আইন হয়েছে: সড়ক কি নিরাপদ হবে?

মীর আব্দুল আলীম :
মীর আব্দুল আলীম : - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • মীর আব্দুল আলীম
  • ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:১৫

সড়ক নিরাপদ করতে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৯’ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ১ নভেম্বর ২০১৯ থেকে। খুশি লাগছে মনে। সড়ক নিরাপদ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। নানা এখলাছ উদ্দিন, ভগ্নিপতি ইমাম হোসেন, ছোট বোন শারমিনসহ হাজারো মানুষকে হারিয়ে বড় মনোকষ্টে আছি। বড় কোনো দুর্ঘটনায় সরকার মহলের হুঙ্কার শুনে তৃপ্ত হই এই ভেবে যে, এই বুঝি সড়ক নিরাপদ হচ্ছে।

যেদিন আইনটি কার্যকর হলো ঠিক সেদিনই খোদ রাজধানী ঢাকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আইন ভাঙতে দেখে আশাহত হয়েছি। আসলে বহু বছর ধরে দেখছি নিরাপদ সড়কের জন্য হাজারো হুঙ্কার আন্দোলন, ধর্মঘট, মিছিল, সমাবেশ কতকিছুই না হয়; সড়ক আর নিরাপদ হয় না। ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৯’ বাস্তবে কতটা প্রতিফলন ঘটাবে? মনে প্রশ্ন জাগে, আদৌ কি খুনে সড়ক আমাদের জন্য নিরাপদ হবে? থামবে কি সড়কে মৃত্যুর মিছিল?

‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৯’ আশা জাগানিয়া। এ আইন হচ্ছে জেনে মনে বড় আশা জাগে; তবে মনে জোর পাই কম। আমাদের কত কিছুর জন্যই তো আইন আছে, প্রয়োগ হয় ক’টার? এদেশে কঠোর খাদ্য আইন আছে তবুও প্রায় খাবারেই তো বিষ মেশানো থাকে। নারীর প্রতি সহিংসতার আইন আছে কিন্তু এদেশের নারীরা কতটা নিরাপদ? আমাদের নারী অনিরাপদ হয়ে, ধর্ষিত হয়ে, খুন হয়ে যাওয়ার পর নুসরাতের মতো ক’টা ঘটনার বিচার হয় এদেশে। সড়ক আইন ছিল আগেও, এখনো আছে। প্রয়োগ হয় কি?। নয়া আইনের প্রয়োগ নিয়েও মনে প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারে। তবুও আশা করতে দোষ কোথায়?

আশার বাসা বেঁধে না হয় নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন দেখলামই আমরা। একেবারে আশা ছেড়ে দেয়া যাবে না কিন্তু। যা ভাবিনি তা তো হচ্ছে দেশে। সড়কে সড়কে ফ্লাইওভার, সড়ক, মহাসড়ক, মেট্রোরেল, স্বপ্নের পদ্মা সেতু সবই তো দেখতে হচ্ছে। নতুন করে জানলাম সামনের বছর ২০২০ সাল থেকে নাকি আমাদের শিশুরা নতুন বইয়ের সঙ্গে টাকা পাবে। বয়স্ক মানুষ, দরিদ্র মানুষ, বিধবারা ভাতা পাচ্ছে। একদিন আমরা দেশের সব নাগরিক হয়তো ভাতার আওতায় আসব, ফ্রি চিকিৎসা পাব-এমন স্বপ্ন এখন দেখতেই পারি।

ভাবি সব কিছুই তো হচ্ছে। অসভ্য খুনে সড়ক কি আদৌ নিরাপদ হবে? মনে বড় সংশয়। সড়ক কি ঠিকই নিরাপদ হবে? কিছু কিছু ঘটনায় দেখেছি প্রধানমন্ত্রী নাড়া দিলে সব নড়েচড়ে ওঠে। তিনি দৃষ্টি দিলে সব কিছু সহজে হয়ে যায়। তিনি যখন কক্সবাজারে সমুদ্রে পা ভিজিয়ে ছিলেন তখন ‘সমুদ্র জলে প্রধানমন্ত্রীর পা: পর্যটনের কিছু একটা হবে?’ এই শিরোনামে কলাম লিখেছিলাম। সেখানে কিছু একটা হচ্ছে এখন।

কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাজে হাত নিয়েছে সরকার। কাজ চলছে। সমুদ্রের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও হচ্ছে। পতেঙ্গা সি-বিচ ইতোমধ্যে দর্শনীয় হয়েছে, আরো হবে। এমনি করে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নজর দিলে আমাদের সড়ক নিরাপদ হবে। প্লিজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি সড়ক নিয়ে হুঙ্কার দিন; গর্জে উঠুন। আপনার তর্জন-গর্জনে আমাদের সড়ক একদিন নিরাপদ হবেই হবে।

এদেশের সড়ক নিরাপদ হওয়া খুব জরুরি। খুন-খারাবির চেয়ে সড়কেই মানুষ মরছে বেশি। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে, আহত হয়ে পঙ্গু হচ্ছে শত শত মানুষ। সড়কে আইন না মানা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ এবং অবৈধ ড্রাইভার গাড়ি চালাতে গিয়ে হরহামেশাই দুর্ঘটনায় পড়ছে। সম্প্রতি উচ্চ আদালত ফিটনেসবিহীন গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ না করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতের সেই নির্দেশ মানা হচ্ছে না।

মোটরসাইকেলে হেলমেট না থাকলে জ্বালানি তেল না দেয়ার নির্দেশ ছিল পেট্রল পাম্পগুলোর প্রতি। আমরা লক্ষ্য করেছি সে নির্দেশ মানা হচ্ছে। তাই মোটরসাইকেল আরোহীরা হেলমেট পরে গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। কাজেই পরিবহনের ক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে জ্বালানি না দেয়ার বিষয়টি মনে হয় জনস্বার্থে মেনে নেয়া দরকার এবং মেনে নিলে মানুষ উপকৃত হবে। আমাদের পরিবহনগুলো ঠিকঠাক থাকবে পরিপাটি হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। আদৌ হবে কিনা তা ভাবছি। এর আগে সড়ক নিরাপদ না হওয়ার ব্যাপারে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে দোষা হতো। এখন তিনি নেই তাহলে কার শক্তিতে পরিবহন সেক্টর মালিক-শ্রমিকরা সড়ক আইন অমান্য করছেন।

এভাবে চললে আইন করে কোনো কাজেই আসবে না। আইন যেন পাকাপোক্ত করতে হবে, আইন মানতে হবে, আইন মানাতে হবে, আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। তবেই সড়ক নিরাপদ হবে। আসলে আমরা বলছি অনেক, করছি কম। সব হচ্ছে কিন্তু কিছুই হচ্ছে না আইন প্রয়োগ না হওয়ার কারণে।

এরশাদ সরকারের আমলে সড়ক দুর্ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলে সরকার গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে। এতে চালকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু ঘটলে চালককে নরহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করার বিধান রাখা হয় কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে পড়ে তা রহিত করতে বাধ্য হয় সরকার।

দায়ী চালকদের শাস্তি না হওয়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, লাইসেন্সবিহীন ও অদক্ষ চালক কর্তৃক গাড়ি চালানো, আনফিট গাড়ি রাস্তায় চালানো, সড়ক যোগাযোগে অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে এদেশে সড়ক দুর্ঘটনা মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত চালকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর উদাহরণ খুব অনুজ্জ্বল। সব ক্ষেত্রেই দায়ী চালকরা পার পেয়ে গেছে।

সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেছে ৩৪ হাজার ৯১৮ জন। প্রতি বছর মারা যায় ৩ হাজার ৪৯১ জন। থানায় মামলা হয়েছে এমন দুর্ঘটনার হিসাব নিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে দায়িত্বশীলদের তরফে। বেসরকারি হিসাবে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে ২০ হাজার ৩৪ জন। প্রতিদিন গড়ে মারা যাচ্ছে প্রায় ৫৫ জন।

সরকারি তথ্য ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান থাকার কারণ হলো, দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ৬৭ ধরনের প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। এ ঝামেলার কারণে অনেক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টি যথাযথভাবে রেকর্ডভুক্ত হয় না। পুলিশের দেয়া তথ্যানুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২ হাজার ১৪০ জন।

মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে ১ হাজার ১৮৬ এবং সামান্য আহত হয়েছে ১৫৭ জন। অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজার ৭৪৮টি। মারা গেছে ৫২ হাজার ৬৮৪ জন। আহত ও পঙ্গু হয়েছে আরো কয়েক হাজার মানুষ।

২০১৯ সালে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এশিয়া, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার ১৫টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার নেপালে বেশি, দ্বিতীয় বাংলাদেশে। সবচেয়ে কম হার যুক্তরাজ্যে। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের দুর্ঘটনায় নেপালে মারা যায় ৬৩ জন এবং বাংলাদেশে ৬০ জন। যুক্তরাজ্যে এ হার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ।

সড়ক দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতির সাম্প্রতিক এক গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় ফি বছর ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদহানি হয়। এই হার দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৯৫ শতাংশের সমান। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় শতকরা ৫০ ভাগ বেশি। অন্য এক গবেষণা জরিপ থেকে জানা যায়, ৪৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী যাত্রীবাহী বাস, ৩৭ শতাংশ দায়ী ট্রাক। দেশে সন্ত্রাস দমনে যদি বিশেষ বাহিনী গঠন করা যায়, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এ জাতীয় বাহিনী গঠন করা হচ্ছে না কেন? জানমাল রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম মূল কারণ। সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ২. গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ৩. অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন, ৪. ট্রাফিক আইন না মানা, ৫. সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা, ৬. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা এবং ৭. অরক্ষিত রেললাইন।

কথা হলো, যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয় তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবার প্রচেষ্টায় এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির নিরসন করতেই হবে। এভাবে চলতে পারে না।

এভাবে মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যেতে পারে না। পঙ্গুত্বের মতো দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়ে মানুষ জীবন কাটাতে পারে না। কারণগুলো যেহেতু চিহ্নিত সেহেতু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দুরূহ হবে কেন? দুর্ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, ঘটবেও।

কেন তা রোধ করা যাচ্ছে না? আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এসব রুখতে হবে? যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তবে তা মেনে নেয়া আরো কঠিন। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়। আমরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিক, সচেতন, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভ‚মিকা আশা করি।
- লেখক- সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...