এভাবে চললে অর্জন বর্জন হয়ে পড়বে

অজয় দাশগুপ্ত :
অজয় দাশগুপ্ত : - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • অজয় দাশগুপ্ত
  • ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:০৬

শেখ হাসিনার অর্জন ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। সব ধরনের অপচেষ্টা দেখছি। ছাত্রদের না পারলে ফেসবুকে উত্তেজনা। সংঘাত চললে এদের লাভ। দাঙ্গা বাধাতে পারলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের লোভ বিএনপির। সাথে জামায়াতীরা। লীগ মুখে যাই বলুক সামাল দিতে পারছে না।

তাই অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ। যেখানে যাচ্ছি মুখে মুখে এক কথা। এভাবে কি চলে? একটার পর একটা ঘটনা আর দুর্ঘটনায় দেশ বারবার এমন এক জায়গায় চলে যায়, মনে হয় সঙ্কটের সমাধান নাই। উত্তাল হয়ে ওঠে পরিবেশ। তারপর কিছুদিন উত্তেজনা আর হৈ চৈ। আবার সব ভুলে যায় মানুষ। জীবনযাপন যেখানে জরুরি সেখানে কোনো বিপদই বড় না।

এবার বুয়েট নিয়ে চরম উত্তেজনায় দেশ। আবরার নামের যে ছেলেটিকে খুন করা হয়েছে তা নিয়ে যে চরম অস্থিরতা আর তার ভেতর নানা বিপদ ওঁৎ পেতে আছে। এটা মানতেই হবে এমন মৃত্যু হত্যা ছাড়া আর কিছু না। এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত। ভিডিও ফুটেজসহ নানা প্রমাণে এটা পরিষ্কার হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল একদল ছাত্র। যারা তার সহপাঠী। যারা তার সিনিয়র কিংবা সতীর্থ। এটা ভয়াবহ।

আবরারকে কেন হত্যা করা হয়েছে তার একটা মোটামুটি ছবি পাওয়া গেছে। বাহ্যত ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও মানতে হবে একমাত্র কারণ এটা হতে পারে না। বোঝা যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ আর খুনের নেশা এখন একাকার। বুয়েটসহ দেশের সব বিদ্যাপীঠে র‌্যাগিং মারামারি খুনোখুনি নিত্য নৈমিত্তিক। যার বিহিত করা প্রশাসনের দায়িত্বের পর্যায়ে পড়লেও তা করা হয় না। সবাই এসব জানেন। এগুলো না বলে আমরা বরং ছাত্র রাজনীতি নিয়ে কথা বললেই সমাধানের দিকে এগোতে পারব।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না বলা পর্যন্ত কোনো কাজ হয় না। এমন এক পরিবেশ কাকে কদিনের রিমান্ডে নেয়া হবে বা কাকে জামিন দেয়া হবে না হবে সে জন্যও তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা হয়। এটা কেমন রীতি? তিনি কেন সব বিষয়ে বলবেন? তাঁর কি সে সময় বা সুযোগ আছে? আজ বাংলাদেশ যে জায়গায় সেখানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিধি নীতি বাণিজ্য এগুলো ঠিক করাই যেখানে মুখ্য সেখানে দেশের ভেতরকার ছোট ছোট সমস্যাও শেখ হাসিনার নির্দেশ ছাড়া সমাধান বা নিষ্পত্তির মুখ দেখে না।

এই নির্ভরতা কি প্রমাণ করে? গণতন্ত্র কি তা বলে? না গণতন্ত্রের প্রমাণ আছে এতে? এটা তো তাঁর ওপর বাড়তি দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া। সংবাদ সম্মেলনে তিনি যে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন তার কোনো তুলনা নাই। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, কিসের ছাত্রলীগ? কিসের দল? এমন করে এদেশে কোনো প্রধানমন্ত্রী কবে বলতে পেরেছেন? এটা তাঁর উদারতা। কিন্তু আমরা এদেশে জন্ম নেয়া বড় হওয়া মানুষ। সব দেখেছি। এর আগের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বেলায়ও এমন ছিল। সব একপেশে। পার্থক্য এই তিনি এমন কঠিন আত্মসমালোচনা করতে জানতেন না। তারপরও দেখছি এক ধরনের রাজনীতির মূল টার্গেট শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনীতি। সে কথা বিশদ বলার আগে ছাত্র রাজনীতির কথা বলি।

ছাত্র রাজনীতির গর্ব বা অহঙ্কার নামের যা যা ছিল তা আজ কাহিনী। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত না অনুচিত এ নিয়ে যারা তর্ক করেন তাদের বলি, একাত্তর আর আজকের বাংলাদেশ এক? নাকি একটি পরাধীন জাতির ছাত্র সমাজ ও স্বাধীন দেশের ছাত্র সমাজ এক? কোনোটাই মিলবে না। সে সময়ও কি ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িতরা আসলেই ছাত্র ছিলেন? না তাদের বয়সসীমা ঠিক ছিল? সবচেয়ে বড় কথা যদি আমরা মনে করি গাছের নামে ফলে বা ফলেন পরিচয়তে তাহলে একটা প্রশ্ন করা যৌক্তিক।

আ স ম রব, সিরাজুল আলম খান, শাজাহান সিরাজ, মাহমুদুর রহমান মান্না কোন বৃক্ষের ফল? কেন তাদের নিয়ে আজ আমাদের শঙ্কা আর চিন্তায় থাকতে হয়? আওয়ামী ছাত্রলীগের প্রডাক্ট ও কি উদাহরণ যোগ্য কিছু? ছাত্র রাজনীতি কেবল মাত্র ঝলসে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে এমন কি যুদ্ধের সময়ও তাদের ভ‚মিকা ছিল তর্কময়। যে কারণে এদেশের নীতিবান নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে পড়তে হয়েছিল বিপদে।

আমরা এসব ভুলে যাই। ভুলে যাই এদেশে সামরিক সরকার এসে প্রথম ছাত্রদের বারোটা বাজানোর জন্য হিজবুল বাহারে প্রমোদ ভ্রমণে পাঠিয়েছিল। আদর্শ আর ন্যায়ের পায়ে কুড়াল মারার শুরু জেনারেল জিয়ার আমলে। তারপর এরশাদ আমলে শুরু হয়েছিল কেনা বেচা। নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের অভি নীরু বাবলুকে আপনি কিভাবে ভুলে যাবেন? কিভাবে ভুলবেন ঢাকায় একের পর এক হত্যা দেশব্যাপী ছাত্রদের চরিত্র ধ্বংসের অপরাজনীতি?

আজ যে ছাত্রলীগ তার সাথে ছাত্রদলের হুবহু মিল। যারা এখন তাদের চরিত্র হনন করছে তারাই আবার সুযোগ পেলে অন্য দলের হয়ে এমনটা করবে। তবে এখন সবকিছু ছাপিয়ে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য মানুষকে অসহায় আর অনিরাপদ করে ফেলেছে। নামধারী হোক আর যাই হোক লাশ ফেলার রাজনীতি করে তারা মাহমুদুর রহমান মান্না ও খোকার এজেন্ডাকেই সামনে নিয়ে আসছে।

দেশের আর সব জায়গায় যখন তিলে তিলে মানুষ উন্নতি আর ভালো থাকার সংগ াম করছে তখন ছাত্র রাজনীতির নামে চলছে মহা লুটপাট। সে অমিত সাহা হোক আর যেই হোক, তাদের লোভ লালসা নিয়ম না মানার কারণেই এই পরিবেশ। এই নারকীয় বাস্তবতা। তোপের মুখে থাকা ভিসিকে নিয়ে মজা লোটা যায় কিন্তু সমাধান পাওয়া যাবে না। ভিসি নাম বা পদবি এখন ঘৃণার পর্যায়ে চলে গেছে। কেন? কারণ এই পদে এখন মেধা বা যোগ্যতা আসল বিষয় না। চাই লবিং। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এদিকে নজর দিতেই হবে। সিন্ডিকেটমুখী অধ্যাপক সাদা দল, নীল দল থাকলে ছাত্ররা কেন নানা দলে বিভক্ত হবে না?

আবরার হত্যাকাণ্ডে কতগুলো বিষয় পরিষ্কার। সরকার প্রধান পপুলার হলেও সরকার না। এরপর আছে মন্ত্রী নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা। তারা কি পুতুল? তারা সব বিষয়ে হয়তো নীরব, নয়তো লাগামছাড়া। এবারের ঘটনায় এটাও প্রমাণিত দেশে এমন এক শক্তি বড় হয়ে গেছে যাদের মোকাবিলা করা না গেলে বাংলাদেশের মূল পরিচয় ও অর্জন মাথা নিচু করে পালাতে বাধ্য হবে। আপনি যদি ছাত্র ছাত্রীদের প্রতিবাদের ভাষা খেয়াল করেন বুঝবেন তারা কাদের দ্বারা পরিচালিত।

মূল ঘটনা থেকে সরিয়ে তাদের হাতে যে প্ল্যাকাড ধরিয়ে দেয়া হয়েছে তা ভয়ঙ্কর। তাদের ভাষা কেন বলবে এদেশে শুধু একজনের বাবার হত্যার বিচার হয়েছে আর কারো বাবা বিচার পায় না? এটা কি সত্য? আমি বারবার বলি আওয়ামী লীগের অর্জন নষ্ট করার জন্য দুশমনের দরকার পড়ে না। মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর যে কৌশল তা সহজেই লুফে নিতে পারে অন্যরা।

ভারত হিন্দু পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধ এই বিষয়গুলো আগুন নিয়ে খেলার মতো ভয়ঙ্কর। আর তা করার জন্য এখন বাঙালি মুসলমানের দরকার পড়ে না। ভট্টাচার্য বাবুরাই আছে মাঠে। এই পরিবর্তন ও অমিত সাহাই প্রমাণ করে এদেশে সংখ্যাগুরু নামে পরিচিত মুসলমানরাই আছেন ঘোর বিপদে। তাদের পাশের দেশে যাবার সুযোগ নাই। পালানোরও রাস্তা নাই।

আবরার হত্যার বিচার না হলে আগের ঘটনাগুলো যেমন বুদ্বুদ আকারে ফিরে আসবে তেমনি বারবার নতুন আবরার ঘটনা রোধ করা যাবে না। বলব, দায়ী ছাত্রলীগসহ সব রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ড আপাতত বন্ধ করা হোক। জাতীয় মতামত জাতির সব রাজনৈতিক ধারাকে একত্রিত করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে রূপরেখা ঠিক হোক। তারপর খুলে দেয়া যেতে পারে ছাত্র রাজনীতি।

যা টেন্ডার দালালি গুণ্ডামি মস্তানি হত্যা র‌্যাগিং ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না, তাকে জিইয়ে রেখে যাদের লাভ তারাই গডফাদার। জনগণ ফুঁসছে। নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস। শান্তির ললিত বাণীতে কাজ হবে না। চাই সঠিক ব্যবস্থা। আর একটি মৃত্যুও নয়। নয় ভিসি নিয়ে বাড়াবাড়ি। ভিসিদের বাড়াবাড়িও বন্ধ হোক।
- লেখক: সিডনি প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...