দণ্ডের চেয়ে নিরাপদ সড়কই মুখ্য

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৩৭,  আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৪৭

৭৯ বছরের পুরনো আইনের জাল ছিঁড়ে বহুল আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এখন চলমান। চালক ও পথচারী উভয়ের জন্য কঠোর বিধান যুক্ত করে এটি কার্যকর হয়েছে পহেলা নভেম্বর থেকে। হুট করে নয়, আইনটির একটি পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে। গত বছর ঢাকার দুই কলেজ শিক্ষার্থী সড়কে বাস চাপায় প্রাণ হারানোর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন বাংলাদেশে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

সেই আন্দোলনের মুখে গত ১৯ সেপ্টেম্বর পাস হয় আইনটি। সেদিন অনেকটা তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে পাস হয় আইনটি। গেজেট হয় ওই বছরের ৮ অক্টোবর। এর ১১ মাস পর গত ২৩ অক্টোবর আইনের গেজেট প্রকাশ করা হয়। গেজেটে বলা হয়েছিল, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ১-এর উপধারা (২)-এ দেয়া ক্ষমতাবলে সরকার ১ নভেম্বরে কার্যকর হবে।

সেটি কার্যকর হলো ১৪ মাস পর যথা তারিখেই। পক্ষে-বিপক্ষে কথাবার্তার পাশাপাশি আইনটি মানা-না মানা এবং তা মিলে রকমফের নিয়েও কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। নতুন আইনটির কিছু বিধান উল্লেখ করার মতো। এতে সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিতের বিধানও রয়েছে। আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেয়ার নির্দেশ দিতে পারবে। দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা প্রাণহানি হলে চালকের শাস্তি দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান বা গণপরিবহন চালানোর দায়ে ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার এবং প্রদর্শন করলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।

ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে। ট্রাফিক সংকেত মেনে না চললে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

একজন চালক প্রতিবার আইন অমান্য করলে তার পয়েন্ট বিয়োগ হবে এবং এক পর্যায়ে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। গণপরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া, দাবি বা আদায় করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্সে পেতে হলে চালককে অষ্টম শ্রেণি পাস এবং চালকের সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে।

আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন ছিল না। গাড়ি চালানোর জন্য বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। এই বিধান ছিল আগেও। এছাড়া সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে রয়েছে এক মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান। আইনে শান্তি বাড়ানো নিয়ে কিছু বিরোধিতা রয়েছে। ইস্যুটি নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তি বাড়ানোর বিরোধিতা করে আইনটি নমনীয় করার দাবি তার। পরিবহন শ্রমিকদের কাছে তিনি বাদশা-সম্রাট, শাহেন শাহ। গরু-ছাগল চিনলেই চলবে- ড্রাইভিংয়ের জন্য এ যোগ্যতাই যথেষ্ট, এমন মন্তব্য করে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে সমালোচিত হয়েছেন। প্রশংসিত হয়েছেন ড্রাইভার-হেলপারসহ বিশেষ মহলে।

তার যুক্তি হচ্ছে: সব মামলায় ৩০২ ধারা (মৃত্যুদণ্ড) রাখা হলে ড্রাইভারকে যাবজ্জীবন দিলে তার পরিবারের কী অবস্থা হবে? তাছাড়া আমাদের দেশে এমনিতেই লাখ লাখ ড্রাইভার কম আছে। জামিনযোগ্য শাস্তি না হলে ড্রাইভারের সংকট আরো বাড়বে। কিছু ওজর-আপত্তির পরও নতুন সড়ক পরিবহন আইনকে স্বাগত জানিয়েছে এ সেক্টরের বৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। তারা এর কিছু ধারার পরিবর্তন চায়।

কার্যকর না হলেও, আইন না থাকার চেয়ে থাকা ভালো বলে অনেকের অভিমত। যে কারণে আইনটিকে মন্দের ভালো বলতে চান কেউ কেউ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ ব্যক্তির প্রাণহানি হচ্ছে। আর বাংলাদেশ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২,০০০ মানুষ নিহত ও ৩৫,০০০ আহত হন।

সরকারের হিসাবেই গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৫ হাজার ৫২৬ মানুষ। আহত হয়েছে ১৯ হাজার ৭৬৩ জন। এ হিসাবে প্রতি বছর গড়ে আড়াই হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। গত ১২ জুন জাতীয় সংসদে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের এ পরিসংখ্যান দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। তবে বেসরকারি হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত চার বছরেই (২০১৫-১৮) সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৯ হাজারের বেশি মানুষ। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর যে পরিমাণ মানুষের মৃত্যু ঘটে, আহতের পরিমাণ দাঁড়ায় এর তিন গুণ। স্বভাবতই পঙ্গু মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের আহাজারিতে দেশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

এক জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অপরিণামদর্শী, অদক্ষ, মাদকসেবী চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোই দায়ী। এর হাজারো প্রমাণ জরিপে উঠে এসেছে। তারপরও দীর্ঘকাল ধরে এসব বেপরোয়া চালকের গাড়ির নিচে জীবন দিতে হচ্ছে অনেককেই। বলা হয়ে থাকে, পরিবহন খাত সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। এ নিয়ে দেশের মানুষ সোচ্চার হলেও সিন্ডিকেটের কারণে অতীতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।

এই পটভ‚মিতে নতুন এই আইন সড়কেশৃঙ্খলা ফেরাতে কিছুটা ভ‚মিকা রাখবে- এমন আশা তো করাই যায়। এর চেয়েও জরুরি হচ্ছে আইনের কার্যকরিতা। সড়ক বা যে আইনই হোক মামলা দায়ের থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রিতা এবং সাক্ষ্য গ্রহণে জটিলতা মীমাংসা করা না গেলে আইন সুফলের চেয়ে কুফলই দেয়। তাই প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নজরদারিও জরুরি। আমাদের দেশে ‘আইন আছে প্রয়োগ নেই’ এই আপ্তবাক্য যেন বয়ে বেড়াতে না হয়। নইলে নিরাপদ সড়ক নিয়ে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার আকুতি ঘুরপাক খাবে আইনের ফাঁপরেই।

নতুন আইনটি কাগজ-কলমে চালু হলেও সরকার বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বেশ শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে। আইন ভাঙ্গলেও পুলিশ কাগজপত্র দেখে একটু-আধটু হেদায়েত করে ছেড়ে দিচ্ছে। পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর একটা জবাব দিয়েছেন। জানিয়েছেন, কার্যকরের প্রথম সাতদিন নতুন আইনে কোনো মামলা হবে না। এই সময়ে কেবল সতর্কতা ও প্রচারণা চালানো হবে।

সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের পেছনে অবশ্যই একটা উদ্দেশ্য রয়েছে। পর্যায়ক্রমে নতুন আইন সহনীয় মাত্রায় প্রয়োগ শুরু করতে চায় সরকার। এর আগে প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য অর্থাৎ সার্জেন্টদের আইনটি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণার দরকার রয়েছে। তাদের অনেকের এখনো সম্যক ধারণা হয়নি। ট্রাফিকের পজ মেশিনসহ অন্য বিষয়গুলোর মিল রয়েছে আগের আইনের সঙ্গে। নতুন আইন বাস্তবায়ন হলেও মেশিনগুলো আপডেট হয়নি। তাই কোনো মামলা হলেও তা কাগজে করতে হচ্ছে। পরিবহন চালক ও সহকারী এবং পথচারীরাও অনেকটা অন্ধকারে।

আগের চেয়ে কঠোর এই আইন বাস্তবায়নের জন্য আরো প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সড়ক-মহাসড়কের বছরের পর বছর ধরে চলে আনা অনিয়ম-নৈরাজ্য রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে-এমনটি আশা করা যায় না। আইনটি টেকসইভাবে কার্যকর করার উদ্যোগের কিছু ঘাটতিও রয়েছে। অনেক জায়গায় জেব্রা ক্রসিংয়ের চিহ্ন মুছে গেছে। অনেক জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ নেই।

তাই সামগ্রিক এ বাস্তবতায় আইনটির বাস্তবায়ন কঠিন। অবকাঠামোগত ত্রুটিগুলো দ্রুত সারানো জরুরি। সে সঙ্গে যাদের জন্য আইন অর্থাৎ পথচারী, যানবাহনের চালক ও হেলপারদের মোটিভেশন করা উচিত। যা শুরু করা উচিত ছিল আরো আগেই। এ ধরনের বিলম্ব বা ধীরগতি কখনো কখনো উল্টো ফল দিতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্ন বোধও জাগতে পারে কাগুজে বাঘ হয়ে থাকা অন্য কিছু আইনের মতো। আইনের সার্থকতাটা তখনই হবে যখন মানুষকে ভয় দেখানোর দরকার হবে না। এছাড়া এ আইনটির উদ্দেশ্যে ভিন্নতা রয়েছে। কাউকে ধরা-বাঁধা, দণ্ডিত করা আইনটির মূল উদ্দেশ্য নয়। আসল উদ্দেশ্য সড়ককে নিরাপদ করা। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

- লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...