বাড়ছে ধূমপায়ী নারীর সংখ্যা

শাপলা রহমান
শাপলা রহমান - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ১০:২০,  আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ১০:২৫

এক সময় ৬০-এর দশকের নায়ক-নায়িকাদের বিবেচনা করা হতো ফ্যাশন আইকন হিসেবে। মনে করা হতো, সমাজ-সংস্কৃতিতে যত নতুন কিছুর সংযোজন, তাদের হাত দিয়ে প্রবেশ করেছে। ৬০-এর দশকের ভারতীয় বাংলা বা হলিউডি সিনেমার নায়কদের পাশাপাশি নায়িকাদের ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেটের দৃশ্য গোটা সিনেমা হলের পরিবেশটা পাল্টে দিত।

আহা কি সাহসী সব ব্যাপার! সে সব দৃশ্য দেখে আমাদের দেশের স্কুল, কলেজগামী নারীরাও চাইত আগল ভাঙতে। তখনকার লিজেন্টদের কথা বলা, শাড়ি পরার স্টাইল, চুল বাঁধা, কাজল পরা চোখের সাজ সব কিছুতেই থাকত মাদকতার ছোঁয়া। মাঝখানে চার দশকের অধিক সময় পেরিয়ে গেছে। সেই ৬০-এর দশকের নায়িকাদের অনুকরণে চলা পোশাক-আশাকে পরিবর্তন এসেছে অনেকবার।

কিন্তু নারীদের মুখে থাকা সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন আজো নেভেনি। বরং দিনকে দিন তা বেড়েই চলেছে। সিগারেট কোম্পানিগুলো নায়ক-নায়িকাদের ইমেজ কাজে লাগিয়ে আধুনিকতার ধুয়ো তুলে সেদিন যে ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল এখন তার পরিধিরও বিস্তার ঘটিয়েছে অনেক। তাদের চটকদার বিজ্ঞাপন আর অভিনব কৌশলের কাছে পুরুষের পাশাপাশি হেরে গেছে এদেশের সাধারণ নারীর বাস্তবতা বোধ।

বোধশূন্য মানুষগুলো ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়েছে। আনন্দ-বেদনার সঙ্গী ভাবতে শুরু করা সিগারেট বা তামাক পণ্য তাদের ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে মরণের দিকে। সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই যেন! নেই কোনো সচেতনতা বোধ। বলছি নারী ধূমপায়ীদের কথা। দেশে নারীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। দ্য টোব্যাকো এটলাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা চার কোটি ১৩ লাখ, যার ২৩ শতাংশ বা দুই কোটি ১৯ লাখ ধূমপায়ী।

বিশ্বে নারী ধূমপায়ীদের সংখ্যা কম নয়। ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুসারে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন নারী সিগারেটে আসক্ত। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এর প্রতিবেদনে সিনিয়র গবেষক ডক্টর ইমানুয়েলা গাকিডোওর মতে, ‘বিশ্বে প্রতি চারজনে একজন ধূমপান করছে। অকালে মৃত্যুর প্রধান একটি কারণ ধূমপান।

ক্রোয়েশিয়া ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ ধূমপানের জন্য অন্যতম একটি দেশ। নারী ধূমপায়ীদের সংখ্যা কম মনে হলেও অবাক করা বিষয় হলো নারী ধূমপায়ীর তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশ শীর্ষস্থান দখল করে আছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া। নারী ধূমপায়ীদের সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের ২২টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

২২টি দেশকে নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে ক্রোয়েশিয়া উইক জানায়, বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি ধূমপান করেন। আর এ ধূমপায়ী নারীদের মধ্যে ২৪ শতাংই শিক্ষার্থী। টিনএজারদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে চাকরিজীবীরাও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ জাতীয় য²া নিরোধ সমিতি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, দেশে মোট নারীর দুই কোটিরও কিছু বেশি ধূমপানে আসক্ত।

এদিকে, দ্য টোব্যাকো এটলাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৫.৭ শতাংশ নারী তামাক ব্যবহারের কারণে মারা যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের প্রবণতা নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এখানে ২৭.২ শতাংশ বা ২ কাটি ৫৯ লাখ মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোবাকো কন্ট্রোল ২০০৩ সালে প্রণীত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোবাকো কন্ট্রোল চুক্তিতে বাংলাদেশ ছিল প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ। ২০০৪ সালে অনুস্বাক্ষরের পরেও বাংলাদেশ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০৫ মোতাবেক ২০০৬ সালে নীতি প্রণীত হয়।

পূর্ববতী আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এ আইনে ধোঁয়াবিহীন তামাক দ্রব্য সম্পর্ক কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য যেমন- গুল, জর্দা এবং খৈনী যা অধিকাংশ মানুষ সেবন করে সে সব সম্পর্কে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ ছিল না। ২০১৩ সালে নতুন আইন ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (২০১৩ সালের সংশোধনীসহ) সংসদে পাস হয়। সংশোধিত আইনে সব রকম ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য আইনের আওতায় আনা হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ধূমপান নারী-পুরষ নির্বিশেষে সবার জন্যই ক্ষতিকর। তবে জিনগত কারণে নারী ধূমপায়ীর বিপদ তুলনামূলক অনেক বেশি। সন্তান ধারণে জটিলতা ও সন্তানের জীবনও হয়ে ওঠে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। ধূমপায়ী নারীর সন্তান গর্ভ থেকেই নানা ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। বাংলাদেশ অবস অ্যান্ড গাইনোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গামিনা চৌধুরী বলেন, নারী ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে স্ট্রোক, হার্ট এ্যাটাক ছাড়াও জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকি, প্রজননতন্ত্রে সমস্যা, গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতা, সন্তান ধারণে প্রতিবন্ধকতা, সন্তানের জন্মগত ত্রুটির মতো বিষয়গুলো আসে। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেনের মতে, ধূমপায়ী নারীদের চিকিৎসা অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রধানত ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি। পাশাপাশি নারীদের জরায়ু, খাদ্যনালি, মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি পুরুষের তুলনায় বেশি থাকে। দেশে নারী ধূমপায়ী বেড়ে যাওয়া অশনিসঙ্কেত।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে তামাকের ওপর উচ্চহারে করারোপ, সিগারেটের প্যাকেটে ছবি ও সতর্কবাণীসহ কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ এবং তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত থাকতে সরকারকে অবশ্যই আর্টিক্যাল ৫.৩ এর নির্দেশনা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক চুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) এর আর্টিকেল ৫.৩ এর সকল শর্ত পূরণের জন্য তামাক কোম্পানির সঙ্গে সরকারের সকল যোগাযোগের নথি প্রকাশ করা, তামাক কোম্পানির সাথে যেকোনো আলোচনার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আচরণবিধির প্রণয়ন করা, তামাক কোম্পানির কাছ থেকে যেকোনো অনুদান কিংবা উপহার গ্রহণ নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের প্রয়োজন।

অবিলম্বে আর্টিক্যাল ৫.৩ অনুযায়ী তামাক কোম্পানির সকল সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক (সিএসআর) কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দকে তামাক কোম্পানির পদ থেকে ইস্তফা, রফতানি শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতিসহ তামাক কোম্পানিকে প্রদত্ত সব সুবিধা প্রত্যাহার, তামাক কোম্পানির সাথে যোগাযোগ বা আলোচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ জরুরি ভিত্তিতে সরকারকে নিতে হবে।

এ অবস্থায় নারীদের ধূমপান থেকে বিরত করতে প্রথমেই কাউন্সিলিং দরকার। প্রয়োজন পরিবারের সহযোগিতা। প্রয়োজন তামাক কোম্পানির অসাধু উদ্দেশ্যে বন্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি। এক্ষেত্রে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে আরো দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- লেখক: সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...