খেলোয়াড় ধর্মঘট বিসিবিকে কতটা বদলাবে?

আব্দুল্লাহ তাহের :
আব্দুল্লাহ তাহের : - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৪৩

দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর বাংলাদেশ ক্রিকেট আবারো খেলোয়াড়দের ধর্মঘট দেখল। ১১ (শেষ দিকে আরো দুই দফা যুক্ত করে মোট ১৩ দফা করা হয়) দফা দাবিতে বর্তমান জাতীয় দলের খেলোয়াড়সহ প্রথম শ্রেণির সব ক্রিকেটার খেলা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিসিবির কাছে এটা অনেকটা ইনিংসের প্রথম বলেই বডি লাইনে বাউন্সার মারার মতোই ছিল।

ক্রিজে থাকা বিসিবি সভাপতি বাউন্সারে ডাক না করে ছক্কা হাঁকানোর চেষ্টায় উড়িয়ে মেরেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে তিনি ছক্কার বদলে আউট হয়ে গেলেন। অর্থাৎ খেলোয়াড়দের সব দাবি তিনি মেনে নিয়েছেন। অথচ প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মিডিয়ার কাছে তিনি খেলোয়াড়দের একপ্রকার ধুয়েই দিয়েছিলেন। খেলোয়াড়দের ধর্মঘটকে বিসিবি সভাপতি পাত্তা না দিয়ে সেই বহুল কথিত ও চর্চিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজছিলেন।

তার ক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল আলোচনার কোনো সুযোগ না রেখে সরাসরি ধর্মঘটে যাওয়া। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে তার ক্ষোভকে যৌক্তিক মনে হতেই পারে। কারণ যেকোনো দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য ধর্মঘট হলো একটা চূড়ান্ত পদক্ষেপ। খেলোয়াড়রা হুট করেই সেই চূড়ান্ত ধাপে চলে গেছে। কিন্তু আসলেই কি তারা হুট করে গেছে? নাকি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের হঠাৎ বিস্ফোরণ এটি? বিসিবি এবং ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট সবাই একবাক্যে খেলোয়াড়দের দাবিগুলোকে যৌক্তিক বলেছেন এবং কোনো কালক্ষেপণ না করে সব দাবি মেনে নেয়াতে খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের যথার্থতাই প্রমাণ করে।

কিন্তু খেলোয়াড়দের এই সমস্যাগুলো তো একদিনে তৈরি হয়নি। এর আগে ২০১৩ সালে খেলোয়াড়রা আরেকবার বিসিবির সাথে আলোচনায় বসেছিল। তখনই বিসিবি সভাপতি খেলোয়াড়দের সমস্যাগুলো এড্রেস করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ৬ বছরেও তার সুরাহা না হওয়াতে খেলোয়াড়দের অল আউট খেলা ছাড়া উপায় ছিল না। যাই হোক, বিসিবি দাবি মেনে নেয়াতে আপাতত স্বস্তি। ইতোমধ্যে ভারত সফরে গেছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল।

প্রথম খেলায় তারা ভারতের বিরুদ্ধে অভাবনীয় জয়ও পেয়েছেন। সুতরাং ক্রিকেট তার সূচি অনুযায়ী চলবে এমনটি আশা করাই যায়। এখন দেখার বিষয় এই ধর্মঘট বিসিবিকে কতটা বদলাতে পারে।

বিসিবি বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতে সবচেয়ে ধনী বোর্ড। পাশাপাশি আয়ের দিক থেকে ক্রিকেট বিশ্বেরও ধনী বোর্ডের একটি। কিন্তু টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার প্রায় ২১ বছর পরেও অবকাঠামোর দিক থেকে এখনো উন্নয়নশীলের কাতারেই রয়ে গেছে। বোর্ড পরিচালনায় অপেশাদারিত্বের ছাপ পড়তে পরতে। বিসিবির কাছে ঘরোয়া টুর্নামেন্টের কোনো বার্ষিক সূচি নাই।

একমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচি ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটের নির্দিষ্ট কোনো ক্যালেন্ডার বিসিবি কখনোই দিতে পারেনি। অপেশাদারিত্বের ছাপ দেখা যায় সর্বশেষ বিপিএল আয়োজন নিয়েও। ফ্রাঞ্চাইজিগুলোর সাথে মেয়াদ শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে যখন ফ্রাঞ্চাইজিগুলো নতুন চুক্তি করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং খেলোয়াড় ভিড়ানোর কাজও শুরু করে দিয়েছিল ঠিক তখন বিসিবি জানাল যে, এইবারের আইপিএল তারা নিজেরাই করবে।

অথচ বোর্ডে বেতনভুক্ত সিইও রয়েছেন। একটি চুক্তি শেষ হওয়ার বেশ আগেই বিসিবির চুক্তির পরের ধাপ নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়ার কথা। এভাবে প্রতিটা ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি না মেনে এডহক ভিত্তিতে কাজ চালিয়ে আসছে বিসিবি। সর্বশেষ খেলোয়াড়দের ধর্মঘটের জবাবে বিসিবির প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতির প্রতিক্রিয়ায় ছিল চরম অপেশাদারিত্বের ছাপ। তিনি কিছু খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ও টেনে এনেছিলেন। এভাবে অপেশাদার মনোবৃত্তি ও কাজ দিয়ে বোর্ড পরিচালনা করলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটের দিকে বিসিবির মনোযোগ কোনোকালেই ছিল না। আর তা ছিল না বলেই জাতীয় দলের রিজার্ভে ভালোমানে খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুবই সীমিত। বর্তমান জাতীয় দলের ‘পঞ্চপাণ্ডব’- মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, তামিম, রিয়াদ অবসরের পর তাদের যোগ্য কোনো উত্তরসূরি এখনো তৈরি হয়নি। এই পাঁচ তারকার অবসরের পর জাতীয় দলের অবস্থা কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। মাশরাফি টেস্ট খেলা বাদ দিয়েছেন অনেক আগেই।

যেকোনো সময় ওয়ানডে থেকেও অবসর নেবেন। অথচ আজ পর্যন্ত এক মোস্তাফিজ ছাড়া সমীহ জাগানোর মতো কোনো পেসার বের হয়ে আসেননি। ২১ বছরের টেস্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে এখনো ৫ম দিনে খেলা টেনে নেয়াতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এমনকি নবজাতক আফগানিস্তানের সঙ্গে হারের লজ্জা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। বিসিবি খুব সহজেই দাবি করতে পারে যে তারা জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করেছেন। কথা সত্য।

কিন্তু জাতীয় দলে কতজন খেলোয়াড়ই বা খেলে? একজন খেলোয়াড়ের ভিত্তি তৈরি হয় ঘরোয়া টুর্নামেন্ট খেলে। জাতীয় দলে গিয়ে মৌলিক কিছু শিখার সুযোগ থাকার কথা না। তাই খেলোয়াড়রা যদি উন্নত পিচ ও বলে প্রথম শ্রেণির বিশেষ করে ৪/৫ দিনের ম্যাচ পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলার সুযোগ না পায় তাদের টেস্ট খেলার সামর্থ্য কখনো বাড়বে না। আর শুধু জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করলেই হবে না। প্রতিটি বিভাগ ও জেলা পর্যায়েও ক্রিকেটের অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

আগে জাতীয় দলসহ অনেক খেলোয়াড়ের আয়ের একটা বড় উৎস ছিল ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ। কিন্তু বিসিবির বদান্যতায় সেটি এখন অনিয়মিত আর আকর্ষণহীন হয়ে পড়েছে। একদিনের আন্তর্জাতিক আর টি-টোয়েন্টি ম্যাচের দিকেই বিসিবির মনোযোগ। তার কারণটাও সহজে অনুমেয়। এখানে টাকা আছে। আছে মিডিয়ায় নিজেদের জাহির করার সুযোগ।

এ কারণে বিসিবির কর্তারা ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলো দায়সারাভাবে চালিয়ে দেয়। না থাকে ভালো বল, না থাকে পিচ। আর পাতানো খেলার অভিযোগ তো অনেক পুরনো। বিসিবির পরিচালকদের অনেকেই বেশ কিছু ক্লাবের মালিক। তাই এখানে স্বার্থের দ্ব›দ্ব কখনো কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। খেলোয়াড়দের সংগঠন কোয়াবের দুই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিই বিসিবির পরিচালক।

পরিচালনা বোর্ডে থেকে তারা খেলোয়াড়দের পক্ষে কিভাবে বিসিবির সাথে দেন দরবার করবেন? তারা সেটা করতেও পারেননি। ভালো আম্পায়ারিং ক্রিকেটের মান বাড়াতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। কিন্তু বিসিবি ভালো আম্পায়ারদের খেলায় টানার জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। অবসরে যাওয়াকালীন আম্পায়ারদের যেতে হয় শূন্য হাতে। দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পর তার জন্য কোনো অবসরকালীন ভাতা বা পেনশন জাতীয় কিছু না রাখাটা অবশ্যই অমানবিক।

বিসিবি খেলোয়াড়দের ১১ দফা দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় ক্রিকেট পারা আপাতত ঠাণ্ডা। আমরা আশা করব এই দফাগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো চাতুর্যের আশ্রয় নেয়া হবে না। দ্রুততম সময়ে তা বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হবে বিসিবি এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিসিবিকে ভুলে গেলে চলবে না যে একটি খেলার জনপ্রিয়তা নির্ভর করে সেই খেলায় জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারফর্মেন্সের ওপর।

নিম্নমুখী পারফর্মেন্স সেই খেলার জনপ্রিয়তায় ভাটার টান আনতে বাধ্য। ৯০ দশকের তুমুল জনপ্রিয় ফুটবল এখনো দর্শক খরায় ভুগছে এই কারণেই। বিসিবি যদি শুধুই স্বল্পমেয়াদে টাকা কামানোর কথা ভাবতে থাকে তবে তাদেরও ফুটবলের পরিণতিই মেনে নিতে হবে। এখন সময় এসেছে নতুন করে শুরু করার। এই ধর্মঘটকে একটি ‘ওয়েক আপ’ কল হিসাবে ধরে নিয়ে পরিচালকগণ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারিত্বের সঙ্গে বোর্ড পরিচালনা করলে তা ক্রিকেট এবং দেশ দুইয়ের জন্যই মঙ্গল।

-লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ গণশক্তি আন্দোলন-বিপিএম

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...