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদে, আপামর জনসাধারণের ভাগ্যোন্নয়নে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে রূপায়িত হবে সমাজতান্ত্রিক নীতির এবং সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাব সমবায়ের মাধ্যমে।

১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সমবায় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে- এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণমুখী সমবায় আন্দোলনকে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে হবে। কেননা সমবায়ের পথ- সমাজতন্ত্রের পথ, গণতন্ত্রের পথ।

সমবায়ের মাধ্যমে গরিব কৃষকরা যৌথভাবে উৎপাদন-যন্ত্রের মালিকানা লাভ করবে। অন্যদিকে অধিকতর উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্ষুদ্র চাষি গণতান্ত্রিক অংশ ও অধিকার পাবে। জোতদার ধনী চাষির শোষণ থেকে তারা মুক্তি লাভ করবে সমবায়ের সংহত শক্তির দ্বারা।

একইভাবে কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি একজোট হয়ে পুঁজি এবং অন্যান্য উৎপাদনের মাধ্যমে একত্র করতে পারেন তবে আর মধ্যবর্তী ধনিক ব্যবসায়ী-শিল্পপতির গোষ্ঠী তাদের শ্রমের ফসলকে লুট করে খেতে পারবে না। সমবায়ের মাধ্যমে গ্রাম-বাংলায় গড়ে উঠবে ক্ষুদ্র শিল্প যার মালিক হবে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক এবং ভ‚মিহীন নির্যাতিত দুঃখী মানুষ।’

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পরে জাতির পিতার নির্দেশ অনুযায়ী সারাদেশে সমবায়ভিত্তিক নানান কার্যক্রম চালু হয়। গ্রামভিত্তিক কৃষি সমবায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষকদের উচ্চফলনশীল বীজ, কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি এবং গভীর নলক‚প সরবরাহের ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। পাশাপাশি তার উৎসাহে জেলে, তাঁতি প্রভৃতি পেশাভিত্তিক সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে সমবায়ের নতুন যাত্রাপথ তৈরি হয়।

বঙ্গবন্ধুর আমলেই সমস্ত বড় শিল্প, ব্যাংক, পাটকল, চিনিকল, সুতাকল ইত্যাদি জাতীয়করণ করা হয়। জমির সর্বোচ্চ মালিকানার সীমা নির্ধারণ করে দেন তিনি। সমবায় পদ্ধতিতে গ্রামে গ্রামে, থানায়, বন্দরে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয় মেহনতি মানুষের যৌথ মালিকানা। এর ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের বিনিময়ে পাবে ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকরা পাবে শ্রমের ফল- ভোগের ন্যায্য অধিকার।

অর্থাৎ তাঁর আমলে সমবায় আন্দোলন ছিল সাধারণ মানুষের যৌথ আন্দোলন। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। সেসময় সমবায় সংস্থাগুলোকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে পরিচালনা-দায়িত্ব ন্যস্ত হয় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর। সমবায়ের পুরাতন ব্যবস্থা বাতিল করে এমন একটি নতুন ও সুষম ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল।

উপরন্তু শোষণ ও প্রতিক্রিয়াশীল কোটারি স্বার্থকে চিরদিনের জন্য নস্যাৎ করে দেবার প্রত্যয়ে ছিল দৃঢ়তা। সমবায় সংস্থার অবাধ বিকাশ ও সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে দুর্নীতির জগদ্দল পাথরকে সরাতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রশাসন ব্যবস্থাকে দুর্নীতির নাগপাশ থেকে মুক্ত করে জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত করার জন্য ছিলেন বদ্ধপরিকর।

লেখাবাহুল্য, বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ভাষণে প্রস্তাব রেখেছিলেন, ‘গ্রামের প্রত্যেকটি কর্মঠ মানুষ বহুমুখী সমবায়ের সদস্য হবে। যার যার জমি সে-ই চাষ করবে, কিন্তু ফসল ভাগ হবে তিন ভাগেÑ কৃষক, সমবায় ও সরকার।’

এই গ্রামীণ সমবায়কে তিনি নতুন গ্রাম সরকার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাদের হাতেই উন্নয়ন বাজেটের অংশবিশেষ তুলে দেওয়া হবে, ওয়ার্কস প্রোগ্রামও থাকবে তাদের হাতে। তিনি বলেছিলেন, ‘এরা মাথা উঁচু করে দাঁড়ালে একসময় ইউনিয়ন কাউন্সিলের টাউটদের বিদায় দেওয়া হবে।’ গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু যে সমবায়ের কথা বলেছেন, চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কালেকটিভ ফার্মিংয়ের থেকে কিছুটা ভিন্ন হলেও তা সমাজতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা দ্বারা অনুপ্রাণিত।

তিনি কৃষকদের মালিকানাধীন জমি ছিনিয়ে নেয়ার কথা বলেননি। বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব করেছিলেন চাষ হবে যৌথভাবে, আর সে চাষের ফসল সবাই ভোগ করবে। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন, সেই বিশ্বাস থেকেই এই সমবায় ব্যবস্থার প্রস্তাবনা। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু নিজেই সমাজতন্ত্রে তাঁর আনুগত্যের কথা জানিয়ে গেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না।’ তিনি ১৯৭৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেন, ‘বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত- শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ গরিব-দুঃখী বাঙালির মুখে হাসি ফুটানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের ব্রত। তিনি চেয়েছিলেন ‘সুস্থ-সবল-জ্ঞান-চেতনাসমৃদ্ধ-ভেদবৈষম্যহীন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানুষের উন্নত এক বাংলাদেশ।’

১৯৭৫ সালে ‘বাকশালে’র আত্মপ্রকাশ ঘটে; যার মূল লক্ষ্য ছিল একটি শোষণহীন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও শোষিতের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠাকরণ। বঙ্গবন্ধু বাকশালের মাধ্যমে ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য যে চার দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, সেগুলো ছিল- বাধ্যতামূলক বহুমুখী গ্রাম সমবায় গঠন, মধ্যস্বত্বভোগী গ্রামীণ জোতদার, মহাজন, ধনিক-বণিক শ্রেণির উচ্ছেদ, উৎপাদনব্যবস্থা ও উৎপাদন শক্তির বিকাশ সাধন, আমলাতন্ত্রের বিলুপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের ব্যাপক গণতন্ত্রায়ন।

সমাজের কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের জন্য বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন তাঁর কর্মসূচির প্রথম দফা অর্থাৎ ‘বহুমুখী সমবায়’-এর ওপর। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ভাষণটির একটি অংশ আবারও স্মরণীয়- ‘পাঁচ বছরের প্ল্যান- এ বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রাম কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে এই কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু যে বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলো বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে।

পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিলের টাউটদেরকে বিদায় দেয়া হবে। তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে।’ উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থা তথা সমাজের কাঠামোর আমূল রূপান্তরই ছিল বঙ্গবন্ধুর সমবায়-ভাবনার লক্ষ্য।

বঙ্গবন্ধু কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। এ কারণে কৃষিকার্যে জড়িত কৃষককুল উপকৃত ও উৎসাহিত হয়। তিনি গ্রাম্য সমাজভিত্তিক গরিব কৃষকদের সহযোগিতার জন্য সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রায় ২২ লাখের বেশি কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসন করেন তিনি। বাজেটে কৃষি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থাও ছিল।

শোষিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে ছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু ভ‚মি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে জারিকৃত ভ‚মিস্বত্ব আদেশে পরিবারপিছু সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা সিলিং আরোপিত হয়। যদিও সেই আদেশ বাস্তবায়ন করা ছিল কঠিন। আসলে ভ‚মি সংস্কারের বদলে সমবায়ভিত্তিক যৌথ চাষের যে প্রস্তাব তিনি করেন, তা ছিল অধিক বাস্তবসম্মত।

বঙ্গবন্ধু শুধু যে যৌথ চাষাবাদের প্রস্তাব রাখেন তা-ই নয়, তিনি পুরো গ্রামকে একটি সমবায়ী ব্যবস্থাপনার অধীনে আনার কথা ভেবেছিলেন। এ কথার অর্থ, গ্রামের যাবতীয় সম্পদ- তার জমি, ফসল ও পানি-এর ব্যবস্থাপনায় থাকবে গ্রামের মানুষের যৌথ ভ‚মিকা। গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে যে বাড়তি আয় হবে, তার সুষম ব্যবহার ও বণ্টনের জন্য বঙ্গবন্ধু একটি ‘গ্রাম তহবিলের’ কথা ভেবেছিলেন। এই তহবিলের আয় আসবে উৎপাদিত ফসলের একাংশ থেকে, বাকিটা আসবে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ থেকে।

বঙ্গবন্ধুর এই সমবায়ী গ্রামের প্রস্তাবটি এখনো প্রাসঙ্গিক। কারণ গ্রামের ক্ষমতায়নের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে গ্রামকে একটি সমবায়ী ইউনিটে পরিবর্তিত করে তাকে গণপ্রশাসনের প্রথম স্তর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই সমবায়ী গ্রাম নিজেই যদি একটি তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ইউনিট হয়ে ওঠে, তাহলে কায়েমী স্বার্থপরদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তাছাড়া গ্রামের মানুষ এককাট্টা হলে দুষ্টলোকদের ঠেকানো কঠিন নয়।

বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শ ধারণ করেই শেখ হাসিনা সরকার গ্রামকে উন্নয়নের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ‘একটি খামার, একটি বাড়ি’র মতো প্রকল্প সার্বিক গ্রাম উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ গ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সম্পৃক্ত হয়েছে ‘সমবায় চেতনা’র সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে যে উন্নয়নের কার্যধারা এগিয়ে চলেছে সেখানে জাতীয় সমবায় দিবসের গুরুত্ব সকলেই অনুধাবন করতে সক্ষম।

আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে দাঁড়ানোর জন্য এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সমবায় দিবস বারবারই আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। সব মিলে আমরা বলতে পারি, সমবায় ভিত্তিক কার্যক্রম, অব্যাহত প্রশিক্ষণ ও সমবায় আন্দোলন সম্পর্কিত গবেষণার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে সমবায় দিবসের তাৎপর্য। কারণ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘সমবায়’ সত্যিকারের জনগণের প্রতিষ্ঠান।

- লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দফতর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...