শ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ

মানবকণ্ঠ
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১২

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটেছে ঈর্ষণীয়ভাবে। আমাদের গার্মেন্টস শিল্প বর্তমানে ভারত, জাপান, এমনকি চীনের সাথেও পাল্লা দিতে সক্ষম। বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য এখন চীনের বাজারে প্রবেশ করতেও সুযোগ খুঁজছে। আমেরিকা বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য রফতানির ওপর কোটা আরোপের পরও এ অগ্রগতি। আর এ অগ্রগতির মূলে রয়েছে শুধুমাত্র সস্তা শ্রমের অবদান। ১৯৯৪ সালে তৈরি পোশাক শিল্পের একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ছিল ৯৩০ টাকা। তার ১২ বছর পর ২০০৬ সালে তা বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ৬৬২ টাকা। এরপর সেটা বাড়িয়ে করা হয়, ৩ হজার টাকা।

বর্তমানে একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যে বেতন পাচ্ছে তার চাইতে কমপক্ষে বিশগুণ বেশি বেতন পাচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা। আর এজন্যই ভারত, জাপান ও চীন পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের নাগাল ধরতে পারেনি। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজেদের আগের দাবি থেকে সরে এসেছেন শ্রমিকেরা। এখন তারা ন্যূনতম মজুরি হিসেবে ১২ হাজার ২০ টাকা দাবি করেছেন। এর আগে তাদের দাবি ছিল ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। যদিও এর সাথে দ্বিমত করছে কিছু কিছু শ্রমিক সংগঠন।

মজুরি বোর্ডের কাছে মালিকেরা ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাব করছেন ৬,৩৬০ টাকা। গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নতুন করে নির্ধারণের জন্য একটি মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। সে বোর্ডের তৃতীয় বৈঠকে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা ন্যূনতম মজুরি হিসেবে নিজেদের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এতে দেখা যায় শ্রমিকদের প্রতিনিধি ১২ হাজার ২০ টাকা ন্যূনতম মজুরি হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। মজুরি বোর্ডে নির্বাচিত শ্রমিক প্রতিনিধি বেগম শামসুন্নাহার ভুঁইয়া বলেছেন, আগের মজুরি বোর্ডের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই তিনি এ প্রস্তাব করেছেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘শ্রমিক ফেডারেশনগুলোর ভিন্ন ভিন্ন মজুরির দাবি ছিল। কারো ছিল ১৬ হাজার টাকা, আবার কারো ১৮ হাজার টাকা। আমি সার্বিক বিষয় চিন্তা করে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ২০ টাকা প্রস্তাব করেছি। আমি হিসাব করেছি ২০১০ সালে শ্রমিকদের দাবি কত টাকা ছিল, আর কত টাকা পেয়েছে, আর ২০১৩ সালে দাবি কত টাকা ছিল আর কত টাকা পেয়েছে। এখন আমি ১৬ হাজার টাকা দাবি করলাম, কিন্তু পাওয়ার সময় যদি সেটা এক-তৃতীয়াংশ হয়ে যায়, তাহলে সমস্যা হবে। সেজন্য আমি ১২ হাজার টাকা প্রস্তাব করেছি।’

গত বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা অক্সফাম এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বের সাতটি প্রধান তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরিই সবচেয়ে কম। অক্সফামের রিপোর্টটিতে বলা হয়, বাংলাদেশে একজন সাধারণ মানুষের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য নিম্নতম মজুরি প্রয়োজন ২৫২ মার্কিন ডলারের সমান অর্থ। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক মজুরি পান প্রায় ৬৭ মার্কিন ডলারের সমান অর্থ। গার্মেন্টস শিল্প আমাদের দিচ্ছে অনেক। জাতীয় অর্থনীতিতে রাখছে ব্যাপক অবদান। দেশের রফতানি আয়ের প্রায় ৭৫ ভাগই আসে এ খাত থেকে।

টাকার অংকে উল্লেখ করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। তৈরি পোশাক রফতানির মাধ্যমে আমরা প্রতি বছর আয় করে থাকি প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৮ হাজার ৪শ কোটি টাকা। এসব হিসাব-নিকাশ থেকেই আমরা বলছি, এসবই গার্মেন্টস সেক্টরের অবদান। কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা সত্য আমরা বলছি না। আমরা বলছি না জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলা এ গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের কথা, তাদের উদয়াস্ত অমানুষিক পরিশ্রমের কথা। এই চরম সত্যটিকে বেমালুম অস্বীকার করা বা চেপে রাখা, এটাকে কী বলব? নিঃসন্দেহে এটা আমাদের হীনম্মন্যতার পরিচয়!

ধরে নেয়া যাক, দেশের কারখানাগুলোর ভেতরে মেশিন, কাঁচামাল সবই আছে কিন্তু নেই শুধু শ্রমিক। তাহলে কারখানাগুলো কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো উৎপাদন করতে পারবে?

দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে বর্তমানে ৩৫ লাখের বেশি শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে ৮০ ভাগই নারী। যারা প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা শ্রম দেয়। আইএলও কনভেনশন কিংবা মহান মে দিবসের অর্জন ৮ ঘণ্টা কাজের সিদ্ধান্ত এদের বেলায় প্রযোজ্য হয়নি আজও। মাসে এরা যা মজুরি পায় (৩ থেকে ৬ হাজার টাকা) তা দিয়ে একটি পরিবারের খেয়ে পরে একমাস চলা তো দূরের কথা একজনেরও চলে না একমাস। তবুও এরা বাধ্য হয়েই নামমাত্র টাকার বিনিময়ে সস্তায় শ্রম বিক্রি করছে পোশাক কারখানায়, অনেকটা মধ্যযুগীয় সকল বর্বরতাকে মেনে নিয়ে নীরবে-নিভৃতে।

তারপরও এসব শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া রাখা হয় মাসের পর মাস। নেই কোনো উৎসব বোনাসও। অনেক কারখানাতেই দুর্ঘটনার সময় জীবন রক্ষার জন্য নেই কোনো নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। যেখানে আছে, সেখানেও শিফট চালু হওয়ার পর তালাবদ্ধ রাখা হয়। আগুন লাগার পরও সেই বন্ধ গেটও খুলে দেয়া হয় না, তার মধ্যে আটকা পড়েই পোশাক শ্রমিকদের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়। এ শিল্পের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই। আমরা যারা সংবাদ মাধ্যমের সাথে জড়িত, তাদের অবস্থাটাও অনেকটা গার্মেন্টস্ শ্রমিকদের মতো।

জীবন বাজি রেখে যারা সংবাদ সংগ্রহ করেন, সাংবাদিকতা করেন তাদের প্রাপ্তির খাতায় কি, সেটা আমরা-ই জানি। গার্মেন্টস শ্রমিকরা আজ তাদের অধিকার আদায়ে মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিকরা ইচ্ছা করলেই এই ধরনের মিছিল-সমাবেশ করতে পারে না। অধিকাংশ সংবাদকর্মী শিক্ষা জীবন শেষে এই পেশায় এসে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পরিশ্রম করে যে টাকা উপার্জন করে তা কারো কাছে প্রকাশের মতো নয়। আমার পিতা এদেশের একজন নামকরা সাংবাদিক ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর ডাক্তারি পড়া ছেড়ে আমাকেও সাংবাদিকতা পেশায় নাম লেখাতে হয়েছে।

মোট কথা হলো, আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ভিতকে যারা রক্ত- ঘাম আর শ্রম দিয়ে দিনের পর দিন শক্তিশালী করে চলছে তাদের আমরা দিচ্ছি তো না-ই, তাদের অবদানটুকুও পর্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করছি না! ঘুরিয়ে বলছি, দেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস সেক্টরের অবদানের কথা। এমনি হীন আমরা! এমনি বেইমান আমরা! কিন্তু এ বেইমানি কেন? এ মিথ্যাচারের জবাব কী জানতে চাইবে না গার্মেন্টস সেক্টরে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমিক-জনতা?

লেখক- শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: সিনিয়র সাংবাদিক।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads





Loading...